ফাল্গুনের তপ্ত রোদেও যেন একচিলতে বসন্তের হাওয়া বয়ে গেল অমর একুশে বইমেলা প্রাঙ্গণে। ছুটির বিকেলের পড়ন্ত আলোয় মেলার প্রতিটি ধূলিকণা যেন কথা বলে উঠল। মন-খারাপ করা গুমোট আবহাওয়া কাটিয়ে শনিবারের (৭ মার্চ) বইমেলা রূপ নিয়েছিল এক প্রাণোচ্ছল মিলনমেলায়। পাঠক, লেখক আর প্রকাশকদের সরব উপস্থিতিতে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল জীবন্ত সাহিত্যবাসর।
এবারের মেলায় পাঠকদের রুচিতে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। স্টলগুলোতে ভিড় জমানো পাঠকদের বড় একটি অংশই খুঁজে ফিরছিলেন সমকালীন সাহিত্য এবং সিরিয়াস গবেষণাধর্মী বই। তবে চিরায়ত উপন্যাসের আবেদন যে বিন্দুমাত্র কমেনি তা বোঝা যাচ্ছিল পাঠকদের মগ্ন হয়ে বইয়ের পাতা ওল্টানো দেখে। কেউ কেউ আবার প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে খুঁজছিলেন নতুন লেখক বা উদীয়মান কবিদের বই।
মেলার মাঠ কেবল কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, হয়ে উঠেছিল লেখক-পাঠকের সরাসরি যোগাযোগের সেতু। বেশ কয়েকজন লেখককে দেখা গেল পাঠকদের আবদারে হাসিমুখে সেলফি তুলতে দিতে। তবে শুধু ছবি তোলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই মিলনমেলা। স্টলে স্টলে ছিল প্রাণবন্ত আড্ডা।
মেলার মূল আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন স্টলের কোনায় চলা সাহিত্যিক তর্ক-বিতর্ক। লেখকরা মেতেছিলেন এক চিরন্তন তর্কে, ‘যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ কে কীভাবে সাহিত্যে রূপদান করছেন?’ কেউ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন বাস্তবতাকে, কেউবা পরাবাস্তবতাকে। জীবনের সুখ-দুঃখের গল্পগুলো কলমের আঁচড়ে কতটা নিপুণভাবে ফুটে উঠছে, তার চলছিল প্রাণবন্ত ব্যবচ্ছেদ। সব মিলিয়ে, গতকাল শনিবারের বিকেলটি কেবল বই কেনার দিন ছিল না, বরং তা ছিল সৃজনশীলতা আর পারস্পরিক বিনিময়ের এক উৎসবমুখর সময়।
রাজধানীর মালিবাগ থেকে এসেছিলেন শ্রাবণী হালদার। তিনি ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে কিনেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘কথাসাহিত্যসমগ্র’। বইটি প্রসঙ্গে ঐতিহ্য বলছে, প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক-গবেষক-অনুবাদক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথাসাহিত্যিক পরিচয় অনেকেরই অজানা। তার কথাসাহিত্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। তার গল্প ও উপন্যাসে আছে সময়-সমাজ আর মানুষের টানাপোড়েন ও উজ্জীবনের কথা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনন্যার স্টলের সামনে দেখা গেল জটলা। আলোচনার লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের বই ‘খালেদা’। লেখক-সমালোচক মহিউদ্দিন আহমদ ‘খালেদা’-বইটিতে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিজীবনের চেয়ে তার রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতনকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স থেকে স্ত্রীর জন্য আহসান হাবীবের থ্রিলার ‘এ ইউ’ কিনেছেন ব্যাংকার রাজিব হালদার। বাস্তব ঘটনাকে উপজীব্য করে আহসান হাবীব রোমাঞ্চকর বয়ানে থ্রিলার ‘এ ইউ’ লিখেছেন। বইটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারটি চুরি হওয়াকে কেন্দ্র করে।
প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক মুস্তফা মজিদের ছড়াগ্রন্থ ‘ছড়ায় ছন্দে রঙ বেরঙ’ এসেছে আগামী প্রকাশনী থেকে। বইটিকে বলা যায়, সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির ধারালো দর্পণ। বইটির অন্যতম আকর্ষণ হলো বরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবীর প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র আবিদ আনোয়ার কিনেছেন অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহানের ‘রিফ্লেকশনস অন দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব বাংলাদেশ’ বইটি। বইটি মেলায় এনেছে মাওলা ব্রাদার্স। এতে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতির নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়েছেন লেখক।
কবি জীবনানন্দ দাশের কাব্যভাবনা ও কাব্যজগতের চৌহদ্দি এবং বিশ্ববীক্ষার সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা সহজ নয়। কিন্তু সেই চেষ্টাই করে চলেছেন গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। জীবনানন্দ দাশের সনেট, দীর্ঘ কবিতা, প্রবন্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘জীবনানন্দ দাশ: জীবন ও কীর্তি’ শীর্ষক বইটি। এটি মেলায় এনেছে পাঠক সমাবেশ।
বিদ্যাপ্রকাশের স্টলে কথা হয় নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখক পলি শাহীনার সঙ্গে। এবার এই প্রকাশনী থেকে মেলায় এসেছে তার গল্পগ্রন্থ ‘না জীবন না মৃত্যু’। বইটিতে ব্যক্তিগত শোক, সামাজিক অবক্ষয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাস ও রাজাকারের নৃশংসতা এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে। এমনকি প্রবাসীর আত্মপরিচয়ের সংকটও বাদ পড়েনি। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এবারের বইমেলায় সপ্তম বই এল। বইমেলা উপলক্ষে আমি দেশে আসি। গত দুই বছর নানা কারণে দেশে আসতে পারিনি। এবার এসেই বইমেলায় এলাম।’
মেলার নানা আয়োজন
গতকাল শনিবার ছিল বইমেলার দশম দিন। বেলা ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ: নূরজাহান বেগম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসরাইল খান।
গতকাল বিকেলে ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুস্তফা মজিদ। আজ রবিবার বইমেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। আজ বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।