[চতুর্দশ পর্ব]
ইংরেজ কবি জন ইয়েটস তার বিখ্যাত কবিতা ওয়েস্টল্যান্ডে বলেছিলেন, এপ্রিল ইজ দি ক্রুয়েলেস্ট মান্থ। কিন্তু রুকুর কাছে মনে হলো, জুলাই এর বাংলাদেশ দেখলে এই মহান কবি হয়তো নিষ্ঠুরতম মাস হিসেবে জুলাইকে চিত্রিত করতেন।
বিরক্তমুখে ঢাকা শহরতলির এক নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল সে, এ রাস্তায় কত কত দিন তার সঙ্গে একান্তে হেঁটেছে রুকু। এখন বিপ্লবের চূড়ান্ত দিনগুলোতে আর প্রকাশ্যে হাঁটা যায় না। তা ছাড়া তার ওপর চলছে নজরদারি। গোপনে থেকে আন্দোলনের জাল গুটায়ে আনছে নেতা। আজ কি জানি কেন তাকে সাংকেতিক জায়গায় ডেকে পাঠানো হয়েছে।
রুকু ভাবে, কি নিষ্ঠুর সময় না যাচ্ছে জুলাই জুড়ে। শত শত শিক্ষার্থীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে সারা দেশের রাজপথ। প্রায় সব সমন্বয়ককে গোয়েন্দারা জাল পেতে ধরেছে। তাই প্রতিবাদ দূরের কথা, নেতাদের অনুপস্থিতিতে আন্দোলনের মাঠে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা।
তবে আশার কথা, সে এখনো বাইরে আছে। তার নেতৃত্বে রুকুসহ দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সারির নেতারা প্রফেসর খানের তত্ত্বমতে এখন নতুন স্থানে আন্দোলনের জাল গুটিয়ে আনছে। ঘেরাও হতে যাচ্ছে ঢাকা শহর এতদিন অপরিচিত থাকা নতুন কর্মী বাহিনীর হাতে। রুকুর শঙ্কা এবং প্রার্থনা, আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া হয়েছে ভেবে ততদিন সরকার নিশ্চিন্ত থাকুক, আরামে ঘুমাক সরকারের গোয়েন্দা আর এজেন্টরা।
এ সময় সবকিছু ছাপিয়ে আবার সেই শূন্যতার বুদ্ধ রক্তে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। কখন, কতদিন পরে এই পথের সময় শেষ হবে। কোনোদিন মুক্ত দেশে অস্তগামী সূর্যের আলোয় বিকেলে এই রোড ধরে তার হাতে হাত রেখে হাঁটতে পারবে!
আর কতদিন!
হাঁটতে হাঁটতে মুন্সী ওস্তাগার লেইনে এসে পড়েছে রুকু। আন্দোলনের প্রথমদিকে, এখানে ঐ মোড়ের ছাতিম তলায়, যেখানে ধোলাইপাড় কি রায়ের বাগের দিকের গাড়িগুলোর হাঁকডাকে একদিন জনপদ মুখরিত হয়ে থাকতো, ছোট এক পথশিশুর গুলিবিদ্ধ লাশ পড়েছিল সেখানে। পথ পার্শ্বের একজন বলেছিল তার নাম সাগর। পিতৃমাতৃহীন ছেলেটি মোড়ের চা দোকানে কাজ করত। তার বাড়িঘর কোথায় জানা যায় না।
আন্দোলনে নেমে এই প্রথম লাশ দেখা রুকুর। তাও এরকম এক অসহায় পথশিশুর লাশ। রুকু ভাবে, তার নাম কি কোনোদিন কেউ মনে রাখবে? এমনকি আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম তার লাশ দাফন করার সময় সরকার, বিরোধী দল কেউ আসেনি। যদি আজ দলের কেউ মারা যেত, নেতা-নেত্রী, মিডিয়া মিলে ‘কত কিছু হইত।’ রুকুর অসহায়ত্ব আর্তনাদ করছিল। সে বললো, চলো, আমরা অন্তত সরকারি নৃশংসতায় মৃত্যুর খবরটা ছাপি।
ততদিনে তাদের সম্পর্ক আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছিল।
সে বলল, মিডিয়া সরকারবিরোধী কিছুই ছাপবে না।
-তাহলে উপায়?
-উপায় কিছু নেই, শুধু এই মাসুম বাচ্চাটি যেন জান্নাতের বাগানে পাখি হয়ে উড়ে সেই দোয়া করি। তবে,
-তবে কি?
-তুমি চাইলে শোক-বাণী দিতে পার। পত্রিকায় সেটি ছাপাবে। আর যদি তুমি বোদ্ধা সাহিত্যিক হও, শোক বাণীতে অনেক কিছু বলা যায়।
-তুমিই লিখে দাও।
অদ্ভুত তাকিয়ে ছিল সে। তারপর লিখলো, পত্রিকাতেও তা ছাপা হলো। রুকুর এখনো স্মরণে তরতাজা সেদিনের পত্রিকায় ছাপা হওয়া শোকবাণী,-
সাগর মিয়া মারা গেছে।
গতকাল সাগর মিয়া মারা গেছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল আনুমানিক সাত আট বছর। তার পিতামাতা বা স্থায়ী ঠিকানা জানা না থাকায় প্রকৃত বয়স জানা যায়নি।
ধোলাইপাড়ে একটি চায়ের দোকানে কাজ করত সাগর। গতকাল বিকেলে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম তার গুলিবিদ্ধ লাশ রাস্তার মোড় থেকে কুড়িয়ে দাফন করে। এই রাস্তা গত কয়েকদিন ধরে সরকার বিরোধী আন্দোলনে অচল হয়ে পড়েছিল।
স্থানীয়রা জানান, তার মৃত্যুতে কেউ শোক প্রকাশ করেনি এবং তার জানাজায় সরকারি বা বিরোধী দলের কাউকে দেখা যায়নি। স্থানীয় পাঞ্জেগানা মসজিদের ইমাম জানান, তার কুলখানি বা কোরানখানির জন্য এ পর্যন্ত কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
সেই কতদিন!
ফলকবিহীন কবরটি জেয়ারত করতে করতে রুকুর মনে অনেক কিছু একসঙ্গে কথা বলতে চাইল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলতে পারল না সে।
নির্দেশমতো কবরস্থান পেরিয়ে সামনে পা বাড়াল সে।
“সাগর মিয়া কবর থেকে হেঁটে সোজা মোড়ের ‘মায়ের দোয়া’ রেস্টুরেন্টে যাবে। এ দোকানে সাগর মিয়া চাকরি করত। দোকানিকে বল, বড়ো ভালো ছেলে ছিল সাগর। দোকানি বিখ্যাত ডালপুরি খেতে দিবে। খেতে খেতে বলবে, সাগরের বাড়ি কোথায় জানা গেছে? দোকানি বলবে; শুনেছি তার গ্রামের নাম তেঁতুলঝরা।
তেঁতুলঝরা কোথায় জানতে চাইলে দোকানি পথ দেখিয়ে দিবে। তার দেখানো পথে এগিয়ে যাও।”
এ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। দোকানির দেখানো পথ ধরে একটি নাম-না জানা নদীর তীরে এসে পৌঁছালো রুকু। দোকানি বলেছিলেন, এখানে দেখা যাবে নদীতীরে দাঁড়ানো একটি নৈশ স্কুলের দেয়ালে লেখা “ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”
গোলটা বাঁধল এখানে। দেয়ালে শুধু ইনকিলাব লেখা, জিন্দাবাদের নিশানাও দেখা গেল না। বিরানা গ্রামের প্রান্তরে মনে আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল রুকু। তারপর কৌতূহলে দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেল।
এখন বর্ষাকাল। রুকু দেখলো, বর্ষার জলে ধুয়ে ‘জিন্দাবাদ’ মরে গিয়ে শুধু ‘ইনকিলাব’ বেঁচে আছে।
আপন মনে হাসলো রুকু। কিন্তু তার হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। দেয়ালের পেছন থেকে এক জোড়া সবল হাত এসে তাকে দ্রুত নৈশ বিদ্যালয়ের অন্দরে নিয়ে গেল।
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল রুকু। সে ভেবেছিল, এতদিন গুপ্ত বাহিনীর হাতে সহযোদ্ধাদের গুম হওয়ার গল্প শুনে এসেছে; এইবার তার নিজের পালা শুরু হলো বলে।
কিন্তু এই হাত, এই হাতের বন্ধন তার এত পরিচিত লাগছে কেন?
চোখ খুললো রুকু। চোখ খুলে দেখলো, সেই ভাসা ভাসা দুটি চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকিয়ে থাকলো দুজন বহু বহুক্ষণ।
তারপর সে বলল, এর প্রয়োজন ছিল, কারণ চারদিকে সরকারি গোয়েন্দাতে ভরে গেছে। তাই আমাদের আন্দোলনের এই উত্তুঙ্গ সময়ে তাদের নজরদারি এড়িয়ে বাকি কাজটুকু সমাপ্ত করতে হবে।
রুকু কিছু বলল না। তার ইচ্ছে হলো, সব কিছু একপাশে রেখে এই বর্ষণ ক্লান্ত বিকেলে এই নিরালা প্রকৃতির কন্দরে তার বাহুর বন্ধনে বাকি জীবনের দিন-মাস-বর্ষ যদি ‘এমন করিয়া কাটিয়া যাইত।’ কিন্তু কিছুই “বলা হইল না।”
-আমাদের প্ল্যানমতো তৃতীয় সারির প্রায় সব সমন্বয়ক আটক হয়েছে। আমরা এখন দ্বিতীয় আর প্রথম সারির সমন্বয়কদের নিয়ে বিপ্লবের শেষ পর্বটি সমাপ্ত করতে চাই। ফিল্ড প্রস্তুত এখন ট্রিগারের অপেক্ষা। রুকু বলল, ২য়, ৩য় সারির নেতা কারা বুঝিয়ে বল। আমার গোলমাল লাগছে। হাসল নেতা, এখনো তা গোপনীয়, সময় হলে জানবে।
রুকু বলল, ট্রিগারটা কখন হবে?
-সেটি সময় বলবে। পুরো দেশ এখন বৈষম্যবিরোধী একই সূত্রে গাঁথা হয়েছে। কোনো একটু স্ফুলিঙ্গ লাগলেই সেই সুতার মাধ্যমে শহর গ্রাম একসঙ্গে জ্বলে উঠবে।
-কিন্তু স্ফুলিঙ্গ জ্বালাবে কে?
-অপেক্ষা কর, আরও কিছু কাজ বাকি। যেমন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন সরকারি দল বিতাড়িত হলো সেটি একটি ট্রিগার হতে পারতো; হয়নি। আবু সাইদ, ওয়াসিম হত্যা ট্রিগার হতে পারতো, হয়নি। যখন মিরপুর, চানখারপুল, যাত্রাবাড়ী ম্যাসাকার হলো প্রত্যেকটি একটি স্ফুলিঙ্গ হয়ে সারা দেশে আগুন জ্বালাতে পারতো। কিন্তু হয়নি। কারণ তখনো শিক্ষার্থী এবং জনতা আলাদা ছিল, এখন এত ম্যাসাকারের পর শিক্ষার্থীরা আর শিক্ষার্থী নেই, তারা এখন সন্তান; কোনো না কোনো পিতা মাতার সন্তান, জনতার সন্তান। এখন এই আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলন। তাই এবারের ট্রিগারে দাবানল জ্বলবে দেশব্যাপী আর সে আগুনে পুড়ে ছারখার হবে স্বৈরাচারের তখত। আর আমার মনে হয়, স্বৈরাচার নিজেই আগস্টের শুরুতে তাদের ট্রিগার হ্যাপি বাহিনীর গুলিতে ছাত্র-জনতার সেই সলতেয় “আগুন জ্বালাইয়া দিবে।”
-এখন কি করব?
