আমার পিয়ন হঠাৎ করেই হন্ততন্ত হয়ে অফিসে ঢুকল। ঠিক সে সময়ই আমি অফিস থেকে বাইরে বের হচ্ছিলাম। তাকে ঢুকতে দেখে আমার কাছে একটু খটকা লাগল। মনে মনে ভাবলাম ঘটনা কী? আমি কিছুটা ঠাহর করার চেষ্টা করলাম। বাইরে বের হওয়া বাদ দিয়ে তাকে কিছুটা অবলোকন করলাম। দেখি শরীরজুড়ে ঘাম জবজব করছে।
আমি অবাক হলাম। তার কাছে জানতে চাইলাম- রাজ্জাক তোমার এ দশা কী করে হলো? সে বলল, স্যার জনতা ব্যাংকের জনসংযোগে ওঠার সময় একটু ভাব নিয়েছিলাম। আমি আরও অবাক হলাম। এবার পুরো ঘটনা জানার চেষ্টা করলাম। সে বলল, জনতা ব্যাংকের লিফট দিয়ে ওপরে ওঠার সময় সিকিউরিটি গার্ড তাকে বড় অফিসার ভেবে লম্বা একটা সালাম দেয়। সে সালামের সেলামি দিতে গিয়েই তার চালান-পুঁজি সব শেষ। সালাম শেষে বকশিশ হিসেবে তার কাছে থাকা ১০০ টাকার নোটের পুরোটাই সিকিউরিটি গার্ডকে দিয়ে দেয়। এখন মতিঝিল থেকে শান্তিনগর অফিসে হেঁটে আসা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ তার কাছে খোলা ছিল না।
পিয়ন রাজ্জাককে মাঝেমধ্যেই ব্যাংক ও বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সিতে আমাদের পত্রিকার বিজ্ঞাপনের ওয়ার্ক-অর্ডার আনার জন্য পাঠানো হতো। পিয়ন রাজ্জাক দেখতে মাশাআল্লাহ ভারতের কলকাতার ভোম্বাদা মানে প্রসেনজিতের মতো হুবহু দেখতে। আর এখানেই ব্যাংকের গার্ড ভুল করে বসেছে। তাকে বড় অফিসার ভেবে সালাম দিয়েছে।
আরো পড়ুন: যে প্রাণীর রক্ত বাঁচিয়েছে লাখো মানুষের প্রাণ
চাকরি ছোট হলেও সে ফিটফাট থাকতে বেশ পছন্দ করে। ফিটফাট থাকতে সে গুলিস্তান থেকেই সব সময় কম দামে জুতা কিনে থাকে। গুলিস্তানে অনেক দামি জুতাও কমে কেনা যায়। সে সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করে থাকে পিয়ন রাজ্জাক মিয়া। জুতা এবং প্যান্ট কিনতে গিয়ে গুলিস্তানের হকারদের সঙ্গে তার অনেকবার বসচা হয়েছে। সে হয়তো একটা জুতা অনেকক্ষণ ধরে দেখেশুনে পছন্দ করেছে। এবার দরদাম করার পালা। গুলিস্তানের ফুটপাতের দোকানি তার পছন্দের জুতার দাম হাঁকলো ২ হাজার টাকা কিন্তু সে বলল, দেড় শ। অমনি দোকানির সঙ্গে এক পসলা হালকা-পাতলা কথা কাটাকাটি বেঁধে গেল তার সঙ্গে। দর করতে করতে সে জুতা আড়াই শ টাকায় কিনে আনে। দাম অল্প হলেও দেখতে কিন্তু সেই লাগে। আবার প্যান্টের ক্ষেত্রেও তাই। এভাবেই আমার পিয়ন ফুটানি করে বেড়ায়। এবার সেই গুলিস্তানের জুতা পরেই তার আক্কেল গুরুম হয়েছে। মতিঝিল থেকে হেঁটে অফিসে আসতে গিয়ে রাজ্জাকের জুতার তলি শেষ। পুরোনো জুতা। সেটাই রং আর পালিশ করে চকচক করে তুলেছিল দোকানি, রাজ্জাক তা বুঝতে পারেনি। জুতার তলা যে আগে থেকেই ফাটা ছিল তাতে করে গরমের মধ্যে পিচঢালাই পথে চলতে গিয়ে রাজ্জাকের এমন বেহাল দশা। তবে সে রক্ষা পেয়েছে অফিসের কাছে এসেই জুতা ছিঁড়ে গেছে বলে। না হলে পুরো সড়ক তাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অফিসে আসতে হতো।
