ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ধানমন্ডিতে বহুতল ভবনে আগুন সময়টা কি তবে শেষ! রাসুল (সা.)-এর বর্ণনায় আজকের সমাজ বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন সুর-ছন্দের আন্তর্জাতিক মেলবন্ধনে মেতে উঠছে ঢাকা ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে সনি-স্মার্টের ‘গোল্ডেন গোল অফার’ শুরু প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই রাবি শিক্ষার্থীর গলায় ফাঁস চতুর্থবারের মতো সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ ওসি হলেন রতন শেখ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ৫ বছরের মেগা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ পশ্চিমবঙ্গে নতুন মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের জবাব সন্তোষজনক নয়, বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের নির্দেশ হাতে টর্চ-লাঠি ও বাঁশি নিয়ে রাতভর পাহারায় পঞ্চগড় সীমান্তের মানুষ ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় নতুন পথ বের হলো চীনা মহাকাশ স্টেশনে চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনের গল্প পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, সবাই নিহত ছয় দফা দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে পরিবেশ স্টার্টআপ তহবিল গঠনের প্রস্তাব জোবাইদা রহমানের আম উৎসব আয়োজন করল স্বপ্ন, সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে মৌসুমি আনন্দের ছোঁয়া সিলেট সীমান্তে সতর্কতায়ও থেমে নেই চোরাচালান, ৬৬ লাখ টাকার পণ্য জব্দ তিন ঘণ্টা পর জামালপুর-ঢাকা ট্রেন চলাচল শুরু শিল্পকলায় নতুন নাটকের উৎসব গোপালগঞ্জে দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনায় যোগ দিলেন ব্রাজিল সমর্থক শেষ বিশ্বকাপের আগে শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত নেইমার বান্ধবীকে ৩৭০ টাকার বিরিয়ানি খাইয়ে ‘উসুল’ করতে চেয়েছিলেন তরুণ কুমিল্লায় পুলিশের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় আটক ১৯ আগ্রাসী যমুনার তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি-জমিজমা রূপগঞ্জে মাদক দ্রব্যসহ ৬ কারবারি গ্রেপ্তার সালিশকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষে যুবক নিহত, আহত ২০
Nagad desktop

চাকাটা একা ছুটতে চেয়েছিল

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৫২ পিএম
আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৫৫ পিএম
চাকাটা একা ছুটতে চেয়েছিল
আঁকা মাসুম

