রাজধানীতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষকরা। মূল বেতনের ২০ শতাংশ (ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা) বাড়ি ভাড়াসহ তিন দফা দাবিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন চলমান রয়েছে। এর আগে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গত ১২ অক্টোবর শিক্ষকরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে তিন দফা দাবি নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এই কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এর প্রতিবাদ এবং দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত সোমবার থেকে শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে অবস্থান নেন। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে তারা সচিবালয়ের দিকে এগোলে হাইকোর্টের মাজার গেটের সামনে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। গত বুধবারও একই দাবিতে বেলা আড়াইটার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন শিক্ষকরা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসে শিক্ষকদের ১৬ সদস্যের প্রতিনিধিদল। শিক্ষকদের তিন দফা দাবি হলো মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া প্রদান, শিক্ষক ও কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা দেড় হাজার টাকায় উন্নীত করা এবং কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা। গত রবিবার সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবকে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির তথ্য জানানো হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে। চিঠিতে বলা হয়, সরকারের বিদ্যমান বাজেটের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া ভাতা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে করা হলো। এ আদেশ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত যুক্ত করে চিঠিতে বলা হয়েছে, এ বাড়ি ভাড়া ভাতা পরবর্তী সময়ে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী সমন্বয় করতে হবে। ভাতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনো বকেয়া প্রাপ্য হবেন না। এ ক্ষেত্রে সব আর্থিক বিধিবিধান অবশ্যই পালন করতে হবে। এ ভাতাসংক্রান্ত ব্যয়ে ভবিষ্যতে কোনো অনিয়ম দেখা দিলে বিল পরিশোধকারী কর্তৃপক্ষ অনিয়মের জন্য দায়ী থাকবে। সরকারের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অনশনে থাকা শিক্ষকরা গতকাল সোমবার থেকে আবারও আমরণ অনশনে বসেছেন। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে ওই দিনই অনশনে বসার ঘোষণা দেন তারা। আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলেছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা শ্রেণি কার্যক্রমে ফিরবেন না।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাড়ি ভাড়া ৫ শতাংশ হারে এবং ন্যূনতম মাসিক ২ হাজার টাকা নির্ধারণ করলে ৮৯ শতাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর বাড়ি ভাড়া বাড়বে ৮ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি, ৫৬ শতাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর বাড়ি ভাড়া বাড়বে ১২ শতাংশ এবং ৭৫ শতাংশ শিক্ষক-কর্মচারীর বাড়ি ভাড়া বাড়বে ৯ শতাংশের বেশি।
শিক্ষা উপদেষ্টার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আন্দোলনরত শিক্ষকরা থালা-বাসন হাতে ভুখামিছিল করেন। গতকালও তাদের আমরণ অনশন করতে দেখা যায়। আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে বিএনপি। এর আগে তারা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, তাদের দল ক্ষমতায় গেলে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ নিয়ে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন করা হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণপ্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী বলেন, যখন বাড়ি ভাড়া ২০ শতাংশ, ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং কর্মচারীদের ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে সরকার, তখনই তাদের চূড়ান্ত বিজয় হবে। প্রজ্ঞাপন জারি না করলে আমরা এখান থেকে শ্রেণি কার্যক্রমে ফিরে যাব না।
শিক্ষকরা বর্তমানে ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া ভাতা পান। সরকার গত ৩০ সেপ্টেম্বর তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে। এতেও অসন্তুষ্টি রয়েছে শিক্ষকদের। কারণ নতুন করে ৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হলে এ ক্ষেত্রে শুধু অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ ছাড়া কেউ বেশি ভাতা পাবেন না। তাদের জন্য যুগোপযোগী বেতনকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বর্তমান সময়ে এসেও দেখি শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এতে তাদের বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার দরকার, তা তারা নিশ্চিত করতে পারছেন না। এর ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। শিক্ষকরা রাস্তায় নেমেছেন, এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আশা করছি, সরকার সংকট নিরসনের লক্ষ্যে শিক্ষকদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করে একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাবে।