ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির পর জনজীবন ও দেশের সার্বিক অবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঈদের সময়ে জনচলাচলে দেখা দেয় চাঞ্চল্য এবং সাময়িক স্থানান্তরের ঘটনা। অধিকাংশ মানুষ নগরজীবনের কর্মস্থল বা কাজের জায়গা ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামের বাড়িতে যান। ছুটি শেষে আবার ফিরে আসেন কর্মক্ষেত্রে। পাশাপাশি ঈদকে ঘিরে মানুষের কেনাকাটা এবং বাণিজ্যও জমে ওঠে। বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের জন্য ঈদই হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবর্ণ সময়। কিন্তু বরাবর ঈদকে কেন্দ্র করে যেসব সমস্যা দেখা দেয়, এবার তাও দেখা গেছে। তবে তুলনামূলকভাবে তা ছিল কম।
ঈদে প্রধান যে উদ্বেগ বাড়িমুখী মানুষের মধ্যে কাজ করে, সেটা হচ্ছে কর্মস্থল ছেড়ে বাড়িতে পৌঁছানো এবং বাড়ি থেকে আবার কর্মস্থলে ফেরা। বেশি ভোগান্তি হয় বাড়িতে যাওয়ার সময়। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের এবারও বড় বড় শহর, যেমন ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বাড়িতে যেতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, ঈদের আনন্দের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। খোদ রাজধানীতে ঈদের ছুটিতে ৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের পক্ষ থেকে সচেতন করা সত্ত্বেও এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা ছিল অনভিপ্রেত। রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যুর ঝুঁকি কখনো কমে না। এখনো যারা বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ফিরছেন তাদের প্রতি আমরা এই আহ্বান জানাচ্ছি যাতে তারা কর্মস্থলে নিরাপদে ফিরতে পারেন।
পশুর হাটেও ছিল নৈরাজ্য। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া ইজারাদারদের লোক পথ আটকে ব্যাপারীদের অনেকটা জোর করে নিজেদের হাটে নিয়ে গেছেন। তবে সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনার ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকায়। উত্তরার মেট্রোরেলের জায়গায় হাট বসানো হয়েছে, দুই দিন এটা চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠলে সেই হাট উত্তর সিটি করপোরেশন ভেঙে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে বর্জ্যে পুরো এলাকা সয়লাব হয়ে যায়। পরিচ্ছন্ন মেট্রো এলাকা রীতিমতো পরিণত হয় ভাগাড়ে। পরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চললেও তা যে আশানুরূপ ছিল না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্জ্য কতটা অপসারিত হয়েছে, নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে তার ইঙ্গিত মেলে।
প্রধানমন্ত্রী কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজে ৪ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম ঘুরে দেখার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শন জনগণের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দেয় এবং মানুষ তাকে স্বাগত জানান।
কোরবানি ঈদের অর্থনীতি মূলত আবর্তিত হয় চামড়া ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। সেই ব্যবসা গতবারের তুলনায় আরও মন্দা গেছে বলে চামড়ার খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন। গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম সরকার গত বছরের চেয়ে এবার ২ টাকা বাড়িয়েছিল। কিন্তু রাজধানীতে সেই দামে চামড়া বিক্রি হয়নি। ময়মনসিংহের চামড়ার হাট শম্ভুগঞ্জ কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর রাজারহাটে পর্যাপ্ত চামড়া থাকলেও বিক্রি না হওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটান চামড়া নিয়ে আসা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। বরিশালসহ সারা দেশের চামড়ার বাজারের চিত্র ছিল একই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটা ঘটনায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল সমালোচনায় মুখর। সেখানে একশ্রেণির ধর্মান্ধ শিক্ষার্থীর আপত্তির মুখে প্রশাসন পূর্বানুমতি নেওয়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই সেন্সর ছাড়পত্র পাওয়া এবং ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের পরও কেন প্রদর্শনীটি বন্ধ করা হলো, তাই নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যে চলচ্চিত্র দেখেছেন, সেই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করা ছিল অভূতপূর্ব একটা ঘটনা। এ রকম হতাশার মধ্যেও স্বস্তির দিকটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিজের চোখে ঘুরে দেখার বিষয়টি।
টানা ৭ দিন ছুটির পর আজ অফিস-আদালত খুলেছে। রাজধানী ঢাকা আবার কর্মমুখর হয়ে উঠবে। বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও বড় বাজারগুলো ধীরে ধীরে আবার সরব হবে। অন্য সময়ের মতো ঢাকা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। সে রকম পরিস্থিতিতে সারা বছর সবার জীবনযাপন স্বস্তির হোক, আনন্দমুখর হোক।