রিকশাটা ধীরে ধীরেই চলছিল। কাঁচা রাস্তা। বৃষ্টি হওয়ায় বেহাল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ ধড়াম করে সামনের চাকাটা গর্তে পড়ে গেল। ব্যথা সামলিয়ে উঠতে না উঠতেই চেঁচিয়ে উঠল পেছনের দুই চাকা, ‘অ্যাই, দেখে চলতে পারিস না? তোর জন্য আমরা এখন আটকে গেলাম।’
সামনের চাকা রাগে গজগজ করে বলল, ‘সেটা রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করো না! আরে বাবা! আমি কি রিকশা চালাচ্ছি?’
‘তুই সামনে আছিস, দেখবি না একটু?’ ডান পাশের চাকাটা বলল। 
বাম পাশের চাকাটা মুখ ভেংচিয়ে বলল, ‘সামনে থেকে ঠিকমতো না পারলে ওখানে তোকে রেখেছে কী জন্য?’
গর্তটা মোটামুটি বড়ই। চালককে ভালোই বেগ পেতে হলো। ঘাম বেরিয়ে এল টেনে তুলতে। যদিও যাত্রী নেই রিকশায়, শুধু চারটা চালের বস্তা আছে। ভারি ওজন!
আবার চলতে লাগল রিকশাটা। সামনের চাকাটা পেছনে তাকায় না। সামনের দিকে ফিরে চলতে হয় তাকে। সে থাকে সবার প্রথমে। পেছনের দুই চাকা এজন্যই সহ্য করতে পারে না সামনের চাকাটাকে। মনে মনে হিংসায় জ্বলে ওরা। একটু সুযোগ পেলেই শুরু করে ঝগড়া। এই তো সেদিন সামনের চাকাটা পাংচার হয়ে গিয়েছিল। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চালকের রোজগার বন্ধ। বাম পাশের চাকা খেঁকিয়ে উঠেছিল, ‘তোর জন্য আমরা অকেজো হয়ে আছি। তোকে একটা লাথি মেরে সরিয়ে ফেলতে পারতাম যদি!’
অপমান গায়ে মেখেছিল সামনের চাকা। এমনিতেই পাংচার, তার মধ্যে ঝগড়া বাড়াতে চায়নি বেচারা। ডান পাশের চাকা আগুনে ঘি ঢেলে উসকে দেয়, ‘তোর জন্য আমাদের চালক বসে আছে। কতগুলো ট্রিপ মারতে পারল না। তুই যত নষ্টের গোড়া।’
দুই চাকার সঙ্গে একা ঝগড়া করে কুলাতে পারে না সামনের চাকা। সে সবসময় মিলেমিশে থাকতে চায়। পেছনের দুই চাকাকে সে খুব ভালোবাসে। ওদের মুখে শুনেছে, রিকশার পেছনে নাকি রঙিন ছবি আঁকা! দুটি ময়ূর পেখম মেলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে নাকি ভীষণ সুন্দর লাগে! সামনের চাকা যদিও পেছনে তাকিয়ে দেখতে পারে না সেই ছবি, তাও প্রশংসা করতে ভোলে না। এতেও ভুল বোঝে হতচ্ছাড়া পেছনের চাকারা। ওরা বলে, ‘খবরদার, তুই ময়ূরের ছবির দিকে তাকাবি না। অমঙ্গল হয় তোর কারণে। আমাদের বিপদে পড়তে হয় বারবার।’
কথাটা অবশ্য ঠিক না। যত দোষ নন্দ ঘোষ। পেছনের চাকারাও পাংচার হয়, খানাখন্দে আটকে যায়, টায়ার ফেটে যায়। কিন্তু কখনো ওদের দোষ ধরে না সামনের চাকা। ওরা তো সংখ্যায় দুই। আর সে একা। তাই লাগতে যায় না। কোনো দিন টুঁ শব্দটিও করেনি।
রাতের অন্ধকারে রিকশায় লাইট জ্বালানো হয়। লাইটটা ঠিক সামনের চাকার ওপরেই। সাঁই সাঁই করে রিকশা চলে অন্ধকারে। আর সামনের চাকাটাই শুধু আলোকিত হয়। পেছনের চাকারা অন্ধকারে থেকে যায়। ওরা আলো পায় না বলে রাগে ও হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে।
আর ভালো লাগে না সামনের চাকার। এভাবে আর কত দিন? পেছনের দুই চাকার বিদ্বেষপূর্ণ আচরণে আর রিকশায় থাকতে ইচ্ছা করে না তার। ইচ্ছা হয় কোথাও চলে যেতে, ছুটতে ইচ্ছা করে একা- যেখানে দোষ ধরবে না কেউ, ঝগড়া করবে না কেউ।
একদিন সত্যি সত্যি সামনের চাকার ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেল। তখন সকাল। চালক পেছনের দুই চাকায় তেল দিচ্ছিল। সামনের চাকায় একটুও তেল লাগায়নি। চালক খুব সুন্দর করে পরিষ্কার করল পেছনের চাকা দুটি। ন্যাকড়া পানিতে ভিজিয়ে বারবার মুছল। এমন যত্ন‌আত্তি দেখে পেছনের চাকারা গর্বে ফুলে উঠল যেন। সামনের চাকাকে তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘তোর দিকে তো আমাদের চালক ফিরেও তাকাচ্ছে না। হি হি হি! ঘটনা কী রে?’
আসলে ঘটনা হচ্ছে, চালক সামনের চাকার টায়ারটা খুলে ফেলেছে। নতুন টায়ার লাগাতে হবে তো তাই। চাকার প্রাণ কিন্তু টায়ারেই। সেই খুলে ফেলা টায়ারটা নিয়ে যায় চালকের ছোট্ট ছেলেটা। সামনের চাকার টায়ারটা যেন স্বাধীন হয়ে গেল। ছেলেটার সঙ্গেই থাকে সারাক্ষণ। ঝগড়া নেই, রেষারেষি নেই। কী যে আনন্দ! ছেলেটা টায়ার নিয়ে ছোটে রাস্তায়। হাত দিয়ে ঠেলে গতি বাড়ায়। ছুটতেই থাকে ছুটতেই থাকে। এভাবে একা ছুটতে পারায় সামনের চাকাটা কী যে খুশি! এটাই তো সে চেয়েছিল।

