প্রতিবছর কোরবানির চামড়া বিক্রি ও সংরক্ষণে নানা রকম নৈরাজ্য লক্ষ করা যায়। সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও ট্যানারির মালিক ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে কিনে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ে সিন্ডিকেট, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ চামড়া নষ্ট হওয়ার শঙ্কা এবং দাম না পাওয়ার কারণে এ নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে। এভাবে এক যুগের বেশি সময় সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে চামড়ার লেনদেন চলছে। অন্যদিকে ট্যানারির মালিকরা আর্থিকসংকট ও আন্তর্জাতিক মন্দার অজুহাত দিচ্ছেন। এ সিন্ডিকেটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো। চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে সাধারণত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ করা হয়। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। ঈদের দিন গরম ও বৃষ্টির কারণে দ্রুত লবণ দিতে পারে না। এতে চামড়ার মান কমে যায়। তবে এবার সরকার চামড়া নষ্ট হওয়া রোধে এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ ও বিশেষ ব্যাংকঋণের মতো আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ।
শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির খবরের কাগজকে বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া বিক্রি নিয়ে যে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, এবার তা যেন না হয় সে জন্য সরকার আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়েছে। আশা করি, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে পশুর চামড়া বিক্রি হবে। পশু কোরবানির পর কাঁচা চামড়া বেশি দিন রাখা যায় না, নষ্ট হয়ে যায়। এবারে সরকার বিনামূল্যে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানায় লবণ সরবরাহ করেছে। এতে কাঁচা চামড়া বেশি সময় সংরক্ষণ করলেও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কম থাকবে। ফলে সিন্ডিকেট করে যে চামড়ার দাম কমিয়ে কেনা হয়, এবার তা হবে না বলে অনেকে মনে করেন।
চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানির পশুর ৭৫ লাখ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এবার কম দামে চামড়া কিনতে হবে। কারণ, আর্থিকসংকট। ট্যানারির মালিকদের ৮৫ শতাংশই আগেরবারের নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়া খাতের ব্যবসায়ে মন্দা চলছে।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, আমরা দেখেছি কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি নিয়ে এক ধরনের নৈরাজ্য চলে। কিছু অসাধু ট্যানারির মালিক ও আড়তদার বিভিন্ন অজুহাতে পশুর কাঁচা চামড়া কম দামে কিনে থাকেন। চামড়া সংগ্রহকারীরা এসব ব্যক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। সরকার যদি পশুর চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে তবে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কম দামে আর বিক্রি করা লাগবে না। সরকারের উচিত এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে ব্যবস্থা নেওয়া।
সরকারের পক্ষ থেকে চামড়া ব্যবসায়ীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যাংকঋণের বিশেষ সুবিধা এবং সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই চামড়া ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো অজুহাত দিতে না পারেন সে ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। ট্যানারির মালিক ও আড়তদাররা যাতে সিন্ডিকেট করে কম দামে চামড়া কিনতে না পারে সে ব্যাপারে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে। আশা করছি, ট্যানারির মালিক ও আড়তদাররা সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম অনুযায়ী চামড়া ক্রয় করবেন। সরকারও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে চামড়ার দস্যুতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।