এক ছিল বোকা চাষি। তার ছিল অনেক ছেলে-মেয়ে। ছেলে-মেয়েরা বড় হলো, তাদের বিয়ে হলো। মেয়েরা চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। ছেলেরা রইল বাবার কাছে। চাষিও বুড়ো হলো। বড় ছেলে আর বৌ চাইল চাষি এবার খামার তদারকি করার দায়িত্ব তাদের ওপর ছেড়ে দিক। কিন্তু বুড়ো হলেও চাষি ছিল তখনো বেশ শক্ত-সমর্থ। ছেলে আর ছেলে-বৌয়ের হাতে সে খামারের কর্তৃত্ব ছাড়তে চাইল না।
তবুও মরণের চিন্তা মাঝে মাঝেই তার মনে আসত। সে জানত, মরতে তো একদিন হবেই। আজ হোক কাল হোক, খামারের কর্তৃত্ব গিয়ে পড়বে বড় ছেলে আর ছেলে-বৌয়ের হাতে। কথাটা ভাবতে তার মোটেও ভালো লাগত না।
একদিন এক গণকের কাছে গিয়ে বুড়ো চাষি বলল- বাবা, দেখুন তো, আমি আর কতদিন বাঁচব?
বুড়োর দিকে তাকিয়ে গণক একটু হাসলেন। তার পর বললেন, তুমি তিনবার হাঁচি দিলেই বুঝবে যে মরণ তোমার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে।
গণককে সালাম দিয়ে বুড়ো চাষি বিষণ্ন মনে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ভাবতে লাগল কি করে একেবারে না হাঁচা যায়।
সবে সে বাড়ির আঙিনায় পা দিয়েছে, এমন সময় তার নাকের ভেতরটা সুড়সুড় করে উঠল।
— হ্যাঁচ্চো!
শতচেষ্টা করেও বুড়ো হাঁচি আটকাতে পারল না।
হায় আল্লাহ। আর মোটে দুটো হাঁচি বাকি রইল! দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বুড়ো বলল।
পরদিন গম ভাঙাবার জন্য বুড়ো গম কলে নিয়ে এলো গম ভাঙাতে। সেখানে ময়দার গুঁড়ো ঢুকে গেল তার নাকের মধ্যে।
— হ্যাঁচ্চো!
চারদিক কাঁপিয়ে বুড়ো প্রচণ্ড জোরে হেঁচে উঠল।
কিছু করবার নেই, নিঃশ্বাস ফেলে বুড়ো ভাবল, আর একটি মাত্র হাঁচি বাকি রইল। পাছে আবার হাঁচি পায় সেই ভয়ে বুড়ো এক ছুটে মিল থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু গম পিষে ময়দা তৈরি করা হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং ময়দার বস্তা আনবার জন্য বুড়ো চাষিকে আবার কারখানায় ঢুকতে হলো। কিন্তু ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই ধুলোবালি আর ময়দার গুঁড়ো ঢুকে গেল নাকের মধ্যে। নাক আবার সুড়সুড় করে উঠল। সামলাবার জন্য অনেক চেষ্টা করল বুড়ো, কিন্তু কিছুতেই পারল না।
— হ্যাঁচ্চো!
আবার হেঁচে ফেলল বুড়ো।
— হায়! এবার আমার শিয়রে শমন এসেছে। আর রক্ষা নেই।
ময়দার বস্তাটাকে রেখে মেঝের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল বুড়ো চাষি।
মেঝেতে ময়দার বস্তা দেখে মিল মালিকের ভেড়াগুলো ছুটে এসে দাঁত দিয়ে বস্তাগুলো কাটতে লাগল।
ভেড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল বুড়ো। করুণ সুরে বলল, আরে পাজির দল! আমি যদি বেঁচে থাকতাম, তা হলে তোদের উচিত শিক্ষা দিতাম। কিন্তু একটা মরা মানুষ কি করতে পারে।
এই সময় মিলের মালিক এসে পড়ল সেখানে। সে অবাক হয়ে দেখল যে, একটা লোক হাত-পা ছড়িয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে, আর ভেড়াগুলো তার ময়দার বস্তা ছিঁড়ছে। লোকটা ভেড়াগুলো তাড়াবার জন্য কোনো চেষ্টাই করছে না।
— কি করছো বুড়ো?
মিল-মালিক জিজ্ঞেস করল।
— কি আর করব, শুয়ে আছি। মরা মানুষ আর কিই-বা করতে পারে। বেঁচে থাকলে আমি তোমার ওই ভেড়া আর ভেড়ার বাচ্চাগুলো তাড়িয়ে দিতে পারতাম। তুমি ভাই দয়া করে আমার একটা কাজ করে দেবে?
— কি কাজ?
— তোমার ওই ভেড়া আর ভেড়ার বাচ্চাগুলোকে তাড়িয়ে দেবে?
এ কথা শুনে মিল-মালিক আরও অবাক হলো। হাসি চেপে গম্ভীর মুখে সে বলল, ও হ্যাঁ, ভুলেই গিয়েছিলাম যে তুমি মরে গিয়েছ। খুবই দুঃখের ব্যাপার। খুবই শোকের ব্যাপার।
মিল-মালিক একটা চাবুক নিয়ে এলো। তার পর সপাসপ্ চাবুক চালাতে লাগল ভেড়াগুলোর ওপর। ভেড়াগুলো ছুটে পালিয়ে গেল। এর পর মিল-মালিক বুড়োকে লক্ষ্য করে চাবুক নাচাল।
হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠল বুড়ো। বলল, তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি আমাকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছ। তুমি না এলে আমি এখানেই মরে পড়ে থাকতাম।
ময়দার বস্তাটা ঘাড়ে নিয়ে বোকা বুড়ো চাষা বাড়ির দিকে পা বাড়াল। এর পর থেকে সে আর কোনোদিন কাউকে মরবার কথা জিজ্ঞেস করেনি।