সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন, মাস দুয়েক পর উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাবেন রাজধানীর শাহজাহানপুরের বাসিন্দা জারিফ ফেরদৌস। বিগত বছরের মতো এবারও একমাত্র বোনকে বই উপহার দেওয়ার ব্যত্যয় ঘটাননি। তবে এবার শুধু উপহার দিচ্ছেন ইসলামি বই। একমাত্র ছোট বোনের জন্য কিনেছেন মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান ‘গল্পে গল্পে ছোটদের হাদিস’ বইটি।
মেলার ১৮তম দিন গতকাল মঙ্গলবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সের সামনে কথা হয় জারিফের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি প্রতি বছরই বইমেলা থেকে আমার বোনকে কোনো না কোনো বই উপহার দিই। মূলত ক্লাসিক সাহিত্যের বইগুলো তাকে বেশি দেওয়া হতো। যেহেতু, আমরা মুসলিম; আমাদের ধর্ম সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান থাকা খুব দরকার। তাই, এবার সেই জায়গা থেকে সরে এসে ইসলামিক বই উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেই থেকে গল্পে গল্পে ছোটদের হাদিস বইটি কিনা।’
তার সঙ্গে কথা বলার পর পাঠক-দর্শনার্থীতে মুখর থাকা গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সের স্টলের বিক্রয়কর্মী আমানত উল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ মেলে। আমানত উল্লাহ বলেন, ‘আজকে আমাদের ভিড় কমই বলা চলে। আমাদের স্টলে দর্শনার্থীর চেয়ে বই কেনা পাঠক সংখ্যা অনেক বেশি। স্টলে হাজির হয়ে পছন্দের বইয়ের খোঁজ করছেন। এবার কায় কাউসের লেখা ইতিহাসের ছিন্নপত্র- ৩য় খণ্ড, দীপ্র হাসানের অ্যাপোক্যালিপস, মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার অপারেশন আল আকসা ফ্লাড বেশ ভালো চলছে। এ ছাড়া প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ, স্মার্ট প্যারেন্টিং উইথ মুহাম্মদ (সা.), সিক্রেটস অব জায়োনিজম- এই বইগুলো পুরোনো হলেও বেশ চলছে।’
বিগত কয়েক বছর বইমেলায় অজ্ঞাত কারণে অংশ নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি বলে জানান গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্সের কর্মচারী সাদ্দাম হোসেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কয়েক বছর হবে, আমরা মেলায় স্টল বরাদ্দ পাইনি। এবার পেয়ে বেশ ভালো লাগছে যে, আমরা আমাদের পাঠকদের কাছে পৌঁছাতে পারছি, তারাও বেশ ভালো সাড়া দিচ্ছেন। এবারের মেলায় ১০-১৫টি নতুন বই ইতোমধ্যে এসেছে, সামনে আরও কয়েকটি চলে আসবে, সবমিলিয়ে প্রায় ৬৫টির মতো নতুন বই আসবে।’
এদিকে দীর্ঘ ১৭ বছর পর মেলায় অংশ নিতে পেরেছে মোহাম্মদী লাইব্রেরি। প্রকাশনীটির প্রকাশক সাদিক উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০০৮ সালে আমরা সবশেষ মেলায় অংশ নিতে পেরেছিলাম। অনেকবার স্টল বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিলাম কিন্তু স্টল বরাদ্দ হয়নি। যারা ইসলামি প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, তারা বাংলা একাডেমির সঙ্গে একাধিকবার বসলেও মেলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সেই সময় তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, বায়তুল মোকাররম মসজিদে সব ইসলামি প্রকাশনা নিয়ে পৃথক বইমেলার আয়োজন করা হবে। এতদিন পরে মেলায় ফিরতে পেরেছি, এটাই তো অনেক।’
