কাজী আশিক উর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, রেনকন মোটরবাইকস লিমিটেড (সুজুকি)। দীর্ঘ সময় ধরে অটোমোবাইলশিল্পের সঙ্গে জড়িত। এ শিল্পের যাত্রা, নীতিগত বিষয়, বিনিয়োগ পরিকল্পনা, সমস্যা-সম্ভাবনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে।
খবরের কাগজ: বাংলাদেশের মোটরসাইকেলের যাত্রা সম্পর্কে কিছু বলুন?
কাজী আসিক উর রহমান: বাংলাদেশে অটোমোবাইলশিল্পের যাত্রা শুরু হয় মূলত ২০১৬ বা ২০১৭ সালের দিকে। প্রথম একটি আদেশ (এসআরও) জারি করা হলো। সেখানে মোটরসাইকেলশিল্পে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হয়। এর পর একটি বিজনেস পলিসি (নীতি) তৈরি করা হলো। এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। শিল্প মন্ত্রণালয় এই পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে মূল যে লক্ষ্য রেখেছিল তা হচ্ছে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ১০ লাখ মোটরসাইকের বাজার তৈরি করা। এজন্য প্রথম দিকে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা রেখে পলিসি তৈরি করা হয়। তখন থেকেই মূলত দেশে মোটরসাইকেলশিল্প প্রসারের উদ্যোগটি সামনে আসে। এ খাতের নতুন বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে।
/আবরার জাহিন
খবরের কাগজ: আপনারা যখন শুরু করলেন তখন কী ধরনের সম্ভাবানা দেখেছিলেন?
কাজী আসিক উর রহমান: মোটরসাইকেলশিল্পতে যখন উৎপাদন পর্যায়ে দেশীয় বাজার দখলের উদ্যোগ নেওয়া হলো তখন আমরা অনেক সম্ভাবনা দেখেছি। গত ১০ বছরের কিছু কম সময়ে দেশের মোটরসাইকেলশিল্পটি অগ্রগামী শিল্প হিসেবে দৃশ্যমান হওয়ার কথা। আমি না হওয়ার পেছনে কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। তবে সাদা চোখে যেটা মনে হয়েছে, এ খাতের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহী করার জন্য প্রথম দিকে যেসব পলিসি নেওয়া হয়েছিল পরে তা আর থাকেনি। ফলে সম্ভাবনার জায়গাটিও এখন অনেকটা মলিন।
খবরের কাগজ: বাধাগুলো কী কী?
কাজী আসিক উর রহমান: এ খাতটিকে প্রথমে লাইট ইঞ্জিনিয়ানিং খাত হিসেবে দেখা হয়েছিল। ২০২০ সালকে অটোমোবাইল ‘প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তার পরও কেন এ খাতটি পিছিয়ে গেল? এক কথায় যদি বলি, তা হচ্ছে দ্রুত কিছু পলিসি পরিবর্তন হয়েছে। আমরা যারা ব্যবসায়ী আছি, তারা নতুন একটি প্রকল্প নেওয়ার সময় ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করি। যখন দেখা গেল ১০ বছরের মধ্যে এ খাতের বিনিয়োগ হবে এমন পলিসিগুলোর পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, তখন আর এটি বিনিয়োগের পর্যায়ে থাকেনি। উদ্যোক্তা হিসেবে তখন আমরা ধাক্কা খেয়েছি। ফলে এই মার্কেটটি যখন মুভিং পর্যায়ে যাওয়ার কথা, সেখানে আমরা পিছিয়ে গেছি। বাধাগুলোর মধ্যে এ সেক্টরে নতুন বিনিয়োগে কর অব্যাহতি ছিল, ভ্যাট সহনীয় পর্যায়ে ছিল, পর্যায়ক্রমে এগুলো সবই উঠে গেছে এখন।
খবরের কাগজ: কর অব্যাহতি আরও কিছু দিন রাখা উচিত ছিল কি না?
কাজী আসিক উর রহমান: নতুন যেকোনো শিল্পকে স্বাবলম্বী করার জন্য অবশ্যই এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের কিছু না কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতেই হবে। প্রথম পর্যায়ে দেশের মোটরসাইকেল বাজারকে ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১০ লাখে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেই ধারাটি অব্যাহত থাকলেই কেবল এ শিল্প পরিপূর্ণতা পেত। কিন্তু পলিসিগত জটিলতার কারণে উদ্যোক্তারাও নতুন করে আসেনি, ফলে এ বাজারটি ছোট হয়ে গেছে। পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, ক্রেতারাও চলে গেছে।
কর অব্যাহতি সুবিধা বন্ধের কারণে শিল্পোউদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সময়ে যে পলিসিগত পরিবর্তন এসেছে সেগুলো করার সময়ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে করা হয়নি। এখানে বিনিয়োগের একটা বিষয় আছে। কর অব্যাহতি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই মোটরসাইকের দাম কম থাকত। কিন্তু উল্টো হওয়ায় এখন পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে ভলিউম অব প্রোডাকশন কমে গেছে। এখন আমাদের প্রোডাকশন কমে গেলে সরকার তো আর আগের মতো কর পাবে না, ফলে সরকার যে উদ্দেশ্যে এ পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর বসিয়েছিল, তার সুফল কিন্তু পায়নি।
গত ৫ বছরে পলিসির ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের কারণে বিজনেস প্ল্যানটা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ভ্যাট মওকুফ ছিল। এর পর ১৫ শতাংশ ভ্যাট চলে এল। বলা হয়েছিল, ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট ফ্রি থাকবে, সেটিও হয়নি। কাস্টমস ডিউটিগুলো সহনীয় হবে। কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে ভ্যাট বসল। ২০২০ সালের পর থেকে ভ্যাট মওকুফের বিষয়টি উঠে গেল।
খবরের কাগজ: বর্তমানে মোটরসাইকেলের বাজার কেমন?
