বাংলাদেশে বাড়ছে গাড়ির চাহিদা। সেই সঙ্গে বাড়ছে বাণিজ্যিক যানবাহনের ব্যবহার। অটোমোবাইলশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ, সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে র্যাংগস মটরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ারের সঙ্গে।
খবরের কাগজ: অটোমোবাইলশিল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে অটোমোবাইলশিল্পে চাহিদা বাড়ছে। রাস্তা, সেতু ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো যাতায়াতে সময় কম লাগছে। এর ফলে এই শিল্পের ওপর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যা কমার্শিয়াল যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আবার অটোমোবাইলশিল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়ন নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে অটোমোবাইল প্ল্যান্ট ও ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট স্থাপনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশে অটোমোবাইলশিল্পের প্রধান বাধাগুলো কী এবং সেগুলো কীভাবে অতিক্রম করা যায়?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: এই শিল্পের জন্য নীতিগত সহায়তা খুবই জরুরি। ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ক্ষেত্রে কিছু ফুয়েল স্ট্যান্ডার্ড (জ্বালানি মান) আছে। ইউরো-২ বা বিএস ২, বিএস-৪ ও বিএস-৬ দিয়ে জ্বালানির মান নির্দেশ করা হয়। আমাদের দেশে বিএস-২ মানের ফুয়েল সরবরাহ আছে। আমাদের দেশে ইউরো-৪ বা বিএস ফোর স্ট্যান্ডার্ডের জ্বালানি বাজারে নেই। এর ফলে পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি হয়। ইউরোপে এখন বিএস-৬ মান অনুসরণ করা হয়। আমাদের ভালোমানের পরিশোধন করা জ্বালানি প্রয়োজন, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আমাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অভাব রয়েছে। নকল যন্ত্রাংশে বাজার সয়লাব, যা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
খবরের কাগজ: সরকার কীভাবে এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: আমার মতে, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ট্যাকনিক্যাল ও দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া। আমাদের দেশে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করা লোকের সংখ্যা খুবই কম। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সামান্য কিছু গাড়ি অ্যাসেম্বলিং (সংযোজন) হচ্ছে, যা একজন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারের জন্য যথেষ্ট নয়। বিদেশি প্রতিষ্ঠান যেমন টয়োটা, হুন্দাই, কিয়ার-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে, তারা আগ্রহী হতে পারে। আমাদের মেকানিক ও ড্রাইভারদের দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। এসব দিকে নজর দিলে এই শিল্পকে অনেক দূর নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
খবরের কাগজ: বাণিজ্যিক যানবাহন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতায় এই ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা দেখেন ও র্যাংগস মোটরস কীভাবে কাজ করছে?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে আমাদের পরিবেশবান্ধবের দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের জ্বালানি মান নির্ধারণ করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে এখনো ইউরো-২ বা বিএস-২ মানের উচ্চ কার্বন নিঃসরণকারী গাড়ি চলছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। প্যাসেঞ্জার গাড়ির ক্ষেত্রে আমরা হাইব্রিড বা ইলেকট্রিক গাড়ির কথা বলি, কিন্তু বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব বিষয়টি উপেক্ষিত। বাণিজ্যিক যানবাহন কীভাবে পরিবেশবান্ধব করব তা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা নেই। এ বিষয়ে আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে কীভাবে ই-ভি চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা যায়, সে বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে।
বাণিজ্যিক যানবাহন সেগমেন্টে অন্যতম দুটি চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন ও পার্কিং। আমাদের গ্রাহকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। বেশির ভাগ গ্রাহকের মর্টগেজ দেওয়ার মতো কিছু না থাকায় তারা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পায় না। শেষ পর্যন্ত আমাদের তাদের অর্থায়ন করতে হয়। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ঢাকার তেজগাঁও, কমলাপুর, মতিঝিলসহ বিভিন্ন রাস্তায় পার্কিংয়ের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। এই বিষয়ে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
খবরের কাগজ: এ সমস্যার সমাধানে কী করা যেতে পারে?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: বাণিজ্যিক গাড়ির জন্য বিশেষ পার্কিং জোন তৈরি করতে হবে। রাতের বেলা রাস্তার ওপর পার্কিং বন্ধ করতে হবে। ঢাকার বাইরে রিমোট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে গাড়িগুলো শহরের বাইরে পার্ক করা যায়।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যানবাহনের বাজার কত বড়?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী, ২০১০-২০২৪ সালে আমাদের মোট আমদানি ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার, যার মধ্যে মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ ছিল বাণিজ্যিক যানবাহন।
খবরের কাগজ: পুরনো অর্থাৎ ফিটনেসবিহীন গাড়ি ব্যবহার কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: সরকার সম্প্রতি এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। ২০ থেকে ২৫ বছরের পুরনো গাড়ি বাতিলের কথা উঠেছে। এটি কার্যকর হলে আমরা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখব। তবে এর জন্য আমাদের শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