ঈদের ছড়া

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:১২ পিএম
ঈদের ছড়া
এঁকেছেন মাসুম

লাল গরু

আবদুল লতিফ 

বাবার সাথে গেল খোকা 
ঈদের পশুর হাটে 
নানান রকম পশু দেখে 
খোকার সময় কাটে। 

নানান রঙের নানান পশু 
নানান রকম শিং 
কারও গলায় ঘণ্টা বাজে 
টুংটাং টিংটিং।

টুকটুকে লাল একটা গরু 
শিং দুটো তার বাঁকা 
খুব সুন্দর দেখতে যেন 
রংতুলিতে আঁকা।

এমন গরু দেখে খোকার 
জুড়ায় দুই নয়ন 
সেই গরুটা দেখে বাবারও 
ভরে ওঠে মন।

লাল গরুটা কিনে নিয়ে 
ফিরল বাড়ি শেষে 
ফিরল বাড়ি বাবা-ছেলে
খুশির নায়ে ভেসে।

 


কোরবানির পশু কেনা

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম 

 

গেল খোকা
পশুর হাটে 
          ঈদের খুশি মনে,
লাল গরুটা
পছন্দ খুব
         দেখে জনে জনে।
খোকা বলে
কিনতে হবে
         এই গরুটা ভালো, 
ইয়া বড়
শিং আছে তার
         লেজখানি যার কালো।
মুচকি হেসে
বলেন বাবা
         নাও তাহলে এটা,
মনের খায়েশ 
পূর্ণ হলেই 
         আল্লাহ খুশি, ব্যাটা।

 

 


ঈদ এলে 

মো. দিদারুল ইসলাম 

 

ঈদ এলে ছেলে-বুড়ো রাত করে ভোর,
খুকুমণি হাতে তোলে মেহেদির ফোঁড়।

ঈদ এলে শহরের অলিগলি ফাঁকা,
অনেকেই ছেড়ে যায় রাজধানী ঢাকা।

ঈদ এলে সারা গাঁয়ে পড়ে যায় ধুম,
খোকনের চোখজুড়ে নাহি থাকে ঘুম।

ঈদ এলে গরিবের মনে নাই সুখ,
আঁখি সদা জলে ভরা দুখ আর দুখ।

ঈদ এলে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ নাই,
সকলেই মিলেমিশে ঈদগাহে যাই।

 


ঈদ এল গাই চলো!

শ্যামল বণিক অঞ্জন 

 

খুশির পরাগে সাজে প্রজাপতি মন
উল্লাসে শোরগোলে মাতোয়ারা ক্ষণ! 
আকাশের কোণে হাসে এক ফালি চাঁন
ঈদ এল গাই চলো সাম্যেরই গান!
কোলাকুলি গলাগলি বুকে রাখি বুক
ঈদে থাক সকলেরই হাসিভরা মুখ!

রেজার লাল গরু

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
রেজার লাল গরু
এঁকেছেন মাসুম

