ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার এক সাধারণ চা বিক্রেতা হারুন মিয়া। কিন্তু তার কাজ তাকে সাধারণের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ‘মাদক ছেড়ে চা ধরুন, মোবাইল আসক্তি কমিয়ে বই পড়ুন’—এই স্লোগানকে বুকে ধারণ করে হারুন মিয়া সমাজ বদলের এক নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
অভাবের কারণে একসময় নিজের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলেও, আজ তিনি এক সমৃদ্ধ পাঠাগারের মালিক এবং হাজারো তরুণের অনুপ্রেরণা। হারুন মিয়ার জীবনের নানা ঘটনা ও স্বপ্ন নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার।
চায়ের কাপে জ্ঞানের চুমুক
ময়মনসিংহের গৌরীপুর শহরের কালীখলা এলাকা। ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট একটি চায়ের দোকান। নাম ‘হারুন টি হাউস’। ওপর থেকে দেখলে এটি আর দশটা দোকানের মতোই সাধারণ, যেখানে ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর বিস্কুটের আড্ডা জমে। কিন্তু দোকানের ভেতরে একটু নজর দিলেই চোখ আটকে যাবে। একপাশে চায়ের কেটলি ফুটছে, আর অন্যপাশে সুসজ্জিত তাকে থরে থরে সাজানো বই। এটিই ‘হারুন পাঠাগার’। এই পাঠাগারের কারিগর হারুন মিয়া, যিনি নিজে অভাবের কারণে স্কুল ছেড়েছিলেন, কিন্তু আজ মানুষের হাতে হাতে বই তুলে দিচ্ছেন।
অভাবের দিনগুলো ও সংগ্রামী শৈশব
হারুন মিয়ার জন্ম গৌরীপুর পৌর শহরের সতীষা মহল্লায়। বাবা আব্দুল জব্বার ছিলেন সবজি বিক্রেতা। ছয় ভাইবোনের বড় সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ২০১০ সালে মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরোতেই থমকে যায় হারুনের পড়াশোনা। পরিবারের হাল ধরতে ২০১২ সালে গৌরীপুর শহরের একটি ভাতের হোটেলের বারান্দায় মাত্র ৬০০ টাকা ভাড়ায় চায়ের দোকান শুরু করেন তিনি। তবে মনের ভেতর জ্ঞানের সেই যে তৃষ্ণা ছিল, তা কখনো মেটেনি।
নিজের পড়াশোনা আবার শুরু
চায়ের দোকানে কাজ করার সময় হারুন দেখলেন, কত মানুষ কত বিষয়ে কথা বলছে। তিনি নিজেও চাইতেন শিক্ষিত হতে। সেই অদম্য ইচ্ছা থেকে ২০১৭ সালে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এসএসসিতে ভর্তি হন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ২০২১ সালে এসএসসি ও ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। বর্তমানে তিনি বিএ (ডিগ্রি) পড়ছেন। হারুন প্রমাণ করেছেন, শেখার কোনো বয়স নেই এবং ইচ্ছাশক্তি থাকলে চায়ের দোকান চালিয়েও উচ্চশিক্ষা নেওয়া সম্ভব।
বই দিয়ে মোবাইল আসক্তি দূর করার লড়াই
২০২৩ সালের মে মাসে হারুন মিয়া তার স্বপ্নের ‘হারুন পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম দিকে দোকানের একটি ড্রয়ারে মাত্র ১০০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। হারুনের লক্ষ্য ছিল একটাই—বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের মোবাইল ফোনের আসক্তি কমিয়ে আবার বইয়ের পাতায় ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে তার পাঠাগারে দেড় হাজারেরও বেশি বই রয়েছে। এখানে নেই কোনো জামানত বা মেম্বারশিপ ফি। যে কেউ চাইলে দোকানে বসে পড়তে পারেন অথবা নির্দিষ্ট ফরমে নাম লিখে পছন্দের বই বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন সংগ্রাম ও পুনরারম্ভ
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর আগের জায়গা থেকে পাঠাগারটি এবং চা স্টলটি সরে গেলে বিপাকে পড়েন হারুন মিয়া। সাময়িকভাবে পাঠাগারটি পরিচালনা করার জন্য অনেকের কাছে সহযোগিতা চাইলেও কেউ এগিয়ে আসেননি। পরবর্তী সময়ে কালীখলা মন্দিরের একটি কক্ষে বিনা ভাড়ায় পাঠাগারটি পরিচালনা করার সুযোগ দেন মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শংকর ঘোষ পিলু। তিন মাসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে পুনরায় পাঠাগার ও চা স্টলটি নিয়ে নতুনভাবে কালীখলা এলাকায় যাত্রা শুরু করেন হারুন মিয়া।
.jpeg)
যত ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
হারুন শুধু বই পড়ার সুযোগই করে দেন না, বরং পাঠকদের উৎসাহিত করতে নানা পুরস্কারের ব্যবস্থা করেন। যেমন-
সেরা পাঠক ও রিভিউ পুরস্কার: এক মাসে চার থেকে পাঁচটি বই পড়ে যারা সেরা রিভিউ দিতে পারেন, হারুন তাদের উপহার দেন।
চা-প্রেমী সম্মাননা: ২০১৭ সাল থেকে তিনি নিয়মিত তার দোকানের সেরা গ্রাহকদের ‘বর্ষসেরা চা-প্রেমী সম্মাননা’ দিয়ে আসছেন।
