সিয়াম ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। ওর জীবনে শুধু একটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ- মোবাইল গেমস। সকাল থেকে রাত, খাওয়া, পড়া, এমনকি ঘুম- সবকিছুর আগে মোবাইল গেম।
বাবা-মা বলতেন, ‘একটু বই নিয়ে বসো।’
সিয়াম বলত, ‘একটা রাউন্ড শেষ করে পড়ব।’
এভাবে দিনের পর দিন কাটছিল। স্কুলে স্যারের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, হোমওয়ার্ক জমা দেয় না। ওর চোখে শুধু মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে।
এক বিকেলে সিয়াম পুরোনো জিনিসের দোকানে গেল। পুরোনো জিনিস কেনার আগ্রহ আছে তার। ওর চোখে পড়ল একটা আয়না। আয়নাটা অদ্ভুত! চারপাশে পুরোনো কাঠের খোদাই, মাঝখানে ধোঁয়াটে কাচ। আয়নাটায় তাকালে মনে হয়, যেন কেউ আয়নার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।
দোকানদার বলল, ‘এই আয়নাটা অনেক পুরোনো। শোনা যায়, একটা স্কুলের লাইব্রেরিতে ছিল। কেন যেন কেউ এটা কিনতে চায় না। তুমি চাইলে অল্প দামে নিয়ে নাও।’
সিয়াম আয়নাটা কিনে নিয়ে এল। ওর ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখল। তারপর ঘর অন্ধকার করে বসে পড়ল প্রিয় গেম নিয়ে।
রাত প্রায় ১১টা। চারদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ আয়নাটায় হালকা কম্পন শুরু হলো। সিয়াম ভয় পেয়ে আয়নার দিকে তাকাল। একটা ছোট্ট মেয়ে আয়নার ভেতর থেকে আবির্ভূত হলো। মেয়েটি বলল, ‘তুমি যদি লেখাপড়া না করো, তাহলে আমার মতো আয়নাতেই বন্দি হয়ে যাবে।’
সিয়াম স্তব্ধ। মেয়েটির চোখে পানি, মুখে গভীর বিষণ্নতা।
মেয়েটি বলল, ‘আমার নাম নীরা। আমিও তোমার মতো গেম খেলতাম। লেখাপড়া করতে চাইতাম না। সবাই আমাকে বোঝাত। মা কাঁদতেন। বাবা শাসন করতেন। কিন্তু আমি শুনতাম না।’
নীরা বলতে লাগল ওর গল্প, ‘স্কুলের লাইব্রেরিতে একদিন কিছু বই খুঁজতে যাই। হঠাৎ এক কোণে ধুলোমাখা এই আয়না পাই। আমার বন্ধুরা আয়না দেখে হাসছিল, মজা করছিল। আর আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, ইশ! যদি কেউ বলত, আর লেখাপড়া করতে হবে না। সারা জীবন শুধু খেলব। সেই মুহূর্তে আয়নাটা ঝিকঝিক করে উঠল। একটা ঠাণ্ডা হাওয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই দৌড়ে পালিয়ে গেল কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ আয়না থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে এল। সেই ধোঁয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে টেনে নিল। আমি আয়নার ভেতর বন্দি হয়ে গেলাম।’
‘যেদিন থেকে আমি এই আয়নার ভেতর বন্দি। সময় থেমে গেছে। বাইরে দিন আসে, রাত যায় কিন্তু আমার কাছে সব এক রকম। বহু প্রার্থনার পর শুধু একটাই সুযোগ পেয়েছি, যদি কাউকে সময়মতো সাবধান করতে পারি, তাহলে একদিন মুক্তি পাব।’
নীরার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার কান্না। সিয়াম নীরার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর চোখে পানি এসে গেল। সিয়াম বুঝতে পারল, এভাবে চললে ওর ভবিষ্যৎও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। সিয়াম ধীরে ধীরে বলল, ‘নীরা, আমি কথা দিচ্ছি, আমি আর গেম খেলব না। পড়াশোনায় মন দেব। আমি চাই তুমি মুক্তি পাও।’
আয়নার কুয়াশার মধ্যে নীরার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। নীরা বলল, ‘তুমি যদি সত্যিই তোমার প্রতিজ্ঞা রাখো, একদিন আমি আলোয় ফিরতে পারব।’
সিয়াম পরদিন ভোরে উঠেই বই নিয়ে বসল। স্কুলে গিয়ে ক্লাসে মন দিল। স্যার-ম্যাডামের কথা শুনল।
সিয়াম সবাইকে বলে, ‘আমরা যদি ঠিকমতো লেখাপড়া না করি, তাহলে বড় হয়ে ভালো কিছু করতে পারব না। জীবন অনেক মূল্যবান।’
বাবা-মা অবাক হয়ে দেখে সিয়াম গেম রেখে কলম হাতে নিচ্ছে। আর ওর ঘরের আয়নার কাচটা? দিন দিন ধোঁয়াটা হালকা হচ্ছে। হয়তো একদিন নীরার মুখ আর দেখা যাবে না। কারণ নীরা মুক্তি পাবে, ফিরে যাবে আলোর জগতে।