সবুজ ঘাসের সবুজ জমিনে লাল-সবুজের বাংলাদেশ সোনালি ইতিহাস গড়ল। ঐতিহাসিক এ ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল সিলেট স্টেডিয়ামে। টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম সুপ্রাচীন দল পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৭৮ রানে। এটি ছিল দ্বিতীয় টেস্ট। এর আগে প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হারিয়েছিল ১০৪ রানে। দুটি জয়েই সর্বক্ষণের জন্য প্রাধান্য ছিল বাংলাদেশের। দুটি জয়ই ছিল দাপুটে জয়। বাংলাদেশ প্রায় সব সেশনেই প্রাধান্য বিস্তার করে খেলেছে। ক্রিকেট বাংলাদেশের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা। আন্তর্জাতিক স্তরে খেলা হিসেবে এ দেশের ক্রিকেটের স্থান শীর্ষে। নানা সময়ে ক্রিকেটই জাতীয় গৌরব বয়ে এনেছে। এবার আমরা সেই গৌরবের অধিকারী হয়েছি ক্রিকেটে অনেক অর্জনের মাধ্যমে।
প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ায় সবার চোখ ছিল দ্বিতীয় টেস্টের দিকে। এই টেস্টে পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়ায় কি না, নাকি বাংলাদেশ জয় পাবে, তাই নিয়ে সারা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ক্রিকেট বিশ্লেষক এবং সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা এ নিয়ে নানা বিচার-বিশ্লেষণ ও মন্তব্য করেছেন। দ্বিতীয় টেস্টের শেষ দিনটা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। ম্যাচটি যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেই অবস্থানই একে রোমাঞ্চকর করে তোলে। সমীকরণটা ছিল এ রকম– পাকিস্তানকে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৩৭ রান করে বিশ্বরেকর্ড গড়ে জিততে হবে। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে যা এর আগে কোনো টেস্টে কোনো দল করতে পারেনি। তবে কাগজে-কলমে তো অসম্ভব নয়। কিন্তু এই রান করতে গিয়ে চতুর্থ দিনে পাকিস্তান ৩১৬ রানে ৭ উইকেট খুইয়ে বসে। পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য অবশিষ্ট ৩ উইকেটে তাদের দরকার ছিল আরও ১২১ রান, বাংলাদেশের ৩ উইকেট। শেষের তিন ব্যাটসম্যানকে নিয়ে পাকিস্তানের ১২১ রানের পাহাড় ডিঙানো প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে চতুর্থ দিনের শেষে ম্যাচটি বাংলাদেশের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তবু ক্রিকেট যেহেতু অনিশ্চিতের খেলা, শেষ দিনের প্রথম সেশনের দিকে ছিল দর্শকদের চোখ। কোন দল জয়ী হয়, তাই নিয়ে ছিল উৎকণ্ঠা। তবে ক্রিকেটের এই দ্বৈরথে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৭৮ রানে জিতেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ অর্জন করে ২-০ টেস্ট সিরিজের দুটিতেই জয়ের গৌরব। ক্রিকেটের ভাষায় কোনো এক পক্ষ সব ম্যাচ জিতলে তারা প্রতিপক্ষকে ‘হোয়াইটওয়াশ’ করেছে বলে অভূতপূর্ব গৌরব পায়। বাংলাদেশ গতকাল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই গৌরবের অধিকারী হয়েছে।
বাংলাদেশ টেস্ট খেলা শুরু করে ২০০০ সালে। বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট ফরম্যাটের সাফল্য অন্য ফরম্যাটের তুলনায় অনেক কম। গতকালের সিলেট টেস্টসহ বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট খেলেছে ১৫৮টি, জয় পেয়েছে মাত্র ২৭টিতে। বাংলাদেশের জয়ের সংখ্যা এত কম হলেও গতকালের জয়টি নানা দিক থেকে গৌরব বয়ে এনেছে। আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ দুই ধাপ লাফ দিয়ে সাতে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এটাই সেরা র্যাঙ্কিং। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে নবম স্থান থেকে সপ্তম স্থানে চলে এসেছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার (আইসিসি) টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও বাংলাদেশ ভারতকে পেছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রাথমিক ম্যাচগুলো চলছে। বাংলাদেশসহ অন্য দলগুলোকে আরও কিছু টেস্ট খেলতে হবে। ফলাফল তখন কী দাঁড়ায় বলা কঠিন। তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজ জয় যে টাইগারদের ভবিষ্যতে ভালো ক্রিকেট খেলতে উদ্দীপ্ত করবে, সে কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে। গত দুই বছর ধরেই বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেট ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে। পাকিস্তানের সঙ্গে এই সিরিজ জয় ক্রিকেটের পরাশক্তি–অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সমানে সমানে লড়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস পেয়ে গেল। পাকিস্তানের সঙ্গে জয়ের অন্য আরও একটি মাত্রা আছে। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। আমাদের জাতিগত স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি স্থায়ী হয়ে আছে। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যেকোনো জয়ে বাংলাদেশের মানুষ তাই গৌরব অনুভব করে। এবার তাতে যুক্ত হলো নতুন মাত্রা। দেশের মাটিতে অন্যতম ক্রিকেট শক্তি পাকিস্তানকে ধবল ধোলাই করল বাংলাদেশ।
টাইগাররা তাদের পরিশ্রমলব্ধ এই সাফল্যের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখবে বলে আশা করছি। সেই সঙ্গে জাতির সার্বিক কর্মকাণ্ডে এই নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, লড়াকু মনোভাব ছড়িয়ে পড়ুক। বাংলাদেশ জাতিগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হোক। এই জয়ে টাইগারদের প্রাণঢালা অভিনন্দন।