রিকশাটা ধীরে ধীরেই চলছিল। কাঁচা রাস্তা। বৃষ্টি হওয়ায় বেহাল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ ধড়াম করে সামনের চাকাটা গর্তে পড়ে গেল। ব্যথা সামলিয়ে উঠতে না উঠতেই চেঁচিয়ে উঠল পেছনের দুই চাকা, ‘অ্যাই, দেখে চলতে পারিস না? তোর জন্য আমরা এখন আটকে গেলাম।’
সামনের চাকা রাগে গজগজ করে বলল, ‘সেটা রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করো না! আরে বাবা! আমি কি রিকশা চালাচ্ছি?’
‘তুই সামনে আছিস, দেখবি না একটু?’ ডান পাশের চাকাটা বলল।
বাম পাশের চাকাটা মুখ ভেংচিয়ে বলল, ‘সামনে থেকে ঠিকমতো না পারলে ওখানে তোকে রেখেছে কী জন্য?’
গর্তটা মোটামুটি বড়ই। চালককে ভালোই বেগ পেতে হলো। ঘাম বেরিয়ে এল টেনে তুলতে। যদিও যাত্রী নেই রিকশায়, শুধু চারটা চালের বস্তা আছে। ভারি ওজন!
আবার চলতে লাগল রিকশাটা। সামনের চাকাটা পেছনে তাকায় না। সামনের দিকে ফিরে চলতে হয় তাকে। সে থাকে সবার প্রথমে। পেছনের দুই চাকা এজন্যই সহ্য করতে পারে না সামনের চাকাটাকে। মনে মনে হিংসায় জ্বলে ওরা। একটু সুযোগ পেলেই শুরু করে ঝগড়া। এই তো সেদিন সামনের চাকাটা পাংচার হয়ে গিয়েছিল। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চালকের রোজগার বন্ধ। বাম পাশের চাকা খেঁকিয়ে উঠেছিল, ‘তোর জন্য আমরা অকেজো হয়ে আছি। তোকে একটা লাথি মেরে সরিয়ে ফেলতে পারতাম যদি!’
অপমান গায়ে মেখেছিল সামনের চাকা। এমনিতেই পাংচার, তার মধ্যে ঝগড়া বাড়াতে চায়নি বেচারা। ডান পাশের চাকা আগুনে ঘি ঢেলে উসকে দেয়, ‘তোর জন্য আমাদের চালক বসে আছে। কতগুলো ট্রিপ মারতে পারল না। তুই যত নষ্টের গোড়া।’
দুই চাকার সঙ্গে একা ঝগড়া করে কুলাতে পারে না সামনের চাকা। সে সবসময় মিলেমিশে থাকতে চায়। পেছনের দুই চাকাকে সে খুব ভালোবাসে। ওদের মুখে শুনেছে, রিকশার পেছনে নাকি রঙিন ছবি আঁকা! দুটি ময়ূর পেখম মেলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে নাকি ভীষণ সুন্দর লাগে! সামনের চাকা যদিও পেছনে তাকিয়ে দেখতে পারে না সেই ছবি, তাও প্রশংসা করতে ভোলে না। এতেও ভুল বোঝে হতচ্ছাড়া পেছনের চাকারা। ওরা বলে, ‘খবরদার, তুই ময়ূরের ছবির দিকে তাকাবি না। অমঙ্গল হয় তোর কারণে। আমাদের বিপদে পড়তে হয় বারবার।’
কথাটা অবশ্য ঠিক না। যত দোষ নন্দ ঘোষ। পেছনের চাকারাও পাংচার হয়, খানাখন্দে আটকে যায়, টায়ার ফেটে যায়। কিন্তু কখনো ওদের দোষ ধরে না সামনের চাকা। ওরা তো সংখ্যায় দুই। আর সে একা। তাই লাগতে যায় না। কোনো দিন টুঁ শব্দটিও করেনি।
রাতের অন্ধকারে রিকশায় লাইট জ্বালানো হয়। লাইটটা ঠিক সামনের চাকার ওপরেই। সাঁই সাঁই করে রিকশা চলে অন্ধকারে। আর সামনের চাকাটাই শুধু আলোকিত হয়। পেছনের চাকারা অন্ধকারে থেকে যায়। ওরা আলো পায় না বলে রাগে ও হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরে।
আর ভালো লাগে না সামনের চাকার। এভাবে আর কত দিন? পেছনের দুই চাকার বিদ্বেষপূর্ণ আচরণে আর রিকশায় থাকতে ইচ্ছা করে না তার। ইচ্ছা হয় কোথাও চলে যেতে, ছুটতে ইচ্ছা করে একা- যেখানে দোষ ধরবে না কেউ, ঝগড়া করবে না কেউ।
একদিন সত্যি সত্যি সামনের চাকার ইচ্ছাটা পূরণ হয়ে গেল। তখন সকাল। চালক পেছনের দুই চাকায় তেল দিচ্ছিল। সামনের চাকায় একটুও তেল লাগায়নি। চালক খুব সুন্দর করে পরিষ্কার করল পেছনের চাকা দুটি। ন্যাকড়া পানিতে ভিজিয়ে বারবার মুছল। এমন যত্নআত্তি দেখে পেছনের চাকারা গর্বে ফুলে উঠল যেন। সামনের চাকাকে তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘তোর দিকে তো আমাদের চালক ফিরেও তাকাচ্ছে না। হি হি হি! ঘটনা কী রে?’
আসলে ঘটনা হচ্ছে, চালক সামনের চাকার টায়ারটা খুলে ফেলেছে। নতুন টায়ার লাগাতে হবে তো তাই। চাকার প্রাণ কিন্তু টায়ারেই। সেই খুলে ফেলা টায়ারটা নিয়ে যায় চালকের ছোট্ট ছেলেটা। সামনের চাকার টায়ারটা যেন স্বাধীন হয়ে গেল। ছেলেটার সঙ্গেই থাকে সারাক্ষণ। ঝগড়া নেই, রেষারেষি নেই। কী যে আনন্দ! ছেলেটা টায়ার নিয়ে ছোটে রাস্তায়। হাত দিয়ে ঠেলে গতি বাড়ায়। ছুটতেই থাকে ছুটতেই থাকে। এভাবে একা ছুটতে পারায় সামনের চাকাটা কী যে খুশি! এটাই তো সে চেয়েছিল।