পারিবারিক-সামাজিক বন্ধনের মধুর সম্পর্কগুলো আজ নিঃশেষ হতে চলেছে। লোভ-লালসা ও সামাজিক নানা অস্থিরতায় একের পর এক ঘটছে নির্মম-নৃশংস ঘটনা। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দেশের বেশ কিছু ঘটনায় সমাজের বিবেকবান মানুষকে বেদনাহত করেছে। মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। রক্তের সম্পর্ক যেন প্রতিনিয়ত ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে। আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক বাবা-মায়ের হাতেও নির্মমভাবে প্রাণ হারাচ্ছে শিশু সন্তানরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক কোনো কারণে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটছে না, বরং বিভিন্ন ধরনের সমস্যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পারিবারিক হত্যা বা বীভৎস খুনের ঘটনা ঘটছে। কারণগুলোর দুটি দিক রয়েছে, একটি হচ্ছে চারপাশের পরিবেশ, যার মধ্যে নিজ পরিবার, সমাজ বা যেখানে বেড়ে ওঠে। অন্যটি হচ্ছে বিস্তৃত পরিবেশ, যার মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, অনলাইন-ভিত্তিক সামাজিকমাধ্যম। এ ছাড়া যিনি এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন তার শৈশবের বিকাশ কেমন ছিল, সেটাও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। পারিবারিক, সামাজিক বা যেকোনো কারণেই হোক হত্যা মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও জড়িত আসামিদের বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। এ জাতীয় নৃশংস ঘটনা কমিয়ে আনতে কারণগুলো চিহ্নিত করে পরিবার ও সমাজসহ দায়িত্বশীল সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু বীভৎস পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ আলোচিত ঘটনাটি হচ্ছে গত ৯ মে ঘটা গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউতকোনা গ্রামে। সেখানে ফোরকান মিয়া স্ত্রী শারমিন, তিন সন্তান ও শ্যালকসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করেন। এমনকি বীভৎস এই পাঁচ খুনের পর নিজেই খুনের কথা ফোন করে অন্য স্বজনকে জানান। অন্যদিকে গত ২২ এপ্রিল নওগাঁর নিয়ামতপুরে সম্পত্তি দখলের লোভে হাবিবুর রহমান, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুন করে নিকটাত্মীয়রা। এসব নৃশংস ঘটনা সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের অস্তিত্বকে মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত স্বামীর হাতে, স্বামীর পরিবার ও নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন ৮৫ জন নারী। এ সময়ের মধ্যে শিশু, কিশোরী ও বিভিন্ন বয়সের অন্তত ১৮০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২০ শিশু-কিশোরী খুনের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের বিগত ৫ মাসে ১১৫ শিশু বিভিন্ন কারণে হত্যার শিকার হয়েছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সংকট উত্তরণে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে জরুরি। বিশ্বাসভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানের চর্চা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আইনের শাসন, পারিবারিক ও নৈতিক অনুশাসনগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠা করা গেলেই এ ধরনের নৃশংস ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে।
সমাজে নানা কারণে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে নির্মম-নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটছে। এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনায় মামলা, বিচার বা শাস্তির প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা রয়েছে। পরিবার ও জীবনযাপনে নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। পারিবারিক ও সামাজিক অবক্ষয় ঠেকাতে হলে সবার আগে সহনশীল ও বিবেকবান মানবিক মানুষ হিসেবে সমাজ ও পরিবারের ভিত মজবুত করতে হবে। সুস্থ সমাজ গঠনে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক ভূমিকা রাখবে। সর্বোপরি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।