নারী শব্দের সীমাবদ্ধতা, কুসংস্কারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এক নারী শিক্ষার্থী। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সামনের সারির ভূমিকা রাখার পর এবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসিন খান।
তাসিন খানের বাড়ি রাজশাহীর সাহেব বাজার এলাকায়। তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে রাবির সমন্বয়ক পরিষদের সদস্য ছিলেন। রাকসুর ৬৩ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী শিক্ষার্থী ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি ফেসবুকে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণার পরই ক্যাম্পাস জুড়ে রাকসু আলোচনায় যোগ হয় নতুন মাত্রা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে রাকসু প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর ১৪টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ১৫তম রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এখন পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো প্যানেল ঘোষণা হয়নি। তবে ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই কোন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, প্রার্থিতা ঘোষণা করে প্রচার শুরু করেছেন। ক্যাম্পাসে আলোচনা রয়েছে, বিগত নির্বাচনগুলোতে ভিপি পদে কোনো নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক তাসিন খান গত ২৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। সোমবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটে তার সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের।
তাসিন খান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ার পর মনে হয়েছিল আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না। কিন্তু বাস্তব জীবনে ফেরার পর আমি নিজের মধ্যে একটা পরিবর্তন খুঁজে পাই। সেটা হলো জীবনে হারানোর ভয় কাজ করে না। আমার বিবেকের দায়টা উপলব্ধি করেছি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে। এরপর ক্যাম্পাসে রাকসু নির্বাচনের আমেজ তৈরি হলে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। কিন্তু তখনো ভিপি পদে নির্বাচনের কথা চিন্তা করিনি।
ভিপি পদে নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, যখন ক্যাম্পাসে রাকসু নির্বাচনের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে তখন লক্ষ করি আলাপ-আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক সংগঠনগুলোই থাকছে। কিন্তু রাকসু তো কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম না। এটাকে আমরা একটি সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিনি। তখন আমার মনে হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীর জায়গা থেকে আমি ভিপি পদে নির্বাচন করতে পারি।
ক্যাম্পাসে নির্বাচনের পরিবেশ কেমন ও নারীদের জন্য কতটুকু উপযুক্ত এমন প্রশ্নের জবাবে তাসিন খান বলেন, রাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে অনেকের মধ্যে সঠিক ধারণা নেই। শিক্ষার্থীরা এটিকে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম মনে করছেন। প্রশাসন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও সচেতনতা তৈরি করতে পারেনি। অনেক নারী শিক্ষার্থী আছেন যাদের বুঝিয়েও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য রাজি করাতে পারিনি। তাদের মনে এই বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে যে, রাকসু একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সম্প্রতি দেখলাম একটা সংগঠন রাকসুর কোষাধ্যক্ষের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়ে গেটে তালা লাগিয়ে দিলেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমতাবস্থায় আমাদের নারী প্রার্থী কিংবা ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। এ ছাড়া নারী প্রার্থীদের সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে। প্রশাসন সাইবার বুলিং রোধে একটি কমিটি করেছে। তবে তাদের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো দেখিনি। নারী প্রার্থীদের যে সংখ্যা সেটিও সন্তোষজনক নয় এবং নারীদের ভোট কত শতাংশ কাস্টিং হবে, সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে।
রাকসু নিয়ে ইশতেহার সম্পর্কে জানতে চাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই সাবেক সমন্বয়ক বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রকৃত ধারণা, সেটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সবার আগে এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি শিক্ষাক্ষেত্র। এটাকে যদি আমি একটা উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তাহলে খাদ্য, আবাসনসহ সব সমস্যার সমাধান হতে পারে। আমি যেহেতু শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে পড়াশোনা করছি তাই এই জায়গায় পলিসিগুলো উন্নত করার জন্য কাজ করব। রাকসু নিয়ে আমি খুব দ্রুতই পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার ঘোষণা করব।
/এস লুপিন
.jpg)