তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে বর্তমান সময়ে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে ত্বরিত গতিতে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল একটি দেশে নারীরা যেখানে আজও অনেক পিছিয়ে আছে, সেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশ কিছু নারী নিজেদের জীবন বদলে দিচ্ছেন।
উদ্যোক্তা সালসাবিল সামিহা। তিনি অনলাইনে পেজ খুলে পোশাকের ব্যবসা শুরু করেন করোনার সময়। প্রথমদিকে একটু চড়াই-উতরাই পেরোতে হলেও এখন নিজের একটা পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। সামিহা জানান, তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিত অর্ডার পান। তার পেজের পণ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশ-বিদেশে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার তৈরি পণ্য দেশের নামকরা ব্র্যান্ড হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি সামিহা নিজেকে এভাবে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছেন তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার জন্যই।
শ্রাবণী আক্তার, আবৃত্তিশিল্পী। অনলাইনে তিনি আবৃত্তির কোর্স করান। একসঙ্গে বেশ কিছু স্টুডেন্টকে আবৃত্তি শেখাতে পারেন। এতে ঘরে বসেই বেশ ভালো টাকা উপার্জন করতে পারেন শ্রাবণী। তিনি জানান, আবৃত্তির প্রতি বর্তমান প্রজন্মের অনেক আগ্রহ আছে। বড়রা যেমন শিখতে আগ্রহী, তেমনি অনেকেই তাদের সন্তানদের এসব কোর্সে ভর্তি করান। অভিভাবকরা চান ছোটবেলা থেকেই তাদের সন্তানরা শিল্প সাহিত্যের সংস্পর্শে বেড়ে উঠুক। তা ছাড়া কারও যদি উচ্চারণের সমস্যা থাকে, আবৃত্তির চর্চা করার মাধ্যমে তা অনেকটাই দূর হয়ে যায়।
আরেকজন উদ্যোক্তা ফরিদা খানম। তিনি কেক বানিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করেন। অনলাইনে তার একটি পেজ আছে। সেখানে কেকের অর্ডার এলে তিনি ক্রেতার পছন্দমতো কাস্টমাইজ করে কেক বানিয়ে দেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থাকার সুবাদে তাকে এর জন্য আলাদা করে দোকান ভাড়া করতে হয়নি। এতে অনেক টাকা বেঁচে যায়।
অনলাইন ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম ‘গো গার্লস’। শুধু মেয়েদের নিয়ে পরিচালিত একটি ট্রাভেল গ্রুপ। ভ্রমণে যাদের নেওয়া হয়, তারাও মেয়ে। এর কর্ণধার সোনিয়া রিফাত বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার জন্যই এখন আমরা অনলাইনে এভাবে গ্রুপ তৈরি করে ভ্রমণ পরিচালনা করতে পারি। নাহলে কাজটা আগে এত সহজ ছিল না। আর নারীরাও সবার সঙ্গে ভ্রমণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বদৌলতে তারা বিশ্বস্ত জায়গা খুঁজে পেয়েছে এবং ভ্রমণ তাদের জন্য সহজ হয়েছে।’
সোনিয়া রিফাত, ফরিদা খানম কিংবা সালসাবিল সামিহার মতো এমন অনেক নারী আছেন, যারা অনলাইনের সদ্ব্যবহার করে উদ্যোক্তা হয়েছেন, স্বাবলম্বী হয়ে বদলে দিয়েছেন নিজেদের জীবন। তবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ এতটাও সহজ নয়। তাদের বিভিন্ন ধরনের বাধাও পেরোতে হয়।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীর প্রতিবন্ধকতাগুলো
২০২০ সালের মুঠোফোনবিষয়ক পরিসংখ্যান ও গবেষণাভিত্তিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান GSMA Intelligence-এর উপাত্ত থেকে জানা যায়, ৭০ শতাংশ পুরুষের বিপরীতে বাংলাদেশে ৪৩ শতাংশ নারী ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। আবার ৬১ শতাংশ পুরুষের বিপরীতে স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন ৩৪ শতাংশ নারী।
নারীর ডিজিটাল সাক্ষরতা, জ্ঞান, প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতার অনেক অভাব আছে। যে দেশে এখনো অনেক নারী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, সে দেশের নারীরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিছু নারী হয়তো অনেক শিক্ষিত না হলেও মোটামুটি অক্ষরজ্ঞান আছে বা স্কুল পাস করেছেন, কিন্তু তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে ভয় পান। প্রযুক্তি ব্যাপারটা তাদের কাছে অনেক কঠিন বিষয় মনে হয়। এতে করে অনেক নারী পিছিয়ে থাকছেন।
বাংলাদেশে এক দশকের বেশি সময় ধরে ই-কমার্সসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ও এর ব্যাপ্তি বেড়েছে। কিন্তু নারীদের জন্য এই প্ল্যাটফর্মটি এখনো সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। নারীরা অনলাইনে নানাভাবে বুলিংয়ের শিকার হন। তাদের জীবনযাপন, কাজ এসব নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া হয়। নারীর ছবি বিকৃত করে নারীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়। এমন অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নারীদের।
প্রতিবন্ধকতা দূর করার উপায়
ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় অর্জন নারীর অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ এবং কাজের বহুমাত্রিক পথ খুলে যাওয়া। নারীরা অনলাইনে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছেন, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ও দিচ্ছেন, মুঠোফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছেন, এমনকি আইনগত ও স্বাস্থ্যসেবাও অনলাইনের মাধ্যমে পাচ্ছেন। এটা খুব দারুণ ব্যাপার। কিন্তু নারীদের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মটাকে আরও বিস্তৃত ও ব্যবহার উপযোগী করে তোলার জন্য কিছু প্রতিবন্ধকতার সমাধান করা জরুরি।
উদ্যোক্তা ডালিয়া, তিনি অনলাইনে খাবার নিয়ে ব্যবসা করেন। কীভাবে এসব প্রতিবন্ধকতার সমাধান করা যায়, সে প্রসঙ্গে তিনি জানান, নারীদের ভেতর যেহেতু এখনো অনেক শিক্ষার অভাব রয়েছে সেহেতু সবার আগে নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। শুধু একাডেমিক শিক্ষা দিলেই হবে না, আলাদা করে তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জন্যও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
যেমন- কেক বানানো, হ্যান্ডমেড গহনা তৈরি, পোশাক নকশা করা ইত্যাদি।
তিনি আরও বলেন, অনলাইনে নারীরা বিভিন্ন ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন, এজন্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের নীতিমালা আরও কঠোর হওয়া উচিত। তাহলে নারীরা সুস্থ সুন্দর পরিবেশ পাবে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করার ব্যাপারে আরও উৎসাহী হবে। আর নারী স্বাবলম্বী হওয়া মানেই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা। অর্থাৎ নারীর স্বাবলম্বিতা শুধু নারীর জীবনই বদলে দেয় না, দেশেরও উন্নয়ন সাধন করে।
জাহ্নবী
.jpg)