ফুরফুরে বাতাস আর কাঁচা মাটির গন্ধে রেজার মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। বাবা সরকারি চাকরি করেন বলে সারা বছর ইটের দেয়ালে বন্দি থাকতে হয়। কিন্তু এবারের ঈদটা একদম অন্যরকম। ফুলপুরে দাদাবাড়ি মানেই অন্য এক জগৎ। রেজার বাপ-দাদারা খাঁটি ‘ধানিপানি’ গেরস্ত। উঠানভর্তি ধানের গোলা আর গোয়ালভর্তি গরু–এসব দেখেই রেজা বড় হয়েছে গল্পের ছলে।
গ্রামে আসার পর থেকে রেজার দিন কাটছে চাচাতো ভাই মাহিরের সঙ্গে। ওরা দুজনেই ক্লাস ফাইভে পড়ে, যেন হরিহর আত্মা। মাঠ-ঘাট আর বন-বাদাড় চষে বেড়ানোই এখন ওদের প্রধান কাজ। ঈদের দুদিন আগে শুরু হলো আসল উত্তেজনা–গরু কেনা।
হাটে গিয়ে রেজার সে কী আনন্দ! চারদিকে শত শত গরু। এর মধ্যেই হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল। একটা গরুর খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সপাৎ করে রেজা একটা লাথি খেল। ব্যথা যতটা না লেগেছে, তার চেয়ে লজ্জা পেল বেশি। মাহির তো হেসেই কুটিপাটি! শেষমেশ চাচা এসে রেজার ধুলো ঝেড়ে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘আরে পাগলা। গরু তো একটু-আধটু গুঁতা-লাথি মারবেই। সাবধানে থাকতে হয়।’
অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাবা আর চাচা মিলে বিশালাকার একটা লাল টুকটুকে বলদ কিনলেন। যেমন তার শিং, তেমনি তার গায়ের রং। রেজা শুরু থেকেই তার ফোনে ছবি তুলছিল। হাটে যাওয়া, দরদাম করা, আর শেষে লাল গরুর সঙ্গে বীরের মতো দাঁড়িয়ে ছবি তোলা–কিছুই বাদ রাখল না সে।
বাড়ি ফিরে এসেই রেজার নতুন মিশন শুরু হলো। বাবা, চাচা-চাচি, আর দাদা-দাদিকে নিয়ে উঠোনে একটা দারুণ ফ্যামিলি সেলফি তুলল। তার পর সেই বিশাল গরুর ছবির সঙ্গে ক্যাপশন দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করল–‘এবার কোরবানিতে জেলার সবচেয়ে বড় গরু কোরবানি দিচ্ছি আমরা!’
পোস্ট দেওয়া মাত্রই লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। মুহূর্তেই ছবিটা ভাইরাল। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেই ‘বিশাল’ গরু দেখতে রেজার দাদাবাড়িতে ভিড় জমাতে লাগল। রেজা তো খুশিতে আত্মহারা!
কিন্তু গোল বাধল ঈদের আগের রাতে। চারদিকে চমৎকার জোছনা ফুটেছে। উঠোনটা যেন রুপালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রেজার দাদা, যিনি স্থানীয় মসজিদের ইমাম, সবাইকে নিয়ে সেই উঠানে বসলেন। তবে আজ দাদাকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে।
দাদা রেজার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘দাদুভাই, তুমি নাকি ফেসবুকে আমাদের কোরবানির খবর ছড়িয়ে দিয়েছ?’
রেজা গর্বের সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ দাদা! সবাই বলছে আমাদের গরুটা নাকি জেলার সেরা।’
দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘রেজা, কোরবানি তো কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। গরু কত বড় হলো, দাম কত হলো–এসব জাহির করার নাম কোরবানি নয়। আমরা যদি মনে লৌকিকতা রাখি, তবে সেই ত্যাগের কোনো মূল্য নেই। লোক দেখানো ইবাদতকে ইসলামে পছন্দ করা হয়নি।’
দাদার কথাগুলো রেজার মনে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, সে নিজের অজান্তেই একটা পবিত্র বিষয়কে স্রেফ প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে রেজার চোখের কোণ ভিজে উঠল। সে তখনই ফোনটা বের করল এবং সবার সামনেই ফেসবুক থেকে সেই ভাইরাল হওয়া পোস্ট আর ছবিগুলো ডিলিট করে দিল।
জোছনা রাতে দাদা আশীর্বাদের হাত রেজার মাথায় বুলিয়ে দিলেন। রেজা বুঝতে পারল, বড় গরু কেনায় নয়, মনের অহংকার বিসর্জন দেওয়াতেই কোরবানির আসল সার্থকতা।

ক্যাবলা আর কোরবানির গরু

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:০২ পিএম
ক্যাবলা আর কোরবানির গরু
এঁকেছেন মাসুম

