অমর একুশে বইমেলার আয়ু ফুরিয়ে আসছে। ক্যালেন্ডারের সংখ্যা বলছে, বাঙালির প্রাণের এই মিলনমেলা ভাঙতে আর মাত্র চার দিন বাকি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পলি জমে থাকা ধুলোমাখা পথে এখন বিদায়ের সুর, তবে সেই সুরে নেই বিষণ্ণতা, বরং শেষ মুহূর্তের প্রাপ্তি মেলাতে বইপ্রেমীদের ভিড় এখন তুঙ্গে।
বুধবার (১১ মার্চ) বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, পড়ন্ত বেলার তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে দলবেঁধে মেলায় আসছেন পাঠকরা। প্রথিতযশা প্রকাশনীগুলো শেষ সময়ে এসে তাদের তুরুপের তাসগুলো বের করছে। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক থেকে শুরু করে গবেষকদের নতুন নতুন বইয়ে সাজানো হচ্ছে স্টলের সামনের সারি।
এবারের মেলার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পাঠকদের সচেতনতা। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের মধ্যে ‘যা-তা’ বই না কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মেলায় ঘুরতে আসা এক তরুণীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুধু বাহারি মলাট বা স্টলকর্মীদের চটকদার কথায় তিনি আর ভুলছেন না। বই হাতে নিয়ে কয়েক পাতা উল্টে, বাক্য গঠন, বর্ণনাভঙ্গি আর কাহিনির গাঁথুনি পরখ করে তবেই বই কিনছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘বইয়ের সংখ্যা নয়, সাহিত্যগুণটাই আসল। কেবল সাজানো মোড়ক দেখে কেনা মানে তো ঠকা।’
মেলা ঘুরে দেখা গেল, সচেতন পাঠকদের পছন্দের তালিকায় এবার শীর্ষে রয়েছে রাজনৈতিক প্রবন্ধ ও তুলনামূলক বিশ্লেষণধর্মী বই। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ রয়েছে এমন বইয়ের চাহিদা সব থেকে বেশি। পছন্দের প্রকাশনীগুলোতে গিয়ে পাঠকরা নতুন বইয়ের পাশাপাশি সংগ্রহ করছেন পুরোনো ক্ল্যাসিক।
মেলার শেষ চার দিনে এসে বিক্রির গ্রাফ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় হাসি ফুটেছে প্রকাশকদের মুখে। একাধিক প্রকাশনী প্রতিনিধি জানালেন, প্রথম দুই সপ্তাহ প্রদর্শনী আর ঘোরাঘুরিতে কাটলেও এখন প্রকৃত পাঠকরা বই ব্যাগবন্দি করছেন।
বইয়ের স্তূপের মাঝে শুধু কেনাবেচাই নয়, মেলার মাঠে তরুণ লেখক ও কবিদের সরব উপস্থিতি পাঠকদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে। প্রিয় লেখকের সঙ্গে সেলফি তোলা কিংবা অটোগ্রাফ নেওয়ার পাশাপাশি সমকালীন সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় মুখর উদ্যানের কোণগুলো।
বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে, মেলা প্রাঙ্গণে মানুষের সারি ততই দীর্ঘ হচ্ছে। চার দিন পর এই মেলা শেষ হবে ঠিকই, কিন্তু পাঠকদের ব্যাগে করে ঘরে ফেরা নতুন বই আগামী এক বছর টিকিয়ে রাখবে প্রাণের এই স্পন্দন।
মেলার আলোচিত গল্প-উপন্যাস
বইমেলায় আগত পাঠকের চাহিদার তুঙ্গে রয়েছে ছোটগল্পের সংকলন ও উপন্যাস। পাঠকের সেই চাহিদা পূরণে বইমেলার শেষভাগে বিভিন্ন প্রকাশনী আনছে এসব বই।
বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য কবি রফিক আজাদের দশম প্রয়াণবার্ষিকী আজ ১২ মার্চ। কবির প্রয়াণবার্ষিকীতে প্রকাশনা সংস্থা স্টুডেন্ট ওয়েজ প্রকাশ করছে কবির অগ্রন্থিত প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও পত্রের সংকলন ‘কবিতাভাবনা ও অন্যান্য’।
গতকাল বিকেলে প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স থেকে আফসান চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘মিট্টি কা নাম’ কিনেছেন রাজধানীর গোপীবাগের বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন। এই উপন্যাসে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ এই তিন রাষ্ট্রের সম্পর্কের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান এবং বাঙালি-বিহারি দ্বন্দ্বের ট্র্যাজিক চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নালন্দা থেকে এসেছে হারুন হাবীবের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘ক্যাম্প কমরেড কমান্ডার’। এই উপন্যাসে উঠে এসেছে একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিদিনের জীবন, ক্ষুধা, ভয় আর অদম্য সাহসের গল্প। চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ভারতীয় সীমান্তের সেই শরণার্থী শিবির ও মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোর চিত্রায়ণ নতুন প্রজন্মের কাছে সেদিনের ভয়াবহতা ও বন্ধুত্বের গভীরতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সময় প্রকাশনী থেকে আসা মোস্তফা কামালের উপন্যাস ‘বিষাদ বসুধা’র দ্বিতীয় খণ্ড এবং দীপু মাহমুদের ‘ব্রেকআপ’ উপন্যাস দুটির চাহিদা বেশ ভালো বলে জানিয়েছেন প্রকাশক ফরিদ আহমেদ।
ইমদাদুল হক মিলনের নতুন গল্পের বই ‘মুখোশ পরা মানুষ’ গতকাল বইমেলায় এনেছে অন্যপ্রকাশ।
বইটির ব্লার্ব থেকে জানা যায়, এটি ভিন্নধর্মী কিছু গল্পের সংকলন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংঘাতময় ঘটনা নিয়ে ওয়াসি আহমেদের রচিত ‘কার্পাস মহল’ উপন্যাসটি পাঠককে কাছে টানছে। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। একই প্রকাশনী থেকে এসেছে মহাভারতের উপেক্ষিত এক চরিত্র পঞ্চপাণ্ডবদের প্রথম সন্তান ঘটোৎকচকে নিয়ে শংকর জলদাসের উপন্যাস ‘ঘটোৎকচ’। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে কিংকর আহসানের ‘মেঘডুবি’ উপন্যাসটি। তবে এই প্রকাশনীর এবারের আলোচিত উপন্যাস কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীমের উপন্যাস ‘আমরা হেঁটেছি যারা’। উপন্যাসের মূল পটভূমি আবর্তিত হয়েছে একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে, যে পরিবারের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে লেখক বৃহত্তর বাঙালি মানস এবং সময়ের বিবর্তনকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
আশির দশকের উত্তাল কবিতা ও রাজনীতির আখ্যান নিয়ে মুহিত হাসানের উপন্যাস ‘সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’ মেলায় এনেছে কবি প্রকাশন। উপন্যাসে দেখা যায়, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে কবিদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, তা এই উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়।
বিজ্ঞান লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর চার দশকের দীর্ঘ সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানমনস্ক যাত্রার নির্বাচিত সংকলন ‘বিস্ময় তাই জাগে’। বইটি গতকাল মেলায় এনেছে মাওলা ব্রাদার্স। বইটিতে বিজ্ঞানের বিচিত্র অনুষঙ্গ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান, মহাজাগতিক ভবিষ্যৎ, বুদ্ধিমত্তা ও বিলুপ্তি, জ্বালানি ও শক্তির মতো বিষয়-আশয় উল্লেখযোগ্য।