রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে তিনস্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কমপক্ষে দুইহাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ৯টি ভবনের ১৭টি কেন্দ্রের ৯৯০ বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলেও জানানো হয়।
মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাকসু নির্বাচন কমিশনার, প্রক্টর ও রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
নির্বাচনের ভোট কেন্দ্রের ভবনগুলো হলো- মমতাজউদ্দিন অ্যাকাডেমিক ভবন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ কলা ভবন, সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অ্যাকাডেমিক ভবন, জাবির ইবনে হাইয়ান অ্যাকাডেমিক ভবন, জামাল নজরুল অ্যাকাডেমিক ভবন, সত্যেন্দ্রনাথ বসু অ্যাকাডেমিক ভবন। এ ছাড়া জগদীশ চন্দ্র অ্যাকাডেমিক ভবনে ২টি করে কেন্দ্র এবং জুবেরী ভবনে ১টি কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ৯টি ভবনের ১৭টি কেন্দ্রে নেওয়া হবে। এসব কেন্দ্রে ৯৯০টি বুথ স্থাপন করা হবে। ভোট গণনা করা হবে রাকসু কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে এবং ফলাফল ঘোষণা করা হবে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে। ভোট গণনার পুরো সময়টি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত থাকবে।’
নিরাপত্তার ব্যাপারে রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আবু সুফিয়ান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তায় আমাদের গোয়েন্দা দল কাজ করছে। যেহেতু ক্যাম্পাসের আয়তন অনেক বেশি। আমরা সেন্ট্রাল কেন্দ্রিক একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করব। ভোট গণনার জায়গাগুলো আমরা দেখছি এবং কোন জায়গায় কি ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে সেটি পর্যবেক্ষণ করছি। নির্বাচনের দিনে আমাদের প্রায় দুইহাজার সদস্য ক্যাম্পাসে কাজ করবে।’
নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে তিন স্তরের। প্রথমত- ভোট কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া, দ্বিতীয়ত- ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা দেওয়া এবং সবশেষে পুরো ক্যাম্পাসে কেউ পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশ করতে পারবে না।’
এদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সালেহ হাসান নকীব কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে একটি প্রেস কর্ণারের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘রাকসু নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নির্বাচন নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন এবং নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে দেশবাসীর প্রবল কৌতূহল রয়েছে। এ কৌতূহল মেটাতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীদের মাধ্যমেই সারা দেশ জানতে পারবে নির্বাচন কীভাবে হচ্ছে এবং নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে। মিডিয়া সেন্টারে ইন্টারনেট সংযোগসহ সকল প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখা হয়েছে।’
বৃষ্টি উপেক্ষা করে চলছে প্রচারণা
এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনভর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালিয়েছেন প্রার্থীরা। আবার কেউ কেউ লিফলেট ছাপাতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার দিন থেকে ভোট গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা করা যাবে। প্রচারণার সময় সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। গত রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ব্যালট নম্বর বরাদ্দ এবং রাতে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়। তবে ওইদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি থাকায় প্রচারণায় নামতে পারেননি প্রার্থীরা।
আনুষ্ঠানিক প্রচারণার দ্বিতীয় দিন সোমবার সকাল থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি। থেমে থেমে বৃষ্টি চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই প্রচারণায় নামে প্রার্থীদের অনেকে। তারা টুকিটাকি চত্বর, পরিবহন মার্কেট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনের ভ্রাম্যমাণ খাবার ও চায়ের হোটেলের ছাউনিতে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচার চালান। ইসলামী ছাত্রশিবির মনোনীত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ এর ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সকাল থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চত্বরে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ছাত্রদল মনোনীত প্যানেলের ভিপি, জিএস, এজিএসকেও ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় প্রচারণা চালিয়েছেন। একইসঙ্গে আরও বেশকয়েকটি প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচার চালিয়েছেন।