সকাল থেকেই পাশের বাড়িতে যেন সাইরেন বাজছে, এমন উচ্চৈঃস্বরের প্যাঁ প্যাঁ ক্রন্দন।
পটলা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল। হ্যা, যা ভেবেছে তাই ঠিক। ক্যাবলাটাই এই ক্রন্দন-সাইরেন বাজাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা কী? একটু 
দেখতে হয়।  
দরজা খুলে পা বাড়াল পটলা। ক্যাবলার মেজো কাকার কাছে জানতে পারল, কোরবানির গরুর সঙ্গে সেই সকাল থেকেই ক্যাবলাটা দুষ্টুমি শুরু করেছে। হঠাৎ গরুর পিঠে উঠে বসায় গরুর ছোটাছুটি এবং ক্যাবলা চিতপটাং। তেমন কিছু ব্যথা না পেলেও কান্নার জোর ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সহ্য করতে না পেরে ওর বাবা কান্না-সন্ত্রাসের হাত থেকে বাঁচতে পাশের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। কত মানুষই তো কাঁদে, কিন্তু এমন বিশ্রী কান্না খুব একটা শোনা যায় না।
পটলা এগিয়ে গেল ক্যাবলার কাছে।
–কী রে, এখনো ফুল চার্জ? অনেক তো হলো, এবার থাম দেখি।
 পটলার কথা শেষ না হতেই বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি দিয়ে ডাবল জোরে কান্না শুরু হলো। কান্নার গুঁতোয় পটলাও স্থান ত্যাগ করল দ্রুত।
গরুটাও আর সহ্য করতে পারল না। হুংকার দিয়ে দড়ি ছিঁড়ে ক্যাবলাকে তাড়া করল। মুহূর্তেই ক্যাবলার কান্না বন্ধ। বাবা গো মাগো বাঁচাও বাঁচাও বলে ছুটতে লাগল ক্যাবলা। তার পিছনে সমানতালে কোরবানির গরু লালু।
হাইস্কুলের মাঠে গিয়ে বড় আমগাছে উঠে প্রাণে বাঁচল বেচারা। কিন্তু গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সমানে হাম্বা হাম্বা ডেকে তার সর্বশরীর কাঁপিয়ে তুলল লালুটা। এভাবেই কাটল ঘণ্টাখানিক।
গাছের ডালে ভয়ে কেঁপে কেঁপে নেতিয়ে পড়ল ছোঁড়াটা। শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোক জড়ো হয়ে গেল গাছতলায়।
লালুটা কাউকে কিছু বলছে না। যেন তার একমাত্র টার্গেট গাছে চড়া ওই কান্না-সন্ত্রাসী ক্যাবলা। ওকেই তার চাই। ছোঁড়াটার বিশ্রী কান্নায় লালুটা খুবই বিরক্ত, রাগও হয়েছে খুব। এটা তার চোখের ভাষাতেই বুঝিয়ে দিচ্ছে।
দুপুরের পর বাবা-মা আর আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় গাছ থেকে নামানো হলো ক্যাবলাকে। যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা। লালুকেও নিয়ে যাওয়া হলো বাড়িতে। ক্যাবলা গাছ থেকে নেমেই নিজেই নিজের কান ধরে উঠবস করল কয়েকবার। বলল, ঢের শিক্ষা হয়েছে। আর দুষ্টুমি নয়। এখন থেকে রোজই অন্তত একটা ভালো কাজ করব। আমাকে সবাই ক্ষমা করো। 
 ক্যাবলার ওপর থেকে সবার রাগ চলে গেল। পরের দিনই মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে পাঁচটি পথশিশুর জন্য ঈদের পোশাক কিনে দিল ক্যাবলা। বাবা-মা খুশি হলেন খুব। ক্যাবলাকে আদর করে টিলু কাকা বললেন, সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা সবাই এবার ঈদে পাঁচজনকে না পারি, কমপক্ষে একটি পথশিশুকে ঈদে জামা কিনে দেব। আমাদের এলাকার একটা শিশুও যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। সবার আনন্দেই এবার ঈদ হবে প্রাণের ঈদ। সত্যিকারের ঈদ।
টিলু কাকার কথায় সবাই সমর্থন দিল। হাততালি দিল। হাত বাড়িয়ে দিল। অন্যরকম এক আনন্দে হেসে উঠল হিজলপুর।

বাঘের পিঠে মিলি

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
আপডেট: ১৫ মে ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম
বাঘের পিঠে মিলি
এঁকেছেন মাসুম