-এখন কী করব মনোযোগ দিয়ে শোনো। ‘আন্দোলন শেষ হয়েছে’ এই কথা কয়েকজন সমন্বয়কদের দিয়ে বন্দুকের মুখে ঘোষণা দিয়েও কাজ হয়নি। কিন্তু যেহেতু তারা সকলে আমাকে মাস্টার মাইন্ড মনে করে, যে কোনো মূল্যে গোয়েন্দারা আমাকে পেতে চাইছে। যদি আমার মুখে বিপ্লবীরা শোনে আন্দোলন শেষ হয়েছে, সরকার আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে, এখন সবাই কর্মস্থলে, নিজ নিজ শিক্ষালয়ে ফিরে যাই- তখন সরকারের বাজীমাত হবে; বিপ্লবীদের পাশাপাশি সরকারও জানে অন্তত জীবিত থাকা পর্যন্ত আমি সে কথা বলব না।
আঁতকে উঠে রুকু। অজানিতে তার দুই হাত তাকে বেতসলতার মতো জড়িয়ে ধরে।
-কিন্তু আমি ধরা দেব না।
- এই তো ধরলাম, হাসে রুকু।
যেন রুকু কিছুই বলেনি, এমনভাবে বলল নেতা,
-ওরা আমাকে অর্থাৎ একা এক যুবককে খুঁজছে। কিন্তু একটি দম্পতি-কে খুঁজছে না।
-মানে?
-হ্যাঁ। তুমি আবার মেয়ের সাজে ফিরে যাবে। তুমি শাড়ি পরা গ্রামের মেয়ে আর আমি ছাতা-ধরা, পাঞ্জাবি পরা গ্রামের পুরুষ; আমরা দম্পতি হয়ে একসঙ্গে ঘুরব, যখন স্থানান্তরে গমনের প্রয়োজন হবে। অন্য সময় আমাকে একাকী কাজগুলো এগিয়ে নিতে হবে। আর হ্যাঁ, আগস্টে ঢাকায় চূড়ান্ত মুহূর্তে তোমাকে আসল কাজে নামতে হবে, সেটি হলো পূর্বদিক থেকে ছাত্রজনতার কাফেলা নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ। দক্ষিণের পাশাপাশি উত্তর দিকের কাফেলা সংগঠনের জন্য এ কয়দিন আমাকে যেকোনো মূল্যে তাদের হাত থেকে দূরে থাকতে হবে। সেজন্যই তোমাকে এখানে নিয়ে আসা।
-এখন?
-এখন, এই পেছনের কক্ষে শাড়ি-চুড়ি সব আছে। পরে আবার মেয়ে হও। তারপর বের হব দুজন।
এত দিন পুরুষ বেশে থেকে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল রুকু। পেছনের রুমে এসে অনায়াসে ‘মেয়ে হয়ে গেল’ বটে, কিন্তু সহজ হতে পারল যা সহজে। আরেকটি কথা বিদ্যুৎ চমকের মতো তার পিঠের ওপর দিয়ে তরঙ্গিত হলো। এতদিন পুরুষের ছদ্মবেশে সমাজে যেরকম নিশ্চিন্তে চলাফেরা করত, আজ সেটি শেষ হলো বলে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, বিপ্লব সমাপ্ত হলে সমাজের এই দিকটি অর্থাৎ নারীবিদ্বেষের দিকটি নিয়ে কাজ করতে হবে। আসলে কত কিছু নিয়ে যে কাজ করতে হবে ভেবে একাকার হলো সে, কূলকিনারা পেল না কোনো।
সামনের রুমে এসে রুকু দেখলো মাথায় টুপি পরা একজন মৌলানা বসে আছেন। থতোমতো খেয়ে গেলো সে।
-তুমি যখন ধরতে পারনি, টিকটিকিরাও আমার টিকিটিও খুঁজে পাবে না।
রুকু হাসিতে ভেঙে পড়ে। চারদিকে বৃষ্টির বিরাম নেই। বর্ষা-মন্দ্রিত বিকেলে দুই সোমত্ত নারী পুরুষ প্রকৃতির নিরালা একটি কোণায় একাকী হয়েছে। স্বপ্ন আর সম্ভাবনার তিরতিরে জলে ভিজে উঠল রুকু। বর্ষার বিরহী কবি রবীন্দ্রনাথ, কালিদাস বোধ করি একযোগে চাইল তারা অন্তত নিজেদের বুকের উত্তাপ ভাগাভাগি করে নিক, তারপর যা হওয়ার হবে। তবে কিছুই হলো না।
রুকুকে পরম আদরে জড়িয়ে ধরল সে। কাঁদল দুজন, তারপর চোখের জল মুছে বলল, চলো যাই।
-চলো।
চৌদ্দ.
বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। ‘মায়ের দোয়া’ রেস্টুরেন্টে বসে এ পর্যন্ত তিনি তিন কাপ চা সাবাড় করেছেন।
সে গেল কই?, মনে মনে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন মতি। কিন্তু উত্তর খুঁজে পান না।
ধোলাই খালের মোড়ে সবাই তাকে মতি বলে জানে। সবাই এও জানে তিনি সরকারি গোয়েন্দা। বেঁচে থাকতে সাগর মিয়া প্রশ্ন করেছিল, বস আপনি যে গোয়েন্দা সে তো এ তল্লাটে সবাই জানে। এতে আপনার গোয়েন্দাগিরি করতে সমস্যা হয় না?
হো হো করে হেসেছিলেন তিনি। সেদিনও বরষা ছিল। তার পর ‘মায়ের দোয়া’ রেস্টুরেন্টের বিখ্যাত ডালপুরি খেতে খেতে বলেছিলেন,
-বাংলাদেশের সব এলাকার গোয়েন্দাদের ওখানকার লোকজন চেনে। আরে ব্যাটা আমাদের যদি এলাকার লোকে নাই চিনল, তাহলে আমরা “এই ক্ষমতা লইয়া কি করিব?” ক্ষমতা এমন জিনিস যেটাকে প্রদর্শন করতে হয়; একে লুকায়ে রাখলে ধার কমে যায়।
সেই তীক্ষ্ণধার গোয়েন্দা প্রবর এখন ‘মায়ের দোয়া’ রেস্টুরেন্টে বসে খাবি খাচ্ছেন। ওপর থেকে খবর পেয়ে শহর থেকে আসা এক ছাত্রকে ফলো করে তিনি এখানে এসেছেন। সে ছাত্র কে তা গোয়েন্দাবাবু জানেন না; তবে নিশ্চিত জানেন, এখানে এই দোকানে বসেই সে ডালপুরি খেয়েছিল। দোকানিও বললেন, সে এখানে ডালপুরি খেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, তেঁতুলঝরা গ্রাম কতদূর?
- তারপর?
-তার আর পর কি, আমি বললাম, এ তল্লাটে এ নামের কোনো গ্রাম আছে তো শুনিনি। ভাইসাব, আপনিই কন, এই নামের কোনো গ্রাম কি এখানে আছে?
- না; তা হবে কেন?
বলতে বলতে বৃষ্টির মধ্যেই গোয়েন্দা প্রবর বের হয়ে আসেন। সামনে ছাতা মাথায় আসা এক গ্রামীণ দম্পতিকে জিজ্ঞাসা করেন,
-¯আসছামালাইকুম ভাই। আপনারা পথে কলেজ পড়ুয়া এক ছেলেকে দেখেছেন?