খবরের কাগজ: র্যাংগস মটরস কী ধরনের গাড়ি বাজারজাত করছে?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: র্যাংগস মটরস মূলত ভারী ট্রাক বাজারজাত করছে। কমার্শিয়াল গাড়ি আমদানি ও ডিস্ট্রিবিউশন করে থাকে। যেহেতু আমদানি করা গাড়িগুলো বাই রোডে আসে, তাই কয়েক শ কিলোমিটার চলে। সেটাকে আরও ফ্রেশনেস দেওয়ার জন্য, আমরা গাড়িগুলো নিজেরা এখন অ্যাসেম্বলি করি। আমরা ভলভো, আইশার ও মাহিন্দ্রার কিট আমদানি করে এখানে সংযোজন করি। এর মাধ্যমে আমরা কিছু কর্মসংস্থান তৈরি এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে পারছি।
খবরের কাগজ: পরিবহন খাতে নতুন কমার্শিয়াল ভেহিকেল বা বাণিজ্যিক যানবাহন যুক্ত হলে পরিবেশে কী প্রভাব পড়বে?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: এটি নির্ভর করে আমাদের দেশে ব্যবহৃত পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের বিশুদ্ধতার ওপর। আমাদের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কোনো সুনির্দিষ্ট মান নেই। আমাদের রাস্তায় চলাচলকারী বেশির ভাগ গাড়ি বিএস-২ মানের। র্যাংগস মটরস বিএস-৪ মানের গাড়ি বাজারজাত করে, যা সালফার কনটেন্ট ৯০ শতাংশ, কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোকার্বন ৫০ শতাংশ এবং পার্টিকুলেট ম্যাটার ৮৪ শতাংশ কমাতে পারে। তবে আমাদের ফুয়েল সিস্টেম বিএস-৪ মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় কিছু সমস্যা হয়। এ ক্ষেত্রে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
খবরের কাগজ: অর্থনৈতিক অঞ্চলে অটোমোবাইলশিল্পের সম্ভাবনা কেমন?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট স্থাপনের সুযোগ বিশাল। আমাদের দেশে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট নেই। আমরা শুধু সংযোজন করি। এখানে ভ্যালু অ্যাডিশনের অনেক সুযোগ আছে। তবে এর জন্য সরকারকে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি কমানোর পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। যেন দেশীয় শিল্প গড়ে ওঠে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থান্তরের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের অটোমোবাইল খাত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে।
খবরের কাগজ: চালক ও এ খাতের শ্রমিকদের জন্য আপনারা কী করছেন?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: আমরা আমাদের গ্রাহকদের সেবার জন্য ২০টি নিজস্ব ওয়ার্কশপ ও সার্ভিস সেন্টার পরিচালনা করছি। সেখানে আমরা কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিই। ‘ওস্তাদ’ নামে একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা কর্মীদের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টুলসের ব্যবহার শেখাই। আমরা চালকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছি।
খবরের কাগজ: অটোমোবাইল খাতের উন্নয়নে কোন প্রযুক্তিগুলো প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট আমাদের এই সেক্টরে একদম নেই। গবেষণা ক্ষেত্রে আমারা অনেক পিছিয়ে আছি। এই ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। ইলেকট্রিক ভেহিকেলের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগ প্রয়োজন।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশে অটোমোবাইল তৈরি হলে বা প্ল্যান্টের কার্যক্রম শুরু হলে দেশের বেকার সমস্যা সমাধানে এ শিল্প কতটা ভূমিকা রাখবে বলে আপনি মনে করেন?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: অটোমোবাইল প্ল্যান্ট স্থাপিত হলে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আমরা যদি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব তাদের এখন বিদেশি তৈরি বা আমদানি করা ভারী যানবাহনের প্রয়োজন হয় না। তারা স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই তাদের চাহিদা পূরণ করে। আমার মনে হয়, আমাদের দেশেও তেমন সম্ভাবনা আছে। এর সঙ্গে স্পেয়ার পার্টস, টায়ার ও হুইল শিল্পের মতো আনুষঙ্গিক শিল্পও বিকশিত হবে। আমরা বর্তমানে যে ফিল্টার বাইরে থেকে আমদানি করি, সেগুলো দেশেই তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে গ্রাহকরা সেরা পণ্যটি পাবে।
খবরের কাগজ: এখানে অটোমোবাইলশিল্প গড়ে উঠলে রপ্তানির সুযোগ কেমন?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: আপনারা দেখবেন কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা বাণিজ্যিক সেগমেন্টের গাড়ি আমদানি করি, তবে ট্রাকের বডি স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হয়। কিছু ওয়ার্কশপ আছে যারা ট্রাকের বডি তৈরি করছে। এখন ভালোমানের বাসের বডিও তৈরি হচ্ছে, এমনকি মার্সিডিজ, ভলভো, স্ক্যানিয়ার মতো বাসের বডিও এখানে তৈরি হচ্ছে। ইফাদ বডির ভ্যালু অ্যাডিশন করে ভালো করেছে। আমরা যদি পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারি, তাহলে আফ্রিকান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি করতে পারব।
খবরের কাগজ: সরকারের কাছে আপনাদের চাওয়া কী?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: আমাদের প্রধান চাওয়া দুটি-নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন। প্রথমত, পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নীতি তৈরি করতে হবে এবং ফুয়েলের মান নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও উৎপাদন শিল্পকে সহায়তা করতে হবে।
খবরের কাগজ: নীতি নির্ধারণে বা ট্যাকনিক্যাল কমিটিতে আপনারা কীভাবে যুক্ত হতে চান?
আহমেদ শাহরিয়ার আনোয়ার: পলিসি তৈরিতে আমরা আমাদের মতামত দিতে চাই। শুধু আমদানিনির্ভর না থেকে আমরা বাংলাদেশে উৎপাদন করতে চাই। তাহলে আমাদের পলিসি সেভাবে তৈরি করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ অটোমোবাইলস অ্যাসেম্বলার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বামা) ও বাংলাদেশ ইলেকট্রিক মোবিলিটি অ্যাসিয়েশন (বেমা) নামের দুটি সংগঠনের মাধ্যমে আমরা কাজ করি। আমরা তাদের সদস্য। আমরা চাই, সরকার নীতি-নির্ধারণী কমিটি ও ট্যাকনিক্যাল কমিটিতে আমাদের অন্তর্ভুক্ত করুক।