দেশের নির্মাণ খাতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ রড ও সিমেন্টের বাজার গত তিন মাস ধরে স্থবির ছিল। চলতি মাস থেকে চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন বাজারে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে আসছে। বিশেষত, স্থানীয় পর্যায়ে আবাসন প্রকল্পের মৌসুম শুরু হওয়ায় রড ও সিমেন্টের চাহিদা আবার বাড়তে শুরু করেছে।
সরকারি মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ স্থগিত হওয়ার ফলে গত কয়েক মাসে রড ও সিমেন্টের বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ওই স্থবিরতা কাটিয়ে বাজারে পুনরায় উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
গত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে রড ও সিমেন্টের বাজারে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, তা ছিল মূলত সরকারি মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। ওই তিন মাসে ব্যবসায়ী ও নির্মাণ শিল্পসংশ্লিষ্টরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হন।
চট্টগ্রামের ষোলশহরের মেসার্স এবি চৌধুরীর স্বত্বাধিকারী অঞ্জন বড়ুয়া বাবু জানান, গত তিন মাসে তার প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ টন রড এবং ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি করেছে। কিন্তু নভেম্বর মাসের শুরু থেকেই রড এবং সিমেন্টের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। বর্তমানে দৈনিক বিক্রি ১০ থেকে ১২ টন রড এবং ১৫০ থেকে ২০০ ব্যাগ সিমেন্টে পৌঁছেছে।
গত মে-জুন মাসে রডের দাম ছিল প্রতি টন ৯০ হাজার টাকার ওপরে, যা বর্তমানে ৮৩ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে, সিমেন্টের দামও কিছুটা কমেছে। কোম্পানি ভেদে বর্তমানে সিমেন্টের দাম প্রতি ব্যাগ ৪৫০ থেকে ৫২০ টাকা। যদিও বাজারে চাহিদা বাড়ছে, দাম এখনো আগের মতোই রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চাহিদা আরও বাড়লে দামও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।
চট্টগ্রামের পূর্ব নাসিরাবাদ সিডিএ অ্যাভিনিউয়ের মেসার্স নাবিলা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ নুরুন নবী বলেন, ‘বিগত পরিস্থিতি দেখে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। রড এবং সিমেন্টের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে, তাই ব্যবসা ধীরে ধীরে চাঙা হচ্ছে।’
বিএসএমএ (বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ইস্পাত খাতে বাজারের পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। দেশে ইস্পাত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টন। অথচ দেশের বার্ষিক রডের চাহিদা ৭৫ লাখ টন। সিমেন্টের বাজারে বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে এবং বছরে ৮ কোটি টন সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদা ৪ কোটি টন। গত তিন মাসে সরকারি প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ থাকায় সিমেন্ট এবং রডের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।
চট্টগ্রামের নিউ নজরুল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সরকারের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত হয়ে গিয়েছিল, ফলে বেসরকারি আবাসন শিল্পও স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফলে রড ও সিমেন্টের বিক্রিতে ধস নামে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে নভেম্বর মাস থেকে বেচাকেনা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে মানুষ ঘরবাড়ি সংস্কার ও নতুন আবাসন নির্মাণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।’
নির্মাণসামগ্রীর বাজারের এই চাঙাভাবের পেছনে স্থানীয় আবাসন নির্মাণের মৌসুমের প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের অনেক ব্যবসায়ী জানাচ্ছেন, যেহেতু শুষ্ক মৌসুম শুরু হয়েছে, তাই মানুষ বেশি করে ঘরবাড়ি সংস্কার ও নতুন বাড়ি নির্মাণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে রড ও সিমেন্টের চাহিদা বেড়েছে এবং ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এই চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরবরাহও বাড়বে।
বিএসআরএমের উপবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘বিগত তিন মাসে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ভুগছিলাম। নভেম্বর মাস থেকে বেচাবিক্রি কিছুটা বেড়েছে। তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। আরও ব্যাপক আকারে সরবরাহ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।’ তিনি জানান, এই খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তা এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এবং তাদের জন্য ব্যবসা টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়ন মো. হাকিম আলী বলেন, সরকারি মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ থাকায় সিমেন্ট খাত একটি কঠিন সময় পার করছে। আশা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সিমেন্টের বিক্রি আবার চাঙা হবে।’
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্মাণ খাতে রড ও সিমেন্টের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি ভালো লক্ষণ হলেও, আরও দ্রুততার সঙ্গে বাজারের অবস্থা স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি সরকার নির্মাণ খাতে পুনরায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে এবং মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হয়, তাহলে রড ও সিমেন্টের বাজার আরও স্থিতিশীল হবে।