রুকুর ভেতর ধক করে ওঠে। কিন্তু তার নেতা নির্বিকার উত্তর দেয়,
-জি। সে তো প্রায় মাইল দুয়েক পেছনে গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল, তেঁতুলঝরা গ্রাম আর কতদূর। আমরা চিনি না জানালে সামনের দিকে চলে যায়।
গোয়েন্দা বাহাদুর আর কিছু জিজ্ঞেস না করে দ্রুত রুকুদের ফেলে আসা পথের দিকে এগিয়ে যান। মনে মনে তড়পান তিনি, এত সহজ একটি টার্গেট এভাবে হারিয়ে ফেলেছেন, কর্তাকে কি জবাব দেব এখন?
রুকু বলল, দেখিনি বললেই তো হতো, কেন বলতে গেলে দেখেছ, এখন যদি বলত, চলুন আমার সঙ্গে, ওকে ধরতে হবে এটি সরকারি কাজ?
-গ্রামে এই রকম একটি দম্পতিকে সে জোর করবে না। তাকে পেছনে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল কিছু সময় খরিদ করা। যাতে আমরা এখান থেকে দূরে চলে যেতে পারি আর একটি বিষয় জানার ছিল, তারা এখনো একজন মানুষকে খুঁজছে, একজোড়া মানুষ অর্থাৎ কোনো দম্পতিকে নয়। কাজেই আমরা আপাতত নিরাপদ আছি।
নিরাপত্তা আরও জোরদার করার জন্য রুকুরা সামনের দোকান থেকে এক কেজি বাতাসা এবং এক কাঁদি বাংলা কলা কিনল। আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছেন তারা আর কে না জানে ধোলাই খালের লোকেরা খালি হাতে আত্মীয় বাড়ি যায় না।
রুকুরা যখন ধোলাই খালের পাড়ে সেই গোয়েন্দার সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল, তখন সরকারের গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টার্সের সিচুয়েশন রুম জমজমাট।
ধোলাই খালের দায়িত্ব প্রাপ্ত অফিসার বললেন,
-সে তাকে হারিয়ে ফেলেছে।
- কাকে?
-একটি ছেলেকে আমরা বিভিন্ন সভায় দেখে মার্ক করি, তারপর তাকে ফলো করতে থাকি, যদি সে আমাদের সমন্বয়কদের আস্থানায় নিয়ে যায়।
-নিয়ে গেল?
-প্রায়ই। আমরা এখন নিশ্চিত ছেলেটি নিজেই একজন সমন্বয়ক অথবা তাদের কেউ। কারণ সে হঠাৎ রাস্তার ওপর থেকে নাই হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সোর্স প্রকাশ্য দিনের আলোয় জলজ্যান্ত একজন মানুষকে হারিয়ে ফেলে। “এই ধরনের গোয়েন্দা লইয়া কি করি?”
সিচুয়েশন রুমে উপস্থিত বন্ধু দেশের গোয়েন্দা প্রবর মিষ্টি হাসলেন। তারপর বললেন;
-ক্ষমতা জাহির করার জন্য আপনাদের সব গোয়েন্দা নিজের এলাকায় নিজের পরিচয় নিজেই প্রকাশ করে। এতে নিজেদের লাভ হয় বটে, কিন্তু দেশের যে কি ক্ষতি হয় তা এখন বোঝা যাচ্ছে। পুরো দেশে কোনো গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আর নেই; তাদের সবাই চেনে।
তার কথায় কেউ কিছু বলল না। তবে সিচুয়েশন রুমের নেতা বলেন,
-আমাদের দেশে তো আপনাদের নেটওয়ার্ক আছে। তাদের কী খবর বলেন?
-তারা তো সত্যিকারের গোয়েন্দা, সবাই জানে তারা আছে, কিন্তু কেউ জানে না কোথায় আছে। তারা নিজেদের জাহির করে না কোনোদিন।
-ধন্যবাদ, আপনাদের প্রফেশনালিজমের কাছে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আপনারা অনেক বাস্তববাদী, আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গি বৈজ্ঞানিক। এবার অনুগ্রহ করে বলুন, মাঠের অবস্থা কী?