এ বছর মেলায় ১১৮টি ইসলামি প্রকাশনা অংশ নিচ্ছে বলে জানান মোহাম্মদী লাইব্রেরির বিক্রয়কর্মী মো. সাইফ। যদিও এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য বাংলা একাডেমির কাছে নেই। সাইফ বলেন, ‘১১৮টি ইসলামি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। দু-একটি কম বেশি হতে পারে।’
মোহাম্মদী লাইব্রেরির মতো ইসলামি ছাত্রশিবিরের প্রকাশনী আইসিএস পাবলিকেশন্স ১৯ বছর পর এবার মেলায় অংশ নিতে পেরেছে। গড়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার বই বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেন, আইসিএস পাবলিকেশন্সের কর্মচারী ওয়াহিদুজ্জামান আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই আমাদের এক থেকে দেড় লাখ টাকার বই বিক্রি হচ্ছে। মেলায় প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ আসছেন, বই কিনছেন। সবমিলিয়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি।’
গত বছরের মতো এবারও অংশ নিয়েছে সত্যায়ন প্রকাশন। প্রকাশনীটির বিক্রয়কর্মী তারেকুল ইসলাম বলেন, ‘এবারের মেলায় আমাদের নতুন দুইটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ফরায উদ্দিন ফারহানের ‘প্রচেষ্টা’ ভালো চলছে। আরেকটি আসবে মিজানুর রহমান আজহারির বই কোরআনকে নিয়ে, এই বইটি না আসার আগেও বেশ সাড়া পাচ্ছি, অনেকেই খোঁজ করছেন। আশা করছি, এবারের মেলা বিগত বছরগুলোর তুলনায় আরও ভালো বিক্রি হবে।’
প্রকাশনার ১৩ বছর হলেও এবারই প্রথম মেলাতে স্টল দিয়েছেন মাকবাতুল হেরা। বই বিক্রি মূল উদ্দেশ্য নয় বরং মানুষ বই পড়ুক এবং ইসলামের প্রতি সচেতনতা বাড়ুক উল্লেখ করে প্রকাশনিটির ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আরবি কিতাবের বইয়ে আমরা অনেক সমৃদ্ধ, বিভিন্ন মাদ্রাসাতে আমাদের বই পড়ানোও হয়। এবারই মেলায় অংশগ্রহণ প্রথম আমাদের। আমরা চাই, মানুষ বইমুখী হোক, সচেতনতা বৃদ্ধি পাক।’
বিক্রি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানুষ বইয়ের নাম ধরে স্টলে আসছেন। অমুক বই আছে কি-না, এটি একটি ভালোলাগার বিষয় যে, একটু হলেও মানুষের ইসলামি বইয়ের প্রতি আর্কষণ রয়েছে।’
এখন পর্যন্ত নতুন বই ১৭২৩টি: বইমেলার ১৭তম দিনে নতুন বই এসেছে ৭৯টি। গত সোমবার এ সংখ্যা ছিল ১১৩টি। এ নিয়ে এবারের বইমেলায় প্রকাশ হওয়া নতুন বইয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ৭২৩ টিতে। গতকাল মঙ্গলবার গল্প ১৪টি, উপন্যাস ৬টি, প্রবন্ধ ৫টি, কবিতা ৩৫টি, গবেষণা ৪টি, ছড়া ৩টি, শিশুসাহিত্য ৩টি, জীবনী ৪টি, বিজ্ঞান ২টি, ভ্রমণ ২টি, ইতিহাস ৫টি, রাজনীতি ২টি, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১টি, ধর্মীয় ২টি, অনুবাদ ১টি, সায়েন্স ফিকশন ২টি এবং অন্যান্য ১৩টি বই নতুন এসেছে।
গতকাল বিকেল ৪টায় হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বেলাশেষের শহীদ কাদরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তারানা নূপুর এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শামস আল মমীন এবং আহমাদ মাযহার। এদিকে লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি হাসান হাফিজ এবং গবেষক খান মাহবুব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি মো. ফজলুল হক এবং কবি আশিকুল কাদির। এ ছাড়া ছিল মো. মিজানুর রহমানের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা’ এবং সবুজ শামীম আহসানের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কৃষ্টিবন্ধন’ এর পরিবেশনা।