কাজী আসিক উর রহমান: আমরা বিজনেস চালাতে গিয়ে যে সমস্যাটি মোকাবিলা করেছি তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজস্ব আহরণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। আমরা ২০১৮ সালে মোটরসাইকেল তৈরির লাইসেন্স পেয়েছি। এই সাত ও আট বছরে অসংখ্যবার এই পলিসি পরিবর্তন হয়েছে। পলিসিগুলো আমাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে খুব বেশি এগিয়ে নিতে পারেনি। এর ফল কিন্তু ভয়ংকর। ২০১৮ সালে আমাদের বাজারের সাইজ ছিল ৫ লাখ পিস মোটরসাইকেল। কোভিড-১৯-এর সময় ২০২০ সালে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার, ২০২১-২২-এ এই সংখ্যা ৬ লাখে উঠে এল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এটি ৪ লাখের বেশি হতে পারেনি।
এখন এই ৪ লাখের নিচে নেমে আসার ফলে, এই শিল্পের জন্য যে বিনিয়োগটা সেটা নিরাপদ হয়নি। আমি যদি বলি, একটি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়া মানে শুধু সেই সেক্টরে উদ্যোক্তাকে সুবিধা দেওয়া নয়। এ শিল্পের অন্যান্য বিষয়গুলোকেও এগিয়ে নেওয়া বোঝায়। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষ জড়িত।
খবরের কাগজ: ডলারসংকটরে কারণে আমদানি জটিলতা কি এখন আছে?
কাজী আসিক উর রহমান: ডলারসংকটের বিষয়টি আমরা ২০২২ সালের মাঝামাঝি থেকে মোকাবিলা করছি। এখন এ সমস্যাটি অনেকটা কেটে গেছে। আমরা এখন আমাদের কর্ম-পলিকল্পনা পরিবর্তন করেছি। আগে যে পণ্য আমদানি করার জন্য সাত দিন আগে পরিকল্পনা করতাম, এখন সেটি এক মাস আগে করি। ফলে ডলারসংকট আমরা এখন খুব বেশি মোকাবিলা করছি না।
খবরের কাগজ: এ শিল্পে প্রযুক্তি ব্যবহার কেমন, যেসব মোটরসাইকেল তৈরি হয় সেগুলো কি আন্তর্জাতিক মানের কি না?
কাজী আসিক উর রহমান: এ শিল্প যতটুকু সম্প্রসারিত হয়েছে পুরোটাই আন্তর্জাতিকমানের পণ্য তৈরি করেই এগিয়েছে। দেশের বাজারে যে ব্র্যান্ডগুলো আছে, সবগুলোই আন্তর্জাতিকমানের। প্রতিনিয়তই আমরা নতুন নতুন মডেলের বাইক ক্রেতাদের দেওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা নতুন মডেলের বাইক তৈরি করতে চাইলে প্রথমে সেটি তৈরি করে জাপানে পাঠাতে হয়। সেখানে বিশ্বের সব নতুন মডেলের বাইক পরীক্ষা করা হয়। সব বাইকের মান একই রেখে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। সুজুকি নতুন বাইকটিকে ন্যূনতম তিন থেকে ছয় মাস সময় নিয়ে এর মান পরীক্ষা করে। তাদের পক্ষ থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পরই আমরা সেটি দেশের বাজারের জন্য উৎপাদনে যেতে পারি।
এ ছাড়া দেশীয়ভাবে যেসব বাইক তৈরি হচ্ছে সেগুলোর মান পরীক্ষার জন্য বিআরটিএ, বুয়েট থেকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। ফলে এখানে যে কয়টিই বাইক তৈরি হোক না কেন সবই আন্তর্জাতিকমানের।
খবরের কাগজ: মোটরসাইকেলশিল্পের কতটুকু সম্ভাবনা আছে?
কাজী আসিক উর রহমান: ১৮ কোটি মানুষের দেশ। সেখানে আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। আমরা খুবই আশাবাদী। একটি মোটরসাইকেল তৈরির জন্য শুধু যে একটি কারখানা প্রয়োজন তা কিন্তু নয়। এ শিল্পের সঙ্গে অনেকগুলো ‘ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রি’ জড়িত।
এখানে কেউ লাইট বানাবে, কেউ সিট বানাবে, কেউ বিয়ারিং বানাবে। এর সঙ্গে অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিল্প যুক্ত। সেখানে কর্মসংস্থান হবে- সেই উদ্দেশ্যেই এ শিল্পটাকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পলিসিগত জটিলতার কারণে এখন মূল শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ ইন্ডাস্ট্রিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খবরের কাগজ: ইকোনমিক জোনগুলো এ শিল্পের অগ্রগতিতে কতটা সহায়ক হবে?
কাজী আসিক উর রহমান: এ ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করা উচিত। আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। ইকোনমিক জোনগুলো যারা নতুন বিনিয়োগে আসবে তাদের জন্য খুবই ভালো হবে। কিন্তু যারা এরই মধ্যে ইকোনমিক জোনের বাইরে বিনিয়োগ করে ফেলেছে তাদের জন্য তাহলে কী হবে? তাদের জন্যও সরকারকে ভাবতে হবে। ফলে এখানে সর্বপ্রথম কথা হচ্ছে- সরকারের পলিসিগত সুবিধাটা বিনিয়োগবন্ধব করতে হবে।