জেলা শহরের ডাকসাইটে একজন নামকরা উকিল। যেকোনো মামলায় প্রতিপক্ষকে তিনি তার প্রজ্ঞা আর কূটকৌশল দিয়ে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। তার কৌশলের কাছে আইনের কোনো ফাঁকফোকরই যেন খাটে না। মামলার তর্কযুদ্ধে কখন কোন যুক্তি-কৌশল ছুড়ে দিতে হবে তার ষোলো আনাই তিনি তার দীর্ঘ আইন পেশায় ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন। তাই তার চেম্বারে সব সময় ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকত। তার জুনিয়র আর মুহুরিরা সব সময় কোন মামলা কোন তারিখে কোর্টে উঠবে তা যেন সবই তাদের নখদর্পণে থাকে। উকিল বাবু শুধু বড় মামলাগুলোয় হিয়ারিং করে থাকেন। এ চেম্বারের আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য হলো–যেকোনোভাবেই মামলা জেতা লাগবে উকিল বাবুকে। তার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকেন তিনি। তাই তো দিন দিন চেম্বারে এখন মক্কেলদের জায়গা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। শুধু নিজ শহরের মানুষই তার মক্কেল নয়, বাইরের থানার মানুষও তার কাছে ধর্ণা দেন। তিনি জমিজমার মামলাই বেশি হাতে নেন। মামলা পেলেই তার চোখ চকচক করতে থাকে।
একদিন হঠাৎ সিরাজদিখান উপজেলা থেকে একজন মানুষ আসেন তার জমি-জমার সমস্যা নিয়ে। চাচাতো ভাইরা তার জমি-জমা দখল করে নিয়েছেন। আগের দিন তাদের বাবা-চাচারা মুখে মুখে জমি-জমা খেয়েছেন। তখন মানুষ এতটা চালাক-চতুর ছিলেন না। দয়া-মায়া ছিল বেশি। প্রতারণা তারা বুঝতেন না। এখন সেই নিরীহ মানুষগুলোর সন্তানরাই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তার বাবার কাছ থেকে তার চাচা খাড়া দলিল করে নিয়েছিলেন এক বিঘা পরিমাণ সম্পত্তি। আগে জমি দলিল করতে এখনকার মতো আইডি কার্ড আর ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ত না। আর এক এলাকার জমি অন্য এলাকায় গিয়েও দলিল করার সুযোগ ছিল। তাই সে সময় গ্রামের কিছু চালাক এবং পয়সাওয়ালা মানুষ নিরীহ মানুষের জায়গা-জমি জালিয়াতি করে নিয়ে যেতেন। সে জমিগুলোই এখন আদালতে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই নিরীহ মিহির আলী তার বাবার খাড়া জমি-জমার ভুয়া দলিল থেকে মুক্তি পেতেই তিনি জেলা শহরের নামকরা উকিল বাবুর কাছে এসে হাজির হয়েছেন।
আরো পড়ুন: পৃথিবীর দীর্ঘতম ট্রেনের গল্প
বছরের পর বছর মামলা আদালতে গড়াচ্ছে। একে একে পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করে মামলায় লড়েছেন। গরু-বাছুর তো মামলার প্রথম বছরেই শেষ করেছেন। তারপর নিজের থাকা কাঠের ঘরটি খুবই সামান্য দামে বিক্রি করে তা দিয়েই মামলায় জেতার চেষ্টা করেছেন মিহির আলী। তাতে তার শেষ রক্ষা হয়নি। এবার তিনি পথে বসেছেন। মিহির আলী যুগ যুগ ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরে ঘুরে পায়ের জুতা শেষ করে ফেলেছেন। ভিটে, জমি-জমা আর হালের বলদ বিক্রি শেষে এখন শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উঠেছেন। সেখান থেকেই এখন মামলা পরিচালনা করছিলেন মিহির আলী। উকিল বাবু তো বেগুন গাছ রোপণ করেছেন। সেখান থেকে বেগুন ছিঁড়বেন আর খাবেন। কিন্তু এখন মিহির আলীর কী হবে?
মিহির আলী ছাড়বার পাত্র নন। যে মামলায় তার ভিটে-বাড়ি গেছে। এক বিঘা জমি বাঁচাতে পাঁচ বিঘা জমি হারিয়েছেন। তিনি এর শেষ দেখেই ছাড়বেন। তিনি উকিলবাবুর চেম্বারে এবার তার ষোড়শী কন্যাকে নিয়ে হাজির হলেন। ষোড়শী কন্যাকে চেম্বারে বসিয়ে রেখে তিনি উকিল বাবুর সঙ্গে যান আদালতে মামলার হিয়ারিংয়ে। এদিকে চেম্বারে থাকা অপরূপ ষোড়শী মেয়েকে উকিলবাবুর স্ত্রী দুপুরে ভাত খেতে দেন। তিনি তখনো বুঝতে পারেননি তিনি নিজে নিজের কী ক্ষতি সাধন করতে চলেছেন। উকিল বাবুর সবই আছে। বিশাল অট্টলিকা, বাড়ি-গাড়ি, শান শওকত কী নেই তার। এখন শুধু একটা ষোড়শী তার দরকার। মক্কেলের মেয়েকে উকিলবাবুর মনে ধরে যায়। আর এটাই চাইছিলেন মিহির আলী। উকিলকে কিনতে হলে তার ভোগে তার এমন অপরূপ মেয়েকে না দিলে তার ষোলোকলা যে পূরণ হবে না।
একদিন উকিল বাবু তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন মিহির আলীর কাছে। আর মিহির আলী তাতে অমত করলেন না। ধনাঢ্য উকিল বাবুর কাছে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তাকে জামাতা করলেন। এদিকে উকিলের স্ত্রী তার স্বামীর এমন বিয়ে মেনে নিতে পারলেন না। তিনি আলাদাভাবে থাকতে শুরু করলেন। তিনিও উকিল ছিলেন। এতদিন প্র্যাকটিস করেননি। স্বামীকে ছেড়ে নিজেই আইন পেশায় দাঁড়ালেন। তার কয়েকটি মেয়ে রয়েছে। মিহির আলী সব হারিয়ে উকিলবাবুকে ষোড়শী কন্যাটি হাদিয়া দিয়ে অবশেষে মামলায় জিততে পারলেন। প্রকৃতির নির্মমতায় উকিলবাবু ষোড়শী একটা মেয়েকে বিয়ে করতে পারলেও তিনি ঠিকমতো সংসার করে যেতে পারলেন না। তার সহায়-সম্পত্তি ভোগ করতে পারলেন না। হঠাৎ করেই অকাল প্রয়াত হলেন উকিল বাবু।
এদিকে মক্কেল মিহির আলীর কন্যা দেখতে শুনতে ঠিক নায়িকার মতো। উকিল বাবুর অবর্তমানে তার বাড়িতে বিভিন্ন জনের আনাগোনা চলতে থাকে। এমন পরমা সুন্দরী নারীর রূপসুধা পান করতে কোর্টপাড়ার অনেক মানুষই লাইন ধরেন। তার একটি মেয়ে ও একটি ছেলে রয়েছে। উকিল বাবু অঢেল সম্পত্তি রেখে গেছেন। তা এখন কাক-চিলে খাচ্ছে। অপরূপ স্ত্রী এখন অন্যের। মাঝে মাঝে শুধু আগের ঘরের সেই স্ত্রী আর তার সন্তানরাই উকিল বাবুর জন্য চোখের পানি ফেলেন।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)