স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে বিবাহিত নারী-পুরুষ আলাদা থাকছেন কিংবা বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে। বর্তমানে অধিকাংশ বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে মেয়েদের পক্ষ থেকে। আমাদের দেশে আইন অনুসারে স্বামী তার স্ত্রীকে কোনো কারণ ছাড়াই তালাক দিতে পারেন। কিন্তু স্ত্রীর ক্ষেত্রে তালাকের এই বিষয়টি একটু ভিন্ন। সে বিষয়ে জানাচ্ছেন অ্যাডভোকেট সেলিনা আক্তার।
প্রথমত : বিয়ের সময় কাবিননামার ১৮ নং কলামে যদি স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতার কথা উল্লেখ থাকে, তাহলে স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক প্রদান করতে পারবেন। তবে কিছু বিধি-বিধান মানতে হবে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ নং ধারার নিয়ম অনুযায়ী, স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক দেওয়ার পর স্থানীয় ইউপি/পৌর/সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ পাঠাতে হবে। স্বামীকে ওই নোটিশের অনুলিপি প্রদান করতে হবে। চেয়ারম্যান সাহেবের নোটিশপ্রাপ্তির তারিখ থেকে নব্বই দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না। তবে চেয়ারম্যানের নিকট আপসের জন্য কোনো ধরনের নোটিশ না পাঠালে কিংবা কোনো পদক্ষেপ না নিলে ৯০ দিন শেষ হলেই তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। নোটিশ ছাড়া তালাক প্রদান করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। নোটিশ ছাড়া তালাক দিলে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে কিংবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এই নিয়মে স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা ফেরত পাবেন।
দ্বিতীয়ত : যদি কাবিননামার ১৮ নং কলামে স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দেওয়ার কথা উল্লেখ না থাকে, তাহলে খোলা তালাকের মাধ্যমে তালাক দিতে পারেন। খোলা তালাকটি শর্তসাপেক্ষ, স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতে তালাক হয়ে থাকে। এখানে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে থাকেন, স্বামী ওই প্রস্তাব মেনে নেন। স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার সময় স্বামী তার স্ত্রীর কাছ থেকে প্রতিদান নিয়ে থাকেন, স্ত্রী তা দিয়ে থাকেন বা দিতে সম্মত হন। তবে খোলা তালাকের ক্ষেত্রে দেনমোহরের কোনো চুক্তি না থাকলে তাহলে স্ত্রী মোহরানার কোনো কিছুই পাবেন না। এই তালাকের নিয়মে স্ত্রী ৩ মাস ইদ্দদকালীন সময় স্বামীর নিকট থেকে ভরণপোষণের টাকা পাবেন। যদি কোনো সন্তান থাকে, তাহলে সেই সন্তান নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত ভরণপোষণ পাবে।
তৃতীয়ত: ওপরের দুটি উপায়ের একটির মাধ্যমে তালাক দিতে না পারলে, পারিবারিক আদালতে গিয়ে ১৯৩৯ সালের মুসলিম আইনে তালাক করতে পারবেন। এই আইনে একজন স্ত্রী কী কী কারণে স্বামীকে তালাক দিতে পারেন তা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণগুলো হলো:
১. চার বছর পর্যন্ত স্বামীর কোনো খোঁজখবর না পাওয়া গেলে।
২. দুই বছর স্বামী-স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে ব্যর্থ হলে।
৩. মুসলিম পারিবারিক আইনের ১৯৬১ সালের বিধান লঙ্ঘন করে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করলে।
৪. স্বামীর সাত বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি কারাদণ্ড হলে।
৫. স্বামী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে।
৬. বিয়ের সময় পুরুষত্বহীন থাকলে এবং তা মামলা দায়ের করা পর্যন্ত বজায় থাকলে।
৭. স্বামী দুই বছর ধরে পাগল থাকলে অথবা কুষ্ঠ ব্যাধিতে বা মারাত্মক যৌন ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকলে।
৮. স্বামীর ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতার কারণে।
ওপরে যেকোনো এক বা একাধিক কারণে স্ত্রী আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারবেন। আমাদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে, স্ত্রী তার স্বামীকে তালাক দিলে স্ত্রী দেনমোহরের টাকা পাবেন না। এটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। দেনমোহর বিয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, ডিভোর্সের সঙ্গে নয়। স্বামী বা স্ত্রী যিনিই তালাক দিন না কেন, দেনমোহরের টাকা অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে।
মোহনা
.jpg)