সে অ-নে-ক দিন আগের কথা। এক কৃষক তার জমিতে চাষ করেছিলেন পিঁয়াজ রসুন ধনিয়াসহ নানান মসলা। কৃষকের সেবাযত্নে তরতরিয়ে বেড়ে উঠছিল সবাই। শিরশিরে বাতাস এলেই দুলে উঠত ওদের নরম শরীর। পিঁয়াজের ফুল মাথা তুলে কথা বলত রসুনের সঙ্গে। ধনিয়া গল্প করত জিরার সঙ্গে। মোট কথা, সবাই মিলেমিশে খুব সুখেই ছিল।
তখনকার রসুনটা ছিল একটু আলাদা। গায়ে কোনো জামা ছিল না। জামা বলতে গায়ের ওই পাতলা খোসাটির কথা বলছি। খোসা ছাড়া রসুন! ভাবা যায়? হ্যাঁ, ঠিক তাই। আবরণ নেই। রসুনের কোয়াগুলো ঠিকই ছিল, একসঙ্গে জড়াজড়ি করে এখনকার মতো। প্রতিটি কোয়ার গোড়া মিশে ছিল একটি জায়গায়, শেকড়ের কাছে।
একদিনের ঘটনা। কৃষকের বউ রান্না করতে গিয়ে দেখে ঝুড়িতে রসুন নেই। খেয়ালই করা হয়নি কখন ফুরিয়েছে। কৃষকের বউ তখন পাশের খেতের দিকেই পা বাড়াল। দুটো রসুন তুলে আনলেই তো রান্না হয়ে যায়। এ আর এমন কি। খেতে এসে তুলেও ফেলল দুটো রসুন।
কৃষকের বউটা ছিল খুব সহজ-সরল। কি যেন কি মনে হলো তার। রসুন হাতে নিয়েই বলতে শুরু করল, এই যে রসুন, তোমাদের গায়ে পিঁয়াজের মতো অমন পোশাক নেই কেন? শীতের দিনে তোমাদের বুঝি শীত লাগে না! এই যে গায়ে কেমন কাদামাটি লেগে আছে। পিঁয়াজের মতো অমন একটা খোসা লাগিয়ে নিলে কতই না ভালো হতো!
কৃষক বউয়ের কথা শুনল খেতের অন্যান্য রসুন গাছ। খবরটা এক সময় পৌঁছে গেল রসুনরাজের কাছে। বিষয়টা নিয়ে খুব চিন্তায় পড়ে গেল রসুন রাজাও। তাদের গায়েও পিঁয়াজের মতো অমন জামা চাই। পাতলা হলেও চলবে।
অনেক ভেবে ভেবেও কোনো উপায় মিলল না। একদিন তো লজ্জা ফেলে পিঁয়াজকে বলেই ফেলল রসুন, দাও না ভাই তোমার গায়ের থেকে খানিকটা জামা। শরীরটায় সব সময় কেমন কাদামাটি লেগে থাকে। রান্না করতে গিয়ে রাঁধুনিদের বেগ পেতে হয়! কি বলো তুমি?
পিঁয়াজ বলল, তা তো বুঝলাম ভাই, সমস্যা তো একটা আছে। আমার ঝাঁঝাল শরীর থেকে খোসা নেওয়া তোমার কি ঠিক হবে? আমার তো রংটাও আলাদা। তুমি সাদা আর আমি অন্য রকম? তুমি বরং অন্য কোথাও চেষ্টা করো।
বিষয়টি এড়িয়ে গেল পিঁয়াজ। খুব মন খারাপ হলো রসুনের। মন খারাপ নিয়ে একদিন খেতের কোণে থাকা শ্বেত কাঞ্চনের সঙ্গে গল্প করেছিল রসুন। শ্বেত কাঞ্চনের ডাল তখন ফুলে ফুলে ভরা। সামান্য বাতাসেই ঝরে পড়ছিল সুন্দর পাপড়িগুলো। কী সুন্দর দেখতে!
শ্বেত কাঞ্চনের নামটা ছিল ভারি উদার। সে রসুনকে ডেকে বলল, আরে ভাই রসুন, আমার ঝরা পাপড়ি থেকে বানিয়ে নাও না তোমার পোশাক, যতটা লাগে নিয়ে নাও।
রসুন ভেবে দেখল, তাই তো। শ্বেত কাঞ্চনের ঝরা পাপড়ি দিয়েই তো জামা বানানো যায়। খুশি ছড়িয়ে পড়ল রসুনের খেতে। পিঁপড়ার দল মুখে করে পৌঁছে দিল শুকনো সাদা পাপড়ি। রসুন ভালোবেসে জড়িয়ে নিল গায়ে। শুধু কি রসুন! প্রত্যেকটি কোয়া এবার পরতে চাইল সাদা জামা। তাই হলো।
ফসল তোলার সময় কৃষক দেখল অবাক ব্যাপার। প্রত্যেকটি রসুন পরেছে সাদা জামা! আর হ্যাঁ, সেই থেকে আজও চলছে ওদের অমন পোশাক। সাদা রঙের সুন্দর একটা আবরণী।