রাজ্জাক জীবনে সবচেয়ে বেশি ধরাটা খেয়েছে বিয়ের পাত্রী দেখতে গিয়ে। সে হঠাৎ করেই ছুটি চেয়ে বসল কোনো কারণ ছাড়া। আবার ছুটি কী জন্য তাও বলছে না। অবশেষে সে লজ্জাবনত মুখে জানাল, তার জন্য বাড়ি থেকে বিয়ের পাত্রী দেখা হচ্ছে। তাই তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল না গেলেই নয়। বিয়ে বলে কথা, অগত্যা ছুটি না দিয়ে কোনো উপায় নেই। বেতনের টাকাটা পেয়েই সে ব্যাগ গোছানো শুরু করল। তাকে এবার দেখে কোনো উপায় নেই যে, সে ছোট চাকরি করে। পুরো সুতায় মাঞ্জা দেওয়ার মতো নিজেকে ফিটফাট করে বাড়িতে রওনা দিয়েছে সে।
কয়েক দিন পরই দেখা দিল বিপত্তি। মেয়ের বাড়ির লোক অফিসে এসে হাজির। মেয়ের বাবা ছেলে কেমন চাকরি করে তা একটু পরখ করতে গ্রাম থেকে ছুটে এসেছেন শহরে। রাজ্জাকের কপাল ভালো। মেয়ের বাবা অফিসে এসেই আমার সামনে পড়েছেন। রাজ্জাকের বিয়েসাদী নিয়ে অফিসের অনেকেই মুচকি মুচকি হাসছে। এ ঘটনার আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করলাম। মুরব্বি ভদ্রলোককে বেশ আপ্যায়ন করালাম। অফিসের পরিবেশ দেখে তার মনে ভালো একটা ধারণা হলো। মুরব্বি ভদ্রলোক একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার কয়েকটি মেয়ে। তবে মুরব্বি ভদ্রলোককে প্রশ্ন করে তো আমার চোখ ছানাবড়া হওয়ার মতো দশা। এবার রাজ্জাক অফিসের বড় কর্ককর্তা হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছে। সে অফিসের পিয়ন, এ কথাটা আস্তে করেই সে চেপে গেছে।
এবার আমি পড়লাম মহা বিপত্তিতে। রাজ্জাক যে জালিয়াতি করে বিয়ের পাত্রী দেখছে তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে পাত্রীর পরিবার বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়বে। আমি পাত্রীর বাবাকে বললাম, চাচা ছেলের বাড়িঘর দেখেছেন? তিনি বললেন, এখনো যাইনি। আমি বললাম, আগে বাড়িঘর দেখেন। পাত্র কেমন এলাকায় খোঁজখবর করেন। তার পরে অফিস দেখা। একজন বাবা বিবাহ উপযুক্ত মেয়ে থাকলে তার মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কত ধরনের পেরেশানিতে থাকেন তা এ বাবাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। এত এত দেখেশুনে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পরও কি বাবাদের পেরেশানি কমে? সামাজিক অবক্ষয়ে কত মেয়ে বলির শিকার হচ্ছে আমাদের চোখের সামনে।
অবশেষে পিয়ন রাজ্জাক মেয়ে দেখা শেষে অফিসে ফিরল বিমর্ষ বদনে। মেয়ের বাবা রাজ্জাকের পিয়ন থেকে অফিসের বড় কর্তা হওয়ার জালিয়াতি কী করে যেন বুঝে গেছেন। তাতেই মেয়ের বাবা বিয়ের সব আয়োজন না করে দিয়েছেন।
আরো পড়ুন: যেখানে অবিবাহিতদের ঢেকে দেওয়া হয় দারুচিনির গুঁড়ায়
গ্রামে পাত্রী দেখার পর রাজ্জাক এবার শহরে বিয়ে করার জন্য ছোটাছুটি করছে। জানাশোনা অনেককেই পাত্রী দেখতে বলছেন। কিন্তু ছোট চাকরি, ইচ্ছা করলেই তো আর বড় ঘরে বিয়ে করা সম্ভব নয়। তাই শহরের আশপাশের গ্রামের নিভৃত পল্লিতে মেয়ে দেখার কাজ সারছে রাজ্জাক। এবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোয় একটা মেয়ের খোঁজ পেয়েছে সে। মেয়ের বাবা কৃষিজীবী। গরু-বাছুর আছে। আবার জমিজমা নেহাত কম নয়। তার কোনো ছেলে নেই। দুটো মেয়ে। তারাই ভবিষ্যতে সব সহায়-সম্পত্তির মালিক হবে। এবার সে জেনেবুঝেই বড় ধরনের দাও মারার লক্ষ্যে এমন পাত্রী খুঁজে বের করেছে। এটা তো আর ছেড়া জুতা নয় যে, কয়েক দিন পর ফেলে দেবে। অনেক ভেবেচিন্তেই সে এবার আটঘাট করে বেঁধে মাঠে নেমেছে পাত্রী দেখতে।
এবার গুলিস্তান থেকে অল্প দামে পুরোনো ব্র্যান্ডের শার্টের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। অফিস ছুটির পর প্রতিদিনই একবার করে সে গুলিস্তানে যায়। এবার পলো ব্র্যান্ডের একটা গেঞ্জি পেয়েছে। এ মেয়ের বাবার যেমন সহায়-সম্পত্তি, তা এবার যদি হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে তার চৌদ্দ জীবনে এমন মেয়ে আর সম্পত্তির দেখা কপালে জুটবে না। তাই তো সহকর্মী হেলালকে নিয়ে বিয়ের ছক কষেছে। কিন্তু মেয়ে দেখতে রওনা দেওয়ার সময় ঘটল বড় ধরনের বিপত্তি। মেয়ে দেখতে যাবে রাজ্জাক। সঙ্গে নিয়েছে সহকর্মী হেলালকে। দেখে মনে হচ্ছে হেলালই পাত্রী দেখতে যাচ্ছে। রাজ্জাকের থেকে বেশি মাঞ্জা মেরেছে হেলাল। চকচকে জামা পরেছে সে। তাও আবার রাজধানীর পলওয়েল মার্কেট থেকে আনা শার্ট তার গায়ে। কিছুতেই হেলালকে এ জামা পরে পাত্রীর বাড়িতে নেবে না সে। তাই হেলালের জামা খুলে সে পরেছে আর তার গেঞ্জি হেলালকে পরিয়ে তারা মেয়ে দেখতে গেছে।
অফিসে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে, এবার রাজ্জাকের বিয়েটা হবেই হবে। গুঞ্জন আর সত্য হলো না। বিয়েটা শেষমেষ হয়নি। সহকর্মী হেলালের বিশ্বাসঘাতকতায় তার বিয়েটা এবার ভেস্তে গেছে। তার কারণ- হেলালের শার্ট খুলে রাজ্জাক পরায় তার ভেতরে একটা জেদ কাজ করেছিল। তাই তলে তলে মেয়ে দেখে এসে মেয়ের বাবাকে রাজ্জাকের সব ধরনের জাল-জালিয়াতির কথা সে ফাঁস করে দিয়েছে। এবার সে নিজেই পাত্র হয়েছে। আমাদের পিয়ন রাজ্জাক গুলিস্তানের ছেড়া জুতার কবল থেকে যেন নিজেকে আর বের করতে পারল না।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সিগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)