প্রকৃতি তার প্রতি পদক্ষেপেই ছড়িয়ে রাখে রহস্যময়তা। আজ আমরা তেমনি এক রহস্য সম্পর্কে জানব। মাটির দুই মিটার গভীরে শায়িত লাশের গন্ধ পেয়ে দাফনের কফিনেও অনায়াসে অনুপ্রবেশ করতে পারে এক খুদে পতঙ্গ, যাদের বলা হয় ‘কফিন ফ্লাই’।
ফরেনসিক বিজ্ঞান বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আধুনিক ল্যাবরেটরি কিংবা জটিল ডিএনএ পরীক্ষার জটিল দৃশ্য, সচরাচর সিনেমায় আমরা যা দেখে দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু মজার ব্যাপার অপরাধ বিজ্ঞানের এই বিশাল জগৎজুড়ে রয়েছে প্রকৃতির কিছু পতঙ্গ। যারা মানুষের অগোচরেই উন্মোচন করে খুনের রহস্য। এদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় এবং দুর্ধর্ষ হলো এই কফিন ফ্লাই, যা বৈজ্ঞানিক মহলে ফোরিড মাছি নামে বেশি পরিচিত। প্রকৃতির এই রহস্যময় সৃষ্টি মাটির প্রায় ছয় ফুট বা তার বেশি গভীরে গিয়েও লাশের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে, যা অনেক সময় আধুনিক প্রযুক্তির কাছেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই মাছির অনুপ্রবেশের কৌশল অত্যন্ত বিস্ময়কর। আকারে মাত্র এক থেকে তিন মিলিমিটারের এই পতঙ্গটির ঘ্রাণশক্তি দারুণ প্রখর। এমনিতে কোনো প্রাণী মারা গেলে তার গন্ধে সাধারণ মাছি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু দেহটি যদি মাটির গভীরে পুঁতে ফেলা হয় বা লাশটি গুম করা হয় খুব কৌশল খাটিয়ে মাটির গভীরে, তখন সেই দুর্ভেদ্য স্তরে সাধারণ মাছি পৌঁছাতে পারে না। এখানেই কফিন ফ্লাইয়ের রাজত্ব শুরু। লাশ থেকে নির্গত গ্যাস যখন মাটির সূক্ষ্ম রন্ধ্র দিয়ে ওপরে উঠে আসে, তখন এই মাছিরা সেই ঘ্রাণ শুঁকে মাটির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফাটল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে। এমনকি কফিন যদি শক্ত কাঠের বা ধাতব পাতেরও হয়, তবুও কবজা বা স্ক্রু-এর অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে এরা ভেতরে ঢুকে পড়তে অনেক সময় সক্ষম। ফরেনসিক তদন্তে এদের ভূমিকা কিন্তু সত্যিই অবিশ্বাস্য।
একজন অপরাধী হয়তো প্রমাণ লোপাটের জন্য লাশটি গভীর মাটির নিচে পুঁতে নিশ্চিন্ত থাকেন, কিন্তু এই ক্ষুদ্র জীবটি তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। লাশের কাছে পৌঁছাতে এই কফিন ফ্লাইগুলো মরিয়া হয়ে থাকে, যখন লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয় তখন লাশের গ্যাস আরও বেশি বের হওয়ার সুযোগ পায় সেই পথে। যা তদন্তকারীদের সহায়তা করে দ্রুত লাশ খুঁজে পেতে। তা ছাড়া লাশের ওপর এই মাছির লার্ভা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বলে দিতে পারেন যে মৃত্যুটি ঠিক কতদিন বা কত মাস আগে হয়েছে। এমনকি দেহ সম্পূর্ণ পচে কঙ্কাল হয়ে গেলেও মাছির অবশিষ্টাংশ বা লার্ভার খোলস পরীক্ষা করে লাশের বিষ বা কোনো বিশেষ ওষুধের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই মাছিদের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো এদের জীবনচক্র। এরা কফিনের অন্ধকার পরিবেশে কয়েক প্রজন্ম ধরে বংশবিস্তার করতে পারে এবং অক্সিজেনের চরম অভাব থাকলেও দিব্যি টিকে থাকে। যেখানে মানুষের চোখ বা আধুনিক ক্যামেরা পৌঁছাতে পারে না, সেখানে এই মাছিরা পৌঁছে যায় সত্যের সন্ধানে। মজার ছলে বলা যায় এরা প্রকৃতির শার্লক হোমস।
মাটির দুই মিটার নিচের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে এরা যখন জীবনচক্র সম্পন্ন করে, তখন আসলে তারা অপরাধীর রেখে যাওয়া অদৃশ্য চিহ্নগুলোকেই সামনে তুলে ধরে। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র জীবটি প্রমাণ করে দেয় যে, অপরাধ করে মানুষ থেকে পার পাওয়া সম্ভব হলেও প্রকৃতির জাল বিছানো আছে সর্বত্র। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের গভীরেও এক জোড়া ক্ষুদ্র ডানা এভাবেই সত্যের পাহারা দিচ্ছে গোয়েন্দা স্বরূপ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)