একটি পিঁপড়া নিজের মতো করে নড়াচড়া করছে না। তার সব নিয়ন্ত্রণ যেন চলে গেছে এক অদৃশ্য শক্তির হাতে। ভাবতেই অবাক লাগে, তাই না?
ব্রাজিলের ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্যে উঁচু গাছের নিচের দিকে তাকালে এমনই এক দৃশ্য চোখে পড়তে পারে। মাটি থেকে নির্দিষ্ট উচ্চতায় একটি পাতার ওপর চুপচাপ বসে আছে একটি পিঁপড়া। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সে নিস্তব্ধ। কিন্তু বাস্তবে সে আর নিজের ইচ্ছায় পরিচালিত নয়, তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে এক ধরনের পরজীবী ছত্রাক।
এই ছত্রাকের নাম Ophiocordyceps unilateralis। বেঁচে থাকার জন্য এটি পিঁপড়ার শরীরকে ব্যবহার করে। একবার শরীরে প্রবেশ করলে ধীরে ধীরে এটি পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং পিঁপড়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। সংক্রমিত পিঁপড়া দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গাছ বেয়ে ওঠে এবং নির্দিষ্ট উচ্চতায় গিয়ে পাতায় কামড়ে আটকে যায়, যা ছত্রাকের বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত।
এরপর ধীরে ধীরে পিঁপড়ার শরীরের ভেতরে ছত্রাক বৃদ্ধি পায় এবং একসময় শরীর থেকে স্পোর-ধারী কাঠামো বের হয়ে আসে, যা নিচে পড়ে আরও পিঁপড়াকে সংক্রমিত করে।
গবেষণা অনুযায়ী, সংক্রমণের পর ছত্রাক দ্রুত পুরো দেহে উপনিবেশ গড়ে তোলে এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ছত্রাকের মস্তিষ্ক দখলের প্রয়োজন হয় না; বরং এটি মূলত পিঁপড়ার পেশি ও স্নায়বিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে আচরণগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
আরো পড়ুন: সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় উঠে আসে তিমি!
এছাড়াও জানা যায়, আক্রান্ত পিঁপড়ারা দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে এই ঝুঁকি সম্পর্কে কিছু প্রতিরক্ষামূলক আচরণ গড়ে তুলেছে। কোনো সদস্য সংক্রমিত হলে কলোনির অন্যান্য সুস্থ পিঁপড়া তাকে শনাক্ত করে এবং কলোনি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, যাতে পুরো উপনিবেশ রক্ষা পায়।
এই ধরনের ছত্রাক সাধারণত নির্দিষ্ট প্রজাতির পিঁপড়ার ওপর, বিশেষ করে কার্পেন্টার অ্যান্টের মতো প্রজাতিতে বেশি সংক্রমণ ঘটায়।
গবেষণায় আরও জানা গেছে, ছত্রাক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক দখল করার প্রয়োজন হয় না। এটি শরীরে প্রবেশ করে রাসায়নিক উপাদান নিঃসরণ করে পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে, ফলে পিঁপড়ার শারীরিক নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো এই পুরো প্রক্রিয়াটি আজও বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যাতীত। প্রকৃতি যেন নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছে এক অমোঘ রহস্য, যেখানে জীবন ও নিয়ন্ত্রণের সীমারেখা এখনো অস্পষ্ট।
তারেক/
.jpg)