প্রচারণা করার একপর্যায়ে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ এর ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান (জাহিদ) সাংবাদিকদের বলেন, ‘আচরণবিধি লঙ্ঘন না হওয়ার পরও যারা আমাদের সমালোচনা করছে, তাদেরকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। তারা নিজেদের প্রচারণায় সময় ব্যয় না করে, আমাদের সমালোচনায় সময় ব্যয় করছে। আসলে এতে আমাদেরই একটা প্রচার হচ্ছে। আমরা কাঁধা ছুড়াছুড়ি করতে চাই না। আমরা নিজেদের কাজগুলো করে যেতে চাই। অনেক ছাত্রসংগঠন বিধি লঙ্ঘন করে আগেই লিফলেট বিতরণ করেছে, এটা আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় অভিযোগ করব।’
সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলের ১২ দফা ইশতেহার ঘোষণা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের জন্য ১২ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে ‘সর্বজনীন শিক্ষার্থী সংসদ’ নামের প্যানেল। ইশতেহারে অ্যাকাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান, রিসার্চ অ্যান্ড ইম্প্যাক্ট দপ্তর সৃষ্টি, খাবারে ভর্তুকি এবং ফুড অ্যান্ড পাবলিক হেলথ মনিটরিং গ্রুপ তৈরিসহ ১২টি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার পাঠ করেন প্যানেলটির সহসভাপতি (ভিপি) ভিপি প্রার্থী তাসিন খান। তাসিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক।
সংবাদ সম্মেলনে তাসিন খান বলেন, ‘রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমরা যতটুকু ক্ষমতা পাবো সে অনুযায়ী আমরা আমাদের ইশতেহার সাজিয়েছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার একবারে গোড়া থেকে কাজ করতে চাই।’
তাদের ইশতেহারের বিষয়গুলো হলো- শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে অন্তত ১০ বছর মেয়াদি অ্যাকাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে বাধ্য করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রিসার্চ অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট দপ্তর চালু করতে এবং এর মাধ্যমে বার্ষিক স্বচ্ছ রিপোর্ট প্রকাশ করতে বাধ্য করা, নির্বাচিত হওয়ার প্রথম ২ মাসের মধ্যে এক ট্যাপেই সব বিল পরিশোধ করা যায় এমন সেবা চালু করা, কার্যকর ও শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলা এবং তাদের সহায়তায় হলের খাবারে ভর্তুকি ও নতুন হল নির্মাণের তহবিল গঠন করা, নির্বাচিত হওয়ার প্রথম মাসের মধ্যে রাকসু নির্বাচনকে স্থায়ীভাবে ক্যালেন্ডারে যুক্ত করা, সিনেট কার্যকর করে এর মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগের জন্য চাপ প্রয়োগ করা।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের শিক্ষার্থীদের ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশে (আইইবি) অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘ফুড অ্যান্ড পাবলিক হেলথ মনিটরিং গ্রুপ’ তৈরি করা, সবার জন্য ইন্সটিটিউশনাল মেইলের ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকারি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমিউনিটি ফোরাম গড়ার নীতি ও বাস্তবায়নের দাবি তোলা, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থাকে শিক্ষার্থী নির্ভর করার প্রস্তাব দেওয়া, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়া।
অন্যান্য প্যানেলের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তাসিন খান বলেন, ‘নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী ক্লাস চলাকালীন সময়ে প্রচারণা চালানোর কোনো নিয়ম নেই। অনেকেই প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে প্রশাসন এখনো এর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা দেখতে পাচ্ছি রাজনৈতিক দলগুলো অনেকে মিলে প্রচারণা চালাচ্ছে। সেখানে আমরা মাত্র ১৯-২০ জন। তারা বিভিন্ন উপঢৌকন বা ফিস্টের আয়োজন করছে। এই জায়গাগুলোতে আমরা যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি তাদের তাল মেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে ও অসমতার দেখা দিচ্ছে।’
ভোট গ্রহণের দিন ও আগের দিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা
রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য দুইদিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আগামী ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে নির্বাচনের আগের দিন ও ভোটগ্রহণের দিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকবে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল আলম মাসউদ।
তিনি বলেন, ‘অ্যাকাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরের জন্য আগামী ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’
শাকিবুল/মেহেদী/