জীবনে উপার্জনের বেশির ভাগ অংশ তিনি ব্যয় করেছেন নিজের শখ পূরণের জন্য। শখের বশে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি এবং নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে জমি কিনে অজপাড়াগাঁয়ে ১৪ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন শখের গাছবাড়ি। তিনি এখানে শুধু ফুল, ফলের গাছই রোপণ করেননি, পাখি ও বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য পরিণত করেছেন এ গাছবাড়িকে।
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মণদিয়া গ্রাম। এলাকাবাসী গ্রামটিকে এখন গাছবাড়ি হিসেবেই চেনেন। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ বাড়িটি দেখতে আসে। উপজেলা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে বিএলকে বাজারের পাশেই অবস্থিত আলোচিত এই বাড়িটির মালিক সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলাম।
আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলাম ব্যবসায়িক প্রয়োজনে পৈতৃক সম্পত্তিতে দোতলা বাড়ি তৈরি করে মায়ের নামে শুরু করেন সুঁই-সুতার কাজ। গ্রামের দরিদ্র নারীরা তার বাড়িতে বসে সুঁই-সুতা দিয়ে কাপড়ের ওপর নকশা তৈরি করতেন। একসময় কাজটি বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাড়িটিকে গাছ দিয়ে সাজানোর পরিকল্পনা করেন। দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেন নানা প্রজাতির ফুল-ফলের গাছ। এভাবে ৫ হাজার গাছের সংগ্রহশালায় পরিণত করেছেন বাড়িটিকে।
তিনি একজন সূচিশিল্পী, নিজের হাতে তৈরি করেন নকশিকাঁথাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্রাফট সামগ্রী। সেগুলো বিক্রি হয় আড়ংয়ের আউটলেটে। থাকেন ঢাকায়, কিন্তু শখের বসে নিজ গ্রামে তৈরি করেছেন নান্দনিক এ বাড়িটি। প্রায় ১৪ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন ব্যতিক্রম এ সংগ্রহশালা। বাড়িটি সবার কাছে গাছবাড়ি নামে পরিচিত। দুইতলা ভবনের ওয়ালগুলো গাছ দিয়ে মোড়ানো। ছাদেও আছে বড় বড় গাছ। বাড়ির আঙিনায় মূল্যবান আর দুর্লভ সব গাছ শোভা পাচ্ছে।
তার বাড়ি যাওয়ার রাস্তার দুই পাশ দিয়ে লাগানো বনজ গাছগুলো দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। বাড়ির পাশে বিএলকে নামের গ্রাম্য বাজারের ফাঁকা-পতিত জায়গায় তিনি কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়াসহ বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষ রোপণ করেছেন।
.jpeg)
আমিনুল ইসলামের গাছবাড়িতে গেলে শোনা যায় দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন পাখির কলরব। পাখিদের বসবাসের জন্য তিনি তৈরি করে দিয়েছেন বিভিন্ন ধরনের পাখির বাসা। হাজারো পাখি বাড়িটির গাছে গাছে কিচিরমিচির করে। তাদের খাবারের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ লাগিয়েছেন, পুকুরে মাছ ছেড়েছেন। যাতে পাখিরা সারা বছর সেসব ফলের গাছ থেকে ফল খেয়ে, মাছ খেয়ে বাঁচতে পারে। গাছ বাড়িতে আছে বড় একটি পুকুর সেখানে বিলুপ্ত প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের দেশীয় মাছের সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন তিনি। যাতে পুকুরে বাস করা ঢোঁড়া সাপ, মাছরাঙা, বক, পানকৌড়িসহ অন্য প্রাণীদের খাবারের সংস্থান হয়। এ বাড়ির ঝোপঝাড়ে, গর্তে বাস করে শেয়ালসহ নিশাচর দেশীয় প্রজাতির প্রাণী। তাদের জন্যও তিনি খাবার রান্না করে পরিবেশন করেন। এভাবেই দিন দিন সূচিশিল্পী আমিনুল ইসলাম হয়ে উঠেছেন এলাকার একজন মডেল পরিবেশপ্রেমী।
ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের শৈলকুপার চাঁদপুর নামক স্থান থেকে আনুমানিক চার কিলোমিটার পূর্বে গেলেই লক্ষনদিয়া গ্রামটির দেখা মিলবে। যাওয়ার পথটিই নির্দেশ করবে আমিনুল ইসলামের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা। তার নিজের হাতে লাগানো বৃক্ষগুলো শোভা পাচ্ছে রাস্তার দুই ধারে।
গাছবাড়ির মালিক ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম জানান, গ্রামের নারীদের দিয়ে সুচ শিল্পের (কাপড়ে নকশা তোলা) কাজ করানোর প্রয়োজনে ২০১৪ সালে তিনি বাড়িটি তৈরি করেন। কিছুদিন পরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন এই বাড়িটিতে গাছের সংগ্রহশালা তৈরি করবেন। গাছের সংগ্রহশালা করতে গিয়ে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমির সঙ্গে তিনি আরও জমি কিনে এভাবে ১৪ বিঘা জমির ওপর গাছের সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন।
তার বাড়িতে বেলজিয়াম, পর্তুগাল, মালয়েশিয়া, ভারত, দুবাইসহ একাধিক দেশ থেকে গাছ নিয়ে এসে লাগানো হয়েছে। আমিনুল ইসলামের ভাষ্যমতে, বর্তমানে তার বাড়িতে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার গাছ রয়েছে। প্রতি মাসেই এই গাছের সংখ্যা বাড়ছে। তিনি ঢাকা থেকে প্রতি মাসে বাড়িতে আসার সময় অন্তত একটি করে গাছ সঙ্গে আনেন।
বাড়িতে রিটা, নাগলিঙ্গম, লিলির মতো মূল্যবান গাছ রয়েছে। আবার রয়েছে দেশীয় সরা গাছ। যে গাছটি জঙ্গলে হয়ে থাকে, সেটা তিনি এই বাড়িতে লাগিয়ে সুন্দর করে রেখেছেন। এ ছাড়া বাড়িটির দেয়ালে ‘ওয়াল কার্পেট’ নামের গাছ দিয়ে মোড়ানো রয়েছে। গোটা বাড়ির চারপাশে ৫০০ চারা রোপণ করেন। যা পরবর্তী সময়ে গোটা দেয়াল ঘিরে রেখেছে।
আমিনুল ইসলাম জানান, তিনি সেপটিক ট্যাংকও গাছ দিয়ে সাজিয়েছেন। সেখানে বসে মানুষ ফুলের ঘ্রাণ উপভোগ করেন, কিন্তু বুঝতে পারেন না নিচেই রয়েছে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা। তিনি আরও জানান, এই সংগ্রহশালায় হারিয়ে যাওয়া সব গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনেক গাছ তিনি লাগিয়েছেন বাড়িটিতে।
আমিনুল ইসলামের সংসার স্ত্রী সিন্ধা ইসলাম, ছেলে মায়জাবিন আমিন, মেয়ে আনুশকা বিনতে আমিনকে নিয়ে। ব্যবসার প্রয়োজনে ঢাকায় থাকেন। গাছের পরিচর্যা করার জন্য নিয়মিত তিনজন কৃষি শ্রমিক আছেন। সময় পেলেই তিনি ছুটে আসেন গ্রামের বাড়ি। নিজের হাতে গাছের পরিচর্যা করেন। আমিনুল জীবনে যা আয় করছেন তার একটা বৃহৎ অংশই গাছের পেছনে ব্যয় করেন বলে জানান।
ওই বাড়িতে কাজ করা কৃষি শ্রমিক জিন্না আলম জানান, গাছগুলো স্যারের জীবনের অংশ। তিনি গাছগুলোকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। এই গাছের মধ্যে থেকে আমরাও গাছগুলোকে ভালোবেসে ফেলেছি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)