বড় একটা বন। সেই বনে বাস করত বিশাল একটা বাঘ। বাঘটাকে সবাই মামা বলে ডাকত। বাঘটা খুব ভালো। কাউকে কিছু বলত না। সবার সাথে ভালোভাবে চলত। 
মিলি একদিন গেল ওই বনে। যেতেই সামনে হাজির হলো বাঘটি। 
মিলি ভয় করে বলল, ‘বাঘ মামা, তুমি হাসো কেন? তুমি কী আমাকে খেয়ে ফেলবে?’
বাঘ মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘আরে না। তোমার খেলার সাথি হতে চাই।’
–তুমি আমার খেলার সাথি হবে?
মিলি হা হা হো হো হি হি হাসল। একটু ভেবে আরও একটু হাসল। সবগুলো দাঁত বের করে। হো হো হি হি করে। 
বাঘ বলল, ‘বাহ! বাহ! তোমার হাসি কী ভালো। আরও হাসো। আরও হাসো। হাসতে থাকো। আমি দেখতে থাকি।’
মিলি খুশি হয়ে বলল, ‘আমার খেলার সাথি হতে চাও ভালো কথা। আমার বাসায় যাবে কীভাবে? তোমাকে দেখলে সবাই মেরে ফেলবে।’
বাঘ বলল, ‘বিকেল হলে তুমি আসবে। আমরা এক সাথে খেলব। মজা করব। তোমাকে পিঠে নিয়ে ঘুরব।’
বাঘটির নরম কথায় মিলি খুব খুশি হলো। বলল, ‘তা হলে ঠিক আছে।’ তার পর বাঘ মিলিকে পিঠে তুলে নিল এবং সারা বন ঘুরে দেখাল। মজার মজার কথা শোনাল।
একটু পর মিলি ঘুম থেকে উঠল। আর বলল, ‘কই বাঘ! কই বন! কই আমি! ইশ! দুর ছাই। ওহ বুঝতে পেরেছি। তা হলে আমি ঘুমের ঘোরে বাঘের পিঠে ছিলাম।’
মিলি আবার হা হা হো হো হি হি করে হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে পড়ল।

কুটুনের মা

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
কুটুনের মা
এঁকেছেন নিয়াজ চৌধুরী তুলি

