এবার একুশের বইমেলা শুরু থেকেই একধরনের দোদুল্যমানতার ভেতর দিয়ে পথ চলছে। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেলাটি বিলম্বে এবং সংক্ষিপ্ত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে। শুরুতে বাংলা একাডেমি মেলাটি আগাম বা বিলম্বিত–এর যেকোনো একসময়ে আয়োজনের পক্ষে মত দিয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এর কোনোটিই যথাযথ ছিল না। ফলে বইমেলাকে ঘিরে অযথা বিতর্ক, আলোচনা, অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি হয়, যা মোটেই কাম্য ছিল না। এই মেলার মূল ভিত্তি ২১ ফেব্রুয়ারি, একুশের চেতনা। ফেব্রুয়ারি থেকে সরে গেলে সেই চেতনার আবেগ, ঐতিহ্যের উজ্জ্বলতা এবং একুশের দেদীপ্যমান আলোর দীপ্তি কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে পড়ে। তাই নির্ধারিত সময়েই মেলা হলে সেটি হতো সর্বজনগ্রাহ্য, নির্ভার ও নির্মল এক সাংস্কৃতিক উৎসব।
এবারের মেলায় পাঠকের উপস্থিতি কম, বিক্রিও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। প্রকাশকরা জেনেবুঝেই অংশ নিয়েছেন একুশের চেতনা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার দায় থেকে। তবে ক্ষতির বিষয়টি শুধু মেলার অর্থনৈতিক হিসাব নয়, বরং এটি আমাদের সংস্কৃতির ক্রমাগত পরিবর্তনেরও প্রতিফলন। গত কয়েক বছরে আমরা ধীরে ধীরে মূলধারার সংস্কৃতি থেকে সরে যাচ্ছি। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। বইয়ের বাজারও ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতার সবচেয়ে স্পষ্ট চিত্র দেখা যাচ্ছে এবারের বইমেলায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক নীতি গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা এক গভীর অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যাব, যার প্রভাব পড়বে জাতিসত্তার ওপরও। তখন হয়তো আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ই ঝাপসা হয়ে যাবে।
আরেকটি বিষয়ও উল্লেখযোগ্য। মেলায় প্রায় ৬০০ অংশগ্রহণকারী থাকলেও সবাইকে প্রকাশক বলা হচ্ছে। কিন্তু একজন প্রকৃত প্রকাশকের যে দায়িত্ব ও পেশাগত মানদণ্ড থাকা দরকার, তা এদের অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। অনেকেই পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করছেন, কিন্তু তা প্রকাশযোগ্য কি না, তা যাচাই করেননি। এ ছাড়া যথাযথ সম্পাদনা ও প্রুফ দেখাসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিচ্ছেন না। ফলে ভুল বানান ও সম্পাদনাহীন অসংখ্য বই প্রকাশিত হচ্ছে, যা প্রকাশনাশিল্পের মানোন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তবু আশার কথা, কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এখনো সাহিত্যমূল্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সময় প্রকাশনও সেই চেষ্টার ধারাবাহিকতায় সাহিত্যমূল্য বিবেচনায় পাণ্ডুলিপি বাছাই করে, যথাযথ সম্পাদনা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বই প্রকাশ করে থাকে। পাণ্ডুলিপি নির্বাচনে সময় প্রকাশন মনে করে ভাইরাল লেখক বা জনপ্রিয়তা সহজ সূত্র নয়, বরং সাহিত্যমানই এখানে মূল বিবেচ্য।
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা বইমেলায় আসছেন, বই কিনছেন এবং সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার নীরব দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। কারণ শেষ পর্যন্ত পাঠকই জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎকে আলোকিত করে রাখেন।
লেখক: স্বত্বাধিকারী, সময় প্রকাশন। অনুলিখন: মুসতাক মুকুল