প্রকৃতির জগতে কিছু প্রাণীর এমন কিছু আচরণ রয়েছে, যা একদিকে যেমন বিস্ময় জাগায়, অন্যদিকে তেমনি প্রশ্ন তোলে জীবনের নির্মম বাস্তবতা নিয়ে। তেমনই এক অনন্য উদাহরণ প্রেয়িং ম্যান্টিস (Praying mantis)। এ পোকার জীবনচক্রে ভালোবাসা, বেঁচে থাকা এবং প্রজনন এক অদ্ভুত সমীকরণে বাঁধা। বিশেষ করে স্ত্রী ম্যান্টিসের এক আচরণ, যা বৈজ্ঞানিকভাবে ‘sexual cannibalism’ নামে পরিচিত, বহুদিন ধরেই গবেষক ও সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রেয়িং ম্যান্টিসের বৈজ্ঞানিক নাম Mantis religiosa. Mantidae পরিবারভুক্ত এই শিকারি পোকা সাধারণত ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, যদিও কিছু প্রজাতি ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে। সবুজ, বাদামি কিংবা ধূসর রঙের শরীর তাদেরকে গাছপালার মাঝে সহজে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। বড় যৌগিক চোখ এবং প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘোরানো যায় এমন মাথা–এই দুই বৈশিষ্ট্য তাদেরকে করে তুলেছে দক্ষ শিকারি।
প্রেয়িং ম্যান্টিস মূলত ‘ambush predator’, অর্থাৎ তারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে এবং মুহূর্তের মধ্যে শিকারকে ধরে ফেলে। এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে এফিড, শুঁয়োপোকা, মাছি ও মশা–যেগুলো কৃষির জন্য ক্ষতিকর পোকা হিসেবে পরিচিত। ফলে কৃষিক্ষেত্রে এদের উপস্থিতি অত্যন্ত উপকারী। একে বলা যায় প্রাকৃতিক কীটনাশক বা বায়ো-কন্ট্রোলার।
আরো পড়ুন: প্রাণীরাও প্রেমে পড়ে
তবে এই উপকারী পোকাটির জীবনচক্রের একটি ধাপ বিশেষভাবে আলোচিত। মিলনের সময় বা তার কিছু পরেই স্ত্রী ম্যান্টিস অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ সঙ্গীকে খেয়ে ফেলে বা পুরুষ সঙ্গীর মাথা ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে। এই আচরণকে বলা হয় যৌন নরখাদকতা। ঘটনাটি শুনতে ভয়ংকর মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে প্রকৃতির নিজস্ব যুক্তি।
বিজ্ঞানীদের মতে, ডিম উৎপাদন ও তা রক্ষার জন্য স্ত্রী ম্যান্টিসের প্রচুর শক্তি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়। পুরুষ সঙ্গীকে খেয়ে ফেলার মাধ্যমে সে সেই পুষ্টির একটি বড় অংশ অর্জন করে। আশ্চর্যের বিষয়, পুরুষ ম্যান্টিসের মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও তার দেহ কিছু সময় সঙ্গম চালিয়ে যেতে পারে, যা নিষিক্তকরণের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ এই নির্মমতা আসলে প্রজাতির টিকে থাকার কৌশল।
ম্যান্টিসের জীবনচক্রও বেশ আকর্ষণীয়। স্ত্রী ম্যান্টিস ‘ootheca’ নামে ফেনার মতো এক খোলসে অনেকগুলো ডিম একসঙ্গে দেয়। সেখান থেকে নিম্ফ বের হয়, যা দেখতে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো হলেও ছোট এবং ডানাহীন। কয়েকবার খোলস বদলের পর তারা পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কে পরিণত হয়।
প্রেয়িং ম্যান্টিস শুধু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন গ্রিস ও মিসরে এদেরকে অতিপ্রাকৃত শক্তির অধিকারী মনে করা হতো। আবার চীনা সংস্কৃতিতে এরা সাহস ও বীরত্বের প্রতীক। এমনকি তাদের শিকার ধরার কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘নর্দার্ন’ ও ‘সাউদার্ন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ নামে মার্শাল আর্টও গড়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, প্রেয়িং ম্যান্টিস প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি–যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে উপকারিতা, বুদ্ধিমত্তা এবং নির্মম বাস্তবতা। কৃষকের বন্ধু এই পোকাটি আমাদের শেখায়, প্রকৃতির প্রতিটি আচরণের পেছনেই রয়েছে টিকে থাকার গভীর বিজ্ঞান। আর সেই বিজ্ঞানের এক চরম উদাহরণ–প্রজননের জন্য আত্মত্যাগ, যেখানে জীবন আর মৃত্যুর সীমারেখা একেবারেই ভিন্ন অর্থ বহন করে।
তারেক/
.jpg)