বিমানবন্দর এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, অনেকের চোখে এটা একটা দেশের ‘স্ট্যাটাস’। নতুন রানওয়ে, আধুনিক টার্মিনাল–এসব দেখলে ধারণা করা যায় দেশটা এগোচ্ছে নাকি পিছোচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু দেশ আছে, যাদের নিজস্ব কোনো বিমানবন্দর নেই। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, বাস্তবতা একটু ভিন্ন গল্প বলে।
ভ্যাটিকান সিটি, মোনাকো, সান মারিনো, লিকটেনস্টাইন, অ্যান্ডোরা–এই ছোট ছোট ইউরোপীয় দেশে বিমানবন্দর নেই। কারণটা খুব জটিল কিছু নয়। জায়গা নেই, দরকারও তেমন নেই আর খরচ অনেক বেশি।
ধরুন ভ্যাটিকান সিটি–পুরো দেশটাই রোম শহরের ভেতরে। আপনি যদি সেখানে থাকেন, ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যেই রোমের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে যেতে পারবেন। তাহলে আলাদা করে একটা বিমানবন্দর বানানোর যুক্তিটা কোথায়?
মোনাকোর কথাও একইভাবে ভাবা যায়। জায়গার অভাব এখানে বড় সমস্যা। তবু তারা বসে নেই–হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু করে কাছের ফ্রান্সের নিস বিমানবন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করেছে। মানে, ‘বিমানবন্দর নেই’ মানে এই নয় যে তারা বিচ্ছিন্ন।
সান মারিনো বা লিকটেনস্টাইনের দিকে তাকালে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট হয়–সবকিছু নিজের দেশে থাকতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তারা পাশের দেশের সুবিধা ব্যবহার করছে। ইউরোপে এটা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আপনি এক দেশে থাকছেন, কিন্তু কাজ করছেন অন্য দেশে–এটা সেখানে দৈনন্দিন বাস্তবতা।
অ্যান্ডোরা আবার একটু আলাদা। পুরো দেশটাই পাহাড়ে ঘেরা। সেখানে সমতল জমি খুঁজে বের করাই কঠিন, তার ওপর বিমানবন্দর বানানো তো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাই তারা সহজ পথটাই বেছে নিয়েছে–স্পেন বা ফ্রান্সের বিমানবন্দর ব্যবহার করা।
আসল প্রশ্নটা এখানে–বিমানবন্দর না থাকাটা কি পিছিয়ে থাকার লক্ষণ? আমাদের মতো দেশে অনেক সময় এমনটাই ভাবা হয়। কিন্তু সত্যিটা একটু অন্যরকম। এই দেশগুলোর বেশির ভাগই মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে অন্য অনেক দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান–এসব জায়গায় তারা বেশ শক্ত অবস্থানে আছে। মানে, তারা অন্যভাবে উন্নত হয়েছে।
একটা বিমানবন্দর বানানো শুধু নির্মাণ খরচের বিষয় নয়, এর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, পরিচালনা–সব মিলিয়ে এটা একটা বড় দায়। ছোট একটা দেশের জন্য এটা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। তার চেয়ে যদি পাশের দেশের সুবিধা ব্যবহার করা যায়, সেটা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
আরো পড়ুন: বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পরিবারের গল্প
আরেকটা বিষয় আমরা অনেক সময় এড়িয়ে যাই–পরিবেশ। বিমানবন্দর বানাতে বিশাল জায়গা লাগে, যা অনেক সময় প্রকৃতির ক্ষতি করে। ছোট দেশগুলো এই ঝুঁকি নিতে চায় না। তারা কম দিয়ে চলতে রাজি, যদি সেটাতে জীবনযাত্রা ভালো থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টা ভাবলে আরও স্পষ্ট হয়। আমরা প্রায়ই নতুন অবকাঠামো দেখলেই সেটাকে উন্নয়ন হিসেবে ধরে নিই। কিন্তু প্রশ্নটা হওয়া উচিত–এটা কতটা দরকারি? এটা কি সত্যিই মানুষের জীবন সহজ করছে?
সবকিছুর একটা বাস্তব দিক থাকে। যেসব দেশে বিমানবন্দর নেই, তারা আসলে সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে। তারা দেখেছে—নিজেদের সীমাবদ্ধতা কোথায়, আর কীভাবে সেটার ভেতরেই সবচেয়ে ভালোভাবে চলা যায়।
শেষ কথা হলো, উন্নয়ন মানে শুধু বড় কিছু বানানো না। অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তটাই সবচেয়ে বড় উন্নয়ন। বিমানবন্দর না থাকলেও একটা দেশ ঠিকই এগিয়ে যেতে পারে—যদি তার পরিকল্পনা ঠিক থাকে, আর মানুষ ভালো থাকে।
তাই মানচিত্রে ছোট এই দেশগুলো আমাদের একটা সহজ শিক্ষা দেয়–সবকিছু নিজের করে রাখতে হবে না, কিন্তু ঠিকভাবে বাঁচতে জানতে হবে।
তারেক/
.jpg)