অরণ্য বোঝেনি সে হারিয়ে গেছে। বাবা-মায়েরও বুঝতে আধাঘণ্টা সময় লেগে গেল। এর মধ্যে অরণ্য পৌঁছে গেছে বিলের ধারে। শীতের বিলে কোমড় পানি কিন্তু অরণ্যের ডুবে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিলের যতখানি থেকে পানি নেমে গেছে তাতে ধানের চারা দুলছে মৃদুমন্দ বাতাসে। হালকা সবুজ চারাগুলো খুব মায়াবি। মিনির মতো কিউট।
মিনি অরণ্যর বিড়াল। তারই মতো ছোট। ঘুমাতে ভালোবাসে। অরণ্য বহু বকাঝকা করেও ওর আলসেমি ভাঙাতে পারেনি। একবার তো সকালের খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। বলেছিল, উঠেছিস বেলা করে, একবারে দুপুরের খাবার পাবি। এ কথায় ওর যে কী অভিমান! ভঙ্গি করল, বাড়ি থেকেই চলে যাবে। ছোট্ট অরণ্য তখন নিজেই কেঁদে ফেলে। মিনির মান ভাঙাতে কান ধরে ওঠবস করে। মিনিকে খুশি করতে ছড়া বাঁধে আর মধুর গলায় আবৃত্তি করে...
ওরে আমার মিনি
গয়না দিব কিনি।
বকব না আর তোরে
না উঠলেও ভোরে।
এই না শুনে মিনি ঝপাং করে চড়ে বসল অরণ্যর কোলে। অরণ্যের খুশি আর ধরে না। আলতো করে ঘাড়ে, মাথায় সুড়সুড়ি দেয়। মিনি আরামে আবার চোখ বোজে।
সেই থেকে মিনি ইচ্ছেমতো ঘুমানোর সার্টিফিকেট পেয়ে যায়। অরণ্যর কিন্তু ঘুম ভাঙে ভোরবেলাতেই। একা একা ভালো লাগে না বলেই তো সে হারিয়ে গেল। হাঁটতে থাকল ধানের খেতের আইল ধরে।
হঠাৎই একদল পাখিকে ওড়াউড়ি করতে দেখল। পাখিগুলোকে অরণ্য চিনতে পারছে না। বড় বড় ভারী ভারী সব পাখি। চড়ুই তো সে চেনে, টিয়ে, বুলবুলিও দেখেছে। এগুলোর কোনোটাই সেগুলো নয়। তার বাবা যে অফিসে কাজ করে সেটি তো পাখিরই অফিস। বাবা বলে, শীতে অনেক পাখি দূর দূর দেশ থেকে উড়ে আসে। বন-পাহাড় পাড়ি দিয়ে। ওদের দেশে শীত বেশি তো! তাই।
আমাদের দেশে শীত কম, এখানে তাই ওদের আরাম লাগে। শীতকালটা কাটিয়ে আবার নিজের দেশে ফিরে যায়। এগুলো কি তবে সেই পাখি? বাবার অফিসে পাখিগুলোর ছবি ঝোলানো আছে, নামও লেখা আছে। তবে ঠিক ঠিক চিনতে পারার বয়স তার এখনো হয়নি।
অরণ্য আইল ধরে আরও এগিয়ে গেল। সে ভয় পেল। এক দুই তিন চারটি পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে আর উড়ে যেতে চাইছে কিন্তু কিছুতেই পারছে না। অরণ্য বুঝতে পারে, এগুলো সেই পাখি যেগুলো আকাশে উড়ছে। কিন্তু ওরা উড়ছে না কেন?
সে দেখল পাখিগুলোর পা সুতায় আটকা পড়ে গেছে। একটি পাখির পা খুলতে চেষ্টা করল কিন্তু খুব শক্ত করে আটকানো। কী করবে বুঝতে পারছে না। এর মধ্যে দুজন লোক এল। অরণ্যকে দেখে তারা অবাক হলো। চুপিসারে কী কী যেন বলতে থাকল।
একজন এগিয়ে এসে বলল, তোমার নাম কিতা?
বাবা মৌলভিবাজারে অনেকদিন, সিলেটি ভাষা সে বোঝে।
ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, অরণ্য।
লোকটি আবার বলল, তুমি কি ইন্সপেক্টার স্যারের পোয়া?
অরণ্য মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলে।
তুমি এটান কী কর?
অরণ্যর এতক্ষণে হুঁশ এল। সে কোথায়! বাবা-মা কোথায়! তার কান্না পেয়ে গেল।
লোকগুলো বুঝতে পারল সে হারিয়ে গেছে। একজন বলল, তুমি কান্দি না। তোমারে ঘরত দিয়া আইমু।
লোকটা অরণ্যকে নিয়ে রওনা হলো। অন্য লোকটা পাখিগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর অরণ্য বলল, তোমরা কি পাখিগুলোকে আটকে রেখেছ?
লোকটা উত্তর দিল না। অরণ্য বলল, ওরা খুব কষ্ট পাচ্ছে। তোমরা ওদের ছেড়ে দাও।
লোকটা এবারও কোনো উত্তর দিল না। অরণ্য জানতে চাইল, কী করবে ওদের দিয়ে? মিনির মতো পুষবে?
লোকটা বলল, আমরা গরিব। পাখি ধরি খাই।
চিন্তায় পড়ে গেল অরণ্য। তার পর বলল, তোমরা ওদের ছেড়ে দাও। মাকে বলব, তোমাদের খাবার দিতে।
অরণ্যর কথা শুনে লোকটা হেসে ফেলল। অরণ্য একই কথা বারবার বলতে থাকল- ওদের ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও প্লিজ।
লোকটা এবার ভাবল অরণ্যকে একটি ধমক দেবে। কিন্তু অরণ্যর মুখে এমন মায়া, কেউ তাকে ধমক দিতে পারে না। সাত-পাঁচ ভেবে শেষে অন্য লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে পাখিগুলোকে ছেড়ে দিতে বলল। কিছুক্ষণ পরে সেগুলো আকাশে উড়ে গেল। অরণ্য খুব খুশি। ওপরে তাকিয়ে দেখল নীল আকাশ নীল হয়ে দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে গেছে। পাখিরা ইচ্ছেমতো উড়ছে, নাচছে, গাইছে।
লোকগুলোও তাকিয়ে আছে আকাশে। এই প্রথম বুঝি তারা দেখল, আকাশ সীমাহীন। কোথাও কোনো ফাঁদ নেই।