সাপ্তাহিক কর্মদিবসের প্রথম দিন ছিল গতকাল। ইট-কাঠের যান্ত্রিক নগরে কর্মব্যস্ত দিন শেষে বিকেল গড়াতেই অনেক মানুষের গন্তব্য এখন বইমেলা। শেষ বিকেলের হালকা রোদে মেলাপ্রাঙ্গণে ভিড় করেছেন নানা বয়সের বিভিন্ন শ্রেণির পাঠক।
রবিবার (৮ মার্চ) বিকেলে ইফতারের তাড়া ছিল। তাই মেলায় আড্ডার চেয়ে বই কেনার দিকে ঝোঁক ছিল বেশি। ব্যস্ততার মাঝেই পাঠকদের হাতে উঠে এসেছে সময়ের নানা ধরনের বই।
এবারের মেলায় তরুণ পাঠকদের রুচিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা কেবল ফিকশন বা উপন্যাসে সীমাবদ্ধ থাকছেন না। গুরুত্ব দিচ্ছেন দেশ, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাধর্মী বইকে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পাঠক মাশফিকা তাজনীন ইরা জানান, তার পছন্দ এসব বই। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি সাধারণত উপন্যাস পড়ি, তবে দুই বছর ধরে আমার পছন্দের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাজনীতি। দেশভাগের প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধ আর সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে লেখা বইগুলো খুঁজে পেতেই আজ মেলায় আসা।’
একটু পরেই মেলার ভিড়ে দেখা মিলল অন্যরকম দৃশ্যের। ক্রাচে ভর দিয়ে এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক মধ্যবয়স্ক পাঠক। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও প্রিয় বই খুঁজে নেওয়ার নেশা তার বিন্দুমাত্র কমেনি। আগে থেকেই ক্যাটালগ দেখে পছন্দের বইয়ের তালিকা করে এসেছেন তিনি। নিজের জন্য কিছু ধ্রুপদী উপন্যাস আর কবিতার বই কিনলেও তার মূল লক্ষ্য ছিল কন্যার শখ পূরণ করা।
বাতিঘর প্রকাশনীর সামনে দাঁড়িয়ে আবেগতাড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছোট্ট মেয়েটা বই খুব ভালোবাসে। ওর স্বপ্ন, ওর পুরো ঘরটা থাকবে বইয়ের স্তূপে ঠাসা। মেয়ের সেই ছোট্ট শখ পূরণ করতেই আজ মেলায় আসা।’
বাবার হাত ধরে আসা সেই ছোট্ট মেয়েটি অবশ্য অনেক ঘোরাঘুরির পর কিছুটা ক্লান্ত। পছন্দের বইগুলো বগলদাবা করে সে তখন শিশু চত্বরের এক কোণে বসে জিরিয়ে নিচ্ছিল।
মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, সময়ের তাড়া থাকলেও পাঠকদের এই বইপ্রীতি আর প্রিয়জনকে বই উপহার দেওয়ার আকুতি মেলাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছে।
গতকাল বাতিঘরের স্টলে আলোচনা জমে উঠেছিল বদরুদ্দীন উমরের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: বাঙলাদেশের কৃষক’ বইটি ঘিরে। এই বই কেবল ইতিহাস গ্রন্থ নয়, বরং এটি বাংলার কৃষি-কাঠামো এবং গ্রামীণ সমাজের পরিবর্তনের এক গভীর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ। বইটির মূল উপজীব্য হলো ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব। বদরুদ্দীন উমর ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে শ্রেণি-সংগ্রামের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন।
জাগৃতি থেকে এসেছে ঝর্ণা রহমানের ‘আমার গানের মৌমাছিরা’। বইটি মূলত লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে সংগীতের যে নিবিড় সম্পর্ক তার এক আশ্চর্য বয়ান। সংগীত সঞ্চয়ের ধারাক্রম বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক সমসাময়িক সমাজ, চলচ্চিত্র, সভ্যতা এবং মানুষের মনস্তত্ত্বে সংগীতের প্রভাবকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাঙ্গালা গবেষণা এনেছে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ‘রচনাবলী-১’। বইটির মুখবন্ধে তিনি লিখেছেন, ১৯৭৮-৮০ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে এই বইতে।
অনুপম প্রকাশনী এনেছে মৃত্যুঞ্জয় রায়ের ‘সুন্দরবনের অণুজীব বৈচিত্র্য’। বইটিতে সুন্দরবনের মাটিতে, জলে, এমনকি মরা কাঠ বা প্রাণীর দেহে বাস করা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল এবং প্রোটোজোয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
বেশ কয়েক বছর ধরে রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাস লিখছেন পলাশ পুরকায়স্থ। সিলেটের নিভৃতচারী এই লেখক বইমেলায় আসেন কালেভদ্রে। অথচ তার উপন্যাস নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে তরুণ পাঠকদের। এবার প্রকাশনা সংস্থা প্রতীক এনেছে তার থ্রিলারধর্মী উপন্যাস ‘মানিটো আওয়াসিস’। এ উপন্যাসে লেখক রেড ইন্ডিয়ানদের (শাউন গোত্র) সংস্কৃতি এবং তাদের বিশ্বাসকে তুলে ধরেছেন। ছায়ামানব বা শ্যাডো পিপলদের নিয়ে যে গা ছমছমে আবহ তৈরি করা হয়েছে, তা পাঠককে শেষ পর্যন্ত বইয়ে আটকে রাখবে। বইটি পাওয়া যাবে অবসরের স্টলে।
গবেষক বিলু কবীরের সম্পাদনায় সংকলনগ্রন্থ ‘রাণু ও রবীন্দ্রনাথ’ বইমেলায় এনেছে পুঁথিনিলয়। বইটি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কিশোরী রাণু অধিকারীর (পরবর্তী সময়ে লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়) চিঠিপত্রের সংকলন।
এবার বইমেলায় অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে এসেছে ইসমাইল সাদীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তিন শব্দের চোখ’। কবি জানান, এই কাব্যগ্রন্থ তার দীর্ঘ দুই দশকের কাব্যসাধনার নির্যাস।
আলোচনা অনুষ্ঠান
গতকাল রবিবার ছিল বইমেলার ১১তম দিন। এদিন বিকেলে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘আসাদ চৌধুরী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আজিজুল হক।