-আমি এখন কাজ করতে পারছি না।
-কারণ?
-এখনো রবি স্থির রাশিতে আছেন, আজ রাত্রি অষ্টম প্রহরে গুরু বাসরে আসবেন। চন্দ্রও স্বাতী নক্ষত্রে গমন করবেন। শাস্ত্রমতে তখনই কাজে নামা বিধেয়।
বৈজ্ঞানিক মানুষের অবৈজ্ঞানিক সংস্কার দেখে সিচুয়েশন রুমের নেতা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান, কিন্তু কিছু বলেন না। ফিরে তাকান নিজের লোকজনের দিকে,
-এখন যারা আমাদের কবজায় আছে তারা কেউ সরকারের পতন করাতে পারে বলে মনে হয় না। নিশ্চয়ই এর পেছনে অন্য কেউ বা কারা আছে, যারা এখনো অধরা।
-একটু খুলে বলুন। আমরা তো প্রথম সারির সব সমন্বয়কদের সাইজ করেছি। ওরা হয়তো দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির নেতা যাদের কাঁধে এখন দায়িত্ব এসে পড়েছে।
- যদি অন্যভাবে চিন্তা কর উত্তর পেয়ে যাবে। যাদেরকে সামনে দেখা যায় সবসময়, যারা এখন আমাদের কবজায় ওরাই হয়তো তৃতীয় চতুর্থ সারির নেতা। তারা রিমান্ডের মুখে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে ইতোমধ্যে নেতৃত্বের দুর্বলতা প্রমাণ করে দিয়েছে।
তবে ওখানে কয়েকজন নেতা পাওয়া গেছে যারা শত নির্যাতনের মুখেও নতি স্বীকার করেনি। তারা মরবার জন্য কলেমা শাহাদাত পড়তে প্রস্তুতি নিয়েছে; কিন্তু আমাদের কথামতো কিছু করতে এতটুকু প্রস্তুত নয়।
-মনে হয় ওরা আসল নেতাদের মধ্য থেকে এসেছে।
-এখন প্রশ্ন, অন্য আসল নেতারা কোথায়?
-রহস্য ওখানেই। আমার মনে হয়, মনে হয় কেন এখন আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, এ শ্রেণির নেতারা নিজেদের কোনোদিন প্রচারের আলোয় না এনে অন্য সমন্বয়কদের সামনে এনে আড়ালে থেকে আন্দোলন পরিচালিত করছে। সত্যিকারের নেতা ওরাই, প্রতিপক্ষ হলেও ওদেরকে স্যালুট।
-তাই তো বলি, প্রায় সব চেনামুখ নেতাদের লক আপে নেওয়ার পর আন্দোলন আরও বেগবান হচ্ছে কেন; কেন শহরের আন্দোলন এখন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে যাচ্ছে?
এ সময় বিদেশি গোয়েন্দাপ্রবর বলেন, হ্যাঁ, ওরা সত্যিকারের নেতা। বলশেভিক বিপ্লবের সময় লেনিন, স্ট্যালিন সামনে থাকলেও পেছন থেকে আসল নেতৃত্ব দিয়েছেন ট্রটস্কি আর বুখারিন। ল্যাটিন আমেরিকায় সিমন বলিভার আর চে গুয়েভারা একের পর এক দেশ স্প্যানিশ মুক্ত করেছেন, কিন্তু নেতা না হয়ে চলে গেছেন নতুন দেশের মুক্তিতে। তাই আপনার মতো আমিও নির্যাতনের মুখে নত না হওয়া এবং এখনো অধরা এই নেতাদের স্যালুট জানাই। তবে তারা কেউ একটা এত বছরের প্রতিষ্ঠিত সরকারের পতন আর পতনের পর তার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। সে নেতা এমন একজন হতে হবে যার মধ্যে এই যোগ্যতা আছে। তার আপাতত নাম দেওয়া যায় মাস্টারমাইন্ড। সে কোথায় এখন সেইটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
একