বাজার সহনীয় রাখতে এবার রমজানের তিন মাস আগেই খেজুরের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার। ফলে বাজারে প্রচুর পরিমাণে খেজুর আমদানি হয়েছে। খেজুরের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, রমজানের প্রস্তুতি, আমদানিতে সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে খবরের কাগজ কথা বলেছে খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী ফারুক আহমেদের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক তারেক মাহমুদ।
খবরের কাগজ: খেজুর আমদানিতে বিদ্যমান কাস্টমস ডিউটি ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ১০ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। এ সুযোগে গতবারের তুলনায় আমদানি কতটা বেড়েছে?
ফারুক আহমেদ: সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর কারণে গত বছরের তুলনায় আমদানি অনেক বেড়েছে। আমদানি বাড়ার আরেকটি কারণ হলো ব্যাংকের এলসি মার্জিন কমানো। বাংলাদেশ ব্যাংক রমজানের পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন ৫ থেকে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর ফলে এবার বড় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ীরাও খেজুর আমদানির সুযোগ পেয়েছেন।
খবরের কাগজ: খেজুরের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। এটা ‘যথেষ্ট’ মনে করছেন কি না।
ফারুক আহমেদ: একসময় শুধু রমজানে খেজুরের চাহিদা ছিল। এখন সারা বছরই চাহিদা থাকে। আগে খেজুর আমদানিতে কোনো শুল্ক দিতে হতো না। এখন দিতে হয়। কিন্তু এটা আরও সহনীয় পর্যায়ে রাখা দরকার। তাহলে সবার জন্য আমদানিটা আরও বেশি সহজ হবে।
খবরের কাগজ: সরকার যে হারে শুল্ক কমিয়েছে, সে অনুযায়ী প্রতি কেজি খেজুরের আমদানি ব্যয় প্রায় ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কমার কথা। কিন্তু কমেনি কেন?
ফারুক আহমেদ: একজন ব্যবসায়ী মুনাফার জন্য ব্যবসা করে। অবশ্যই একজন আমদানিকারক তার কস্টিং (ব্যয়) হিসাব করে খেজুর বিক্রি করবেন। এবার খেজুরের আমদানি ব্যয় প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। এর সুফল ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে। দাম কমায় খেজুর সহজলভ্য হয়েছে।
খবরের কাগজ: বিশ্ববাজারে খেজুরের দাম কেমন? কোন কোন দেশ থেকে বেশি খেজুর আমদানি হয়?
ফারুক আহমেদ: ইরাকে প্রতি বস্তা জাহিদি খেজুর ৭০০ ডলার, ইরানে মরিয়ম খেজুর ৪৫০০ ডলার, দুবাইয়ে খেজুরের মানভেদে ১২০০ থেকে ২০০০ ডলার ও সৌদি আরবে মানভেদে ২২০০ থেকে ৪০০০ ডলার বুকিং রেট পড়ছে। আমাদের দেশে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইরাক, আলজেরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে খেজুর আমদানি হয়ে থাকে।
খবরের কাগজ: খেজুর আমদানিতে কোন সমস্যাটি বেশি পোহাতে হচ্ছে?
ফারুক আহমেদ: দুবাই, সৌদি আরব থেকে ছেড়ে আসা কার্গো সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। তবে আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ছেড়ে আসা কার্গো আসতে ৪০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। আগে আমরা সরাসরি বন্দর থেকে খেজুর খালাস করতে পারতাম। বর্তমানে বন্দরের নতুন নিয়ম অনুযায়ী জাহাজে থাকা খেজুর চট্টগ্রামে আসার পর বন্দর থেকে ডিপোতে পাঠানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ ডিপো শহরের বাইরে। সেখানে পণ্যের পরীক্ষা হয়। আরও তিন দিন সময় নষ্ট হয়। এরপর পণ্যের পরীক্ষা, সে রিপোর্ট অনলাইনে আপডেট করে শুল্ক দিতে হয়। সবমিলিয়ে একটা কনটেইনারে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ডেলিভারি নিতে পারি না।
খবরের কাগজ: সরকার বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
ফারুক আহমেদ: খেজুর তো লম্বা সময় ধরে রাখা যায় না। কিন্তু বন্দর, কাস্টমসের জটিল নিয়মনীতি বা সিদ্ধান্তের কারণে পণ্য খালাস করতে সময়ক্ষেপণ হয়। তাই এখানে বন্দর ও কাস্টমসের সেবা আরও সহজ হওয়া দরকার। এতে ব্যবসায়ীরা অনেক উপকৃত হবেন।
খবরের কাগজ: বর্তমানে পাইকারিতে খেজুরের দাম কমেছে। রমজানে সেটা অব্যাহত থাকবে কি না।
ফারুক আহমেদ: বর্তমানে খেজুরের সরবরাহ ভালো। তাই পাইকারিতে পণ্যটির দাম অনেকাংশে কমে এসেছে। খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আমি মনে করি রমজানে সেটা অব্যাহত থাকবে।
খবরের কাগজ: ভোক্তা পর্যায়ে খেজুরের চাহিদা কতটা বেড়েছে?
ফারুক আহমেদ: করোনার পর মানুষের লাইফস্টাইল বা খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। এখন খেজুর বা ড্রাই ফুডের দিকে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। খেজুর মানুষের দেহে প্রোটিন সরবরাহ করে। ডাক্তাররাও রোগীদের খেজুর খাওয়ার প্রতি উৎসাহিত করছেন। তাই আমি মনে করি, চাহিদা বাড়ার কারণে পণ্যটির দাম সারা বছর ক্রেতার নাগালের মধ্যে রাখার জন্য চেষ্টা করা যেতে পারে।
খবরের কাগজ: কোন ধরনের খেজুরের চাহিদা বেশি থাকে?
ফারুক আহমেদ: ভোক্তা পর্যায়ে খেজুরের চাহিদা নির্ভর করে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর। যাদের ক্রয়ক্ষমতা বেশি তারা দামি খেজুর যেমন- আজোয়া, মারিয়াম, মেজদুল, আম্বার এসব কিনবেন। আবার যাদের ক্রয়ক্ষমতা কম তারা জাহিদী খেজুর কিনতে পারেন। এবার সাধারণ মানুষ এ খেজুর কেজিপ্রতি ১৫০ টাকায় কিনতে পারবেন আশা করি।
খবরের কাগজ: পর্যাপ্ত আমদানির পরও গত বছর খুচরা পর্যায়ে চড়া দামে বিক্রি হয় খেজুর। এবার ভোক্তারা স্বস্তি পাবেন কি না।
ফারুক আহমেদ: গত বছর খুচরা পর্যায়ে চড়া দামে বিক্রি হয় খেজুর। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ভোক্তারা অবশ্যই স্বস্তি পাবেন। আরেকটি সুসংবাদ হলো- এই বছর টিসিবি অনেক জাহেদী খেজুর আমদানি করেছে। তাই দাম অনেকটা সহনীয় পর্যায় থাকবে।
খবরের কাগজ: বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যটি আমদানিতে নতুন কারো উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কেমন বলে আপনি মনে করেন?
ফারুক আহমেদ: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অবশ্যই এটা ভালো মার্কেট। কারণ সারা দেশে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগ খেজুর আমদানি করছেন। যেহেতু সারা বছর খেজুরের চাহিদা রয়েছে, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটা খুব ভালো একটা মার্কেট হবে। তাই এটাকে যে কেউ পেশা হিসেবে নিতে পারেন।