কুটুনের মন খারাপ। আজ তার পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। গণিতে কুটুন নম্বর কম পেয়েছে। গণিত বুঝতে তার অসুবিধা হয়। অসুবিধা হয় বলে অঙ্ক করতে ভয় পায়। ভয়ে কখনো কখনো সে অঙ্ক না করে পাশে সরিয়ে রেখে দেয়। তাতে তার গণিতে ফলাফল ভালো হয়নি।
কুটুন বসে আছে ঘরের বারান্দায়। মা এসেছেন। কুটুন ইশকুল থেকে ফিরে কিছু খায়নি। হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় চলে এসেছে। মা বললেন, ‘কুটুন, চলো ছাদে যাই। নতুন বাতাস এসেছে।’
মাথা ঘুরিয়ে কুটুন মাকে দেখতে পেয়েছে। মা কুটুনের মাথায় হাত রাখলেন। আচমকা কুটুনের কান্না পেয়ে গেছে। তবে সে কাঁদেনি। তার মনে প্রবল কৌতূহল দেখা দিয়েছে। মা বলেছেন ‘নতুন বাতাস এসেছে’। বাতাস কেমন করে নতুন হয় সে বুঝতে পারছে না। কুটুন উঠে পড়ল। সে মায়ের সঙ্গে ছাদে গিয়ে দাঁড়াল। 
মা বললেন, ‘বাতাস বয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছ?’
কুটুন বলল, ‘নতুন বাতাস এসেছে বুঝলে কীভাবে, মা?’
মা বললেন, ‘তুমি যখন ইশকুলে যাচ্ছিলে তখন কি বাতাস এমন ঠাণ্ডা ছিল?’
কুটুন অবাক হয়ে বলল, ‘না মা। তখন গরম লাগছিল। বাতাসে গরম ভাব ছিল।’
মা বললেন, ‘সেই গরম বাতাস চলে গেছে। সেখানে এসে পড়েছে এখন ঠাণ্ডা বাতাস। তাতেই বুঝেছি নতুন বাতাস এসেছে।’
কুটুনের ভালো লাগছে। মা কী সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বললেন নতুন বাতাস এসেছে তা কীভাবে বোঝা গেছে। মায়ের হাতে ফানুস। মা ফানুস গুছিয়ে রাখলেন। ফানুসের ভেতর যেখানে আগুন জ্বালাতে হয়, মা সেখানে আগুন জ্বালিয়েছেন। মা আর কুটুন হাত উঁচু করে ফানুস উড়িয়ে দিল আকাশে। বাতাসে ভেসে ভেসে ফানুস ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে।
মা বললেন, ‘দেখো কুটুন, আমাদের ফানুস উপরে উঠে যাচ্ছে।’
কুটুন বলল, ‘মা, কত উপরে উঠবে এই ফানুস?’
মা বললেন, ‘অনেক উপরে। ওই মেঘেদের কাছে।’
ফানুস দেখতে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ফানুস চলে গেছে মেঘের কাছাকাছি।
মা বললেন, ‘তুমি কি জানো কুটুন, ফানুস কেমন করে ওড়ে?’
কুটুন বলল, ‘ফানুসের ভেতর আগুন থাকে। ফানুসে যে আগুন আছে, সেই আগুনের তাপে ফানুসের ভেতরের বাতাস গরম হয়ে হালকা হয়েছে। হালকা বাতাস ফানুসকে উপরের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ 
মা বললেন, ‘ফানুসে যদি আগুনের শিখা না থাকত তা হলে কি ফানুস উড়তে পারত?’
কুটুন বলল, ‘পারত না, মা। ওই আগুন হচ্ছে ফানুসের ওড়ার শক্তি। তা হলে আগুন না থাকলে ফানুস উড়বে কীভাবে!’
নরম গলায় মা বললেন, ‘তোমার মন খারাপ, বাবা!’
গণিতে কম নম্বর পেয়েছে। মাকে বলা হয়নি। কুটুন বলল, ‘হ্যাঁ মা। পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। গণিতে নম্বর কম পেয়েছি। অঙ্কে খুব ভয় পাই।’ 
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কুটুন তাকিয়েছে আকাশের দিকে। আকাশে ফানুস দেখা যাচ্ছে। মা বললেন, ‘তোমার ভেতরেও ফানুসের মতো আগুনের শিখা আছে। তুমি যাকে বলেছ শক্তি। তোমার ভেতরের সেই আগুন তুমি জ্বালাওনি বলে তোমার মন খারাপ হয়ে যায়।’
কুটুনের মন ভালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সত্যি তার ভেতর ফানুসের মতো আগুন আছে। সেই আগুনকে সে কাজে লাগাতে চায়।
মা বললেন, ‘কোনো একদিন অঙ্কের উত্তর মেলেনি বলে তুমি অংক করতে ভয় পাও। তুমি অংকের বই দূরে সরিয়ে রেখেছ। তাতে তোমার ভেতরের আগুনের শিখা নিভে গেছে। তুমি গণিতে ভালো করতে পারছ না।’ 
নিজের ভেতর শক্তি অনুভব করছে কুটুন। তার বিশ্বাস হচ্ছে সে চেষ্টা করলেই পারবে। মা বলেছেন তার ভেতর আগুনের শিখা আছে। সেই আগুন হচ্ছে শক্তি। নিজের ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগাবে।
মাকে জড়িয়ে ধরেছে কুটুন। মা তার ভেতর নিভে যাওয়া আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এখন থেকে সে আর কিছুতেই ভয় পাবে না। ভয় পেলে নিজের ভেতরের আগুনের শিখা নিভে যায়। আগুনের শিখা নিভে গেলে শক্তি ফুরিয়ে যায়।
মা বললেন, ‘আকাশের তারা কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু মেঘ তাদের ঢেকে রাখে। তোমার ভেতরের শক্তিও হারিয়ে যায়নি।’ 
কুটুন মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা তুমি খুব ভালো। আর কোনো দিন আমার মন খারাপ হবে না। আর কোনো কাজে ভয় পাব না।’ 
মা কুটুনের কাঁধে হাত রাখলেন। মা আর কুটুন দুজনই তাকিয়ে আছে আকাশে ফানুসের দিকে। কুটুনের চোখ পানিতে ভিজে উঠেছে। কুটুন কাঁদছে আনন্দে।