দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের চোখ মানেই সাধারণত গাঢ় বাদামি; এটাই প্রচলিত ধারণা। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে ইন্দোনেশিয়ার একটি জাতি। এই জাতির কিছু মানুষের রয়েছে জন্মগত উজ্জ্বল নীল চোখ। এই অস্বাভাবিক ও দৃষ্টিনন্দন বৈশিষ্ট্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বজুড়ে কৌতূহল সৃষ্টি করে। অনেকেই এটিকে রহস্যময় উপজাতির বৈশিষ্ট্য মনে করলেও এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
বাটন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই বিরল বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী একটি জেনেটিক অবস্থা বা জেনেটিক রোগ। যার নাম ‘ওয়ার্ডেনবার্গ সিন্ড্রোম’। এটি এমন একটি বংশগত ব্যাধি, যা শরীরের রঞ্জক পদার্থ (melanin) উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চোখ উজ্জ্বল নীল, ধূসর কিংবা কখনো দুই চোখ দুই রঙের হতে পারে। শুধু চোখ নয়, এই সিন্ড্রোমের কারণে চুলে সাদা গোছা, ত্বকে হালকা রঙের দাগ এবং কিছু ক্ষেত্রে জন্মগত শ্রবণশক্তি হ্রাসও দেখা যায়।
এই রোগটি ১৯৫১ সালে প্রথম বর্ণনা করেন ডাচ চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও জেনেটিসিস্ট পেট্রাস জোহানেস ওয়ার্ডেনবার্গ (Petrus Johannes Waardenburg)। তার নামানুসারেই এই ব্যাধির নামকরণ করা হয়।
আরো পড়ুন: গুপ্তচরদের জুতার কৌশল
বিশ্বব্যাপী প্রতি প্রায় ৪২ হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র একজন এই সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়, যা এটিকে একটি অত্যন্ত বিরল জেনেটিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে। ভ্রূণের বিকাশের সময়ে ‘নিউরাল ক্রেস্ট’ কোষের বিকাশে জিনগত ত্রুটির কারণেই এই পরিবর্তন ঘটে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সিন্ড্রোম সাধারণত প্রাণঘাতী নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
বাটন অঞ্চলের পুরো জনগোষ্ঠীর সবাই নীল চোখের নয়। এখানে বসবাসকারী বাটন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েক লাখ হলেও নীল চোখের মানুষ সংখ্যা খুবই সীমিত। স্থানীয়ভাবে ‘কাইম্বুলাওয়া’ নামে পরিচিত একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কিছু সদস্যের মধ্যেই এই বৈশিষ্ট্য বেশি দেখা যায় বলে জানা যায়। বাটন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার হলেও কাইম্বুলাওয়া সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যা মাত্র ১০১০। মানুষের এই অঞ্চলে মাত্র অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যেই এমন বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়, যা এটিকে আরও বিশেষ করে তোলে।
.jpg)
এই বিরল বৈশিষ্ট্য বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায় যখন ইন্দোনেশীয় ফটোগ্রাফার ও ভূতত্ত্ববিদ কর্চনৈ পাসারিবু (Korchnoi Passaribu) এই নীল চোখের মানুষের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ছবিগুলো মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকেই বিস্ময়ে অভিভূত হন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝেই এমন আশ্চর্য এবং এই নীল চোখ দেখতে প্রতি বছর পর্যটকরা সেখানে ভিড় জমান।
তবে স্থানীয়দের কাছে এই নীল চোখ কেবল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বিষয় নয়, বরং এক ধরনের সৌন্দর্যের প্রতীক। অনেকেই এটিকে ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত আশীর্বাদ’ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা এটিকে মানব জিনগত বৈচিত্র্যের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
বাটন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনযাপনও বেশ সাধারণ। কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং ছোটখাটো ব্যবসার মধ্যদিয়েই তাদের জীবিকা নির্বাহ হয়। আধুনিকতার ছোঁয়া এলেও তারা এখনো অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
সব মিলিয়ে, বাটন দ্বীপের এই নীল চোখের মানুষ কোনো রহস্যময় বা আলাদা জাতি নয়; বরং তারা আমাদেরই মতো সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে প্রকৃতি এক অনন্য বৈচিত্র্যের ছাপ রেখে দিয়েছে। এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানবজাতির জিনগত বৈচিত্র্য কতটা বিস্ময়কর এবং বহুমাত্রিক হতে পারে।
তারেক/
.jpg)