বিনামূল্যে আপ্যায়ন: বই পড়তে আসা বা বই নিতে আসা পাঠকদের তিনি নিজের পক্ষ থেকে চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সম্মান
হারুন মিয়া একজন সচেতন নাগরিক। তিনি তার দোকানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা এখানে অর্ধেক দামে চা পান করতে পারেন। এ ছাড়া তার দোকানের সামনে প্রায়ই মাদকবিরোধী ও দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান লেখা সংবলিত পোস্টার দেখা যায়। সম্প্রতি তিনি ‘মাদক ছেড়ে চা ধরুন’ স্লোগানে বড় আকারে মাদকবিরোধী শোভাযাত্রাও করেছেন।
সহায়তার হাত বাড়াচ্ছেন যারা
সংগ্রাম আর স্বপ্নের পথে হারুন মিয়ার যাত্রা একা নয়। চায়ের কাপের পাশে গড়ে ওঠা তার পাঠাগারের গল্প যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দেশজুড়ে বহু হৃদয়বান মানুষ তার পাশে দাঁড়ান। একজন সাধারণ চা বিক্রেতা বইকে হাতিয়ার করে সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখছেন—এই খবর অনেককেই নাড়া দেয়।
সামাজিক সংগঠন ‘বসুন্ধরা শুভসংঘ’ হারুন মিয়ার এই মহতী উদ্যোগে যুক্ত হয়। তারা তাকে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের শতাধিক বই উপহার দেয়। এই বইগুলো পাঠাগারের সংগ্রহকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, বরং হারুন মিয়ার স্বপ্নকে দিয়েছে নতুন প্রেরণা। এ ছাড়া ‘গ্রন্থকুঠির’ প্রকাশনী হারুন মিয়ার পাঠাগারে দিয়েছে পাঁচ শতাধিক বই। একের পর এক বই আসতে থাকায় পাঠাগারটি যেন অল্প সময়েই হয়ে ওঠে বইয়ের এক ক্ষুদ্র ভাণ্ডার। একজন চা বিক্রেতা আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছেন—এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের পাঠাগারপ্রেমীদের কাছে সুপরিচিত নাম, ‘বইবন্ধু’ কাজী এমদাদুল হক খোকন এগিয়ে আসেন। তিনি পাঠাগারে পাঠিয়েছেন লক্ষাধিক টাকার বই। তার এই অবদান হারুন মিয়ার উদ্যোগকে দিয়েছে এক শক্ত ভিত্তি।
তবে বইয়ের প্রাচুর্যের মাঝেই দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। বর্তমানে পাঠাগারের একটি বুকশেলফে ধারণক্ষমতার বাইরে বই জমে আছে। জায়গা সংকট ও বুকশেলফের অভাবে অনেক মূল্যবান বই রাখতে হচ্ছে বস্তাবন্দি করে, যা হারুন মিয়ার কাছে যেমন কষ্টের, তেমনি চিন্তারও। এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি হারুন মিয়াকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বরাবর একটি আবেদন করতে পরামর্শ দেন। পাশাপাশি তিনি সহযোগিতার আশ্বাসও দেন, যা হারুন মিয়ার মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।
একজন আলোকিত মানুষ
যখন তরুণরা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকে, হারুন মিয়া দেখাচ্ছেন—আসল সম্পদ হলো জ্ঞান। তিনি প্রমাণ করেছেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো ডিগ্রি বা কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর মন এবং এক চিমটি সদিচ্ছা। হারুন মিয়া আজ কেবল একজন চা বিক্রেতা নন; তিনি একটি অন্ধকারের মাঝে জ্বলে ওঠা উজ্জ্বল বাতিঘর। তার স্বপ্ন, পাঠাগারকে আরও বড় করা। তিনি চান, এটি যেন একটি স্থায়ী ভবনে পূর্ণাঙ্গ পাঠাগার হিসেবে গড়ে ওঠে—যেখানে তরুণরা সারা দিন জ্ঞানচর্চায় মগ্ন থাকবে। ব্যক্তিগত জীবনে হারুন বাবা হারিয়েছেন। মা ও ছোট বোনের দেখাশোনার পাশাপাশি তিনি সমাজ গড়ার এই গুরু দায়িত্বও পালন করছেন। ছোট বোনও বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নরত। এভাবেই হারুন মিয়া, নিজের সংগ্রামের পাশাপাশি, একটি আলোকিত সমাজ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দিনরাত চেষ্টা করে চলেছেন।
হারুন মিয়ার স্বপ্ন
গৌরীপুরের এক সাধারণ চা বিক্রেতা হারুন মিয়া আজ শুধু চা বিক্রি করছেন না; তিনি ছড়িয়ে দিচ্ছেন জ্ঞানের আলো। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ বই পড়ায় অনেক পিছিয়ে। যতদিন না আমরা বই এগিয়ে দিতে পারছি, ততদিন আলোকিত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। যতদিন আমরা বই পড়ায় এগোতে না পারব এবং মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াব, ততদিন বাংলাদেশের উন্নতি সম্ভব না।’
হারুন মিয়া স্বপ্ন দেখেন পাঠাগারটি একদিন বড় হবে। মানুষ অন্ধকার থেকে দূরে গিয়ে একদিন বইয়ের আলোয় আলোকিত হবে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)