মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মসংস্থানের মূল অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলো। গত বছর বিভিন্ন দেশে যাওয়া কর্মীদের মধ্যে ৮২ শতাংশ গেছে এ অঞ্চলে। প্রবাসী আয়ের ৪৬ শতাংশ এসেছে এসব দেশ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরানের পাল্টা হামলায় নিরাপত্তাহীনতায় শত শত কর্মক্ষেত্র ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে। কাজ হারিয়েছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নতুন কর্মী পাঠানো কমছে। কেউ কেউ ফিরে আসছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মীদের ফিরে আসা আরও বাড়তে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। চলমান যুদ্ধের প্রভাবে নিরাপত্তাহীনতা, সুরক্ষা ঝুঁকি ও মানবিক উদ্বেগের সম্মুখীন হচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদেশগামী কর্মীদের ছাড়পত্র নেওয়ার হার ৫০ ভাগ কমেছে। যুদ্ধের কারণে লেবাননে এ পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি চাকরি হারিয়েছেন। সেখানে অনেক কলকারখানায় সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সীমিত কর্মী নিয়ে কাজ চলছে। আবার অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতেই বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। যুদ্ধের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের কর্মীদের বেতন কাটছাঁট করা হয়েছে। ওভারটাইম ডিউটি বন্ধ করা হয়েছে। বেতন অনিয়মিত হয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। এতে বাংলাদেশি কর্মীদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে অর্থ সাশ্রয় করছেন। এতে লজিস্টিক এবং পরিষেবা খাতে কর্মীসংখ্যা প্রায় ৮০ ভাগ কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পুরো অঞ্চলে ব্যবসায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ মেগা প্রকল্পগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে যে আশা করা হয়েছিল তা ব্যাহত হলে বাংলাদেশসহ অনেক অভিবাসীর জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে, গত এক বছরে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ এনে প্রায়ই বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলো। বিগত সময়ে ওমান, বাহরাইন, ইরাক, লিবিয়া, সুদান মিসর, রোমানিয়া, ব্রুনাই ও মালদ্বীপে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া সিন্ডিকেট বাণিজ্যের কারণে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করেছে প্রায় দুই বছর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ না হলেও ২০২৪-এর জুলাই থেকেই ভিসা ইস্যু বন্ধ করেছে দেশটি। গত বছর কাতারও একই পথে হেঁটেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং দেশে ফেরত আসতে চাইছে। কাজ হারিয়ে আনুমানিক ১০ হাজারের মতো কর্মী ফেরার জন্য আটকে থাকার তথ্য দেওয়া হলেও এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অব্যাহত থাকলে এ প্রবণতা আরও তীব্র হবে। কর্মসংস্থান কমে গেলে অবৈধ অভিবাসন বেড়ে যেতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেকে নিরাপত্তার কারণে কিছু অঞ্চলে কার্যক্রম সীমিত করে তুরস্কে ব্যবসা স্থানান্তর করছেন। এর ফলে শ্রমবাজারেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু তাৎক্ষণিক সংকট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তাই নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা এবং শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এক জটিল সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে। এতে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি ক্রমেই কমছে, যা প্রবাসী আয়ের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংসের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সরকারকে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজতে হবে এবং চাহিদামতো দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে। আশা করছি, সরকার প্রবাসী আয় বাড়াতে অত্যন্ত কৌশলী পদক্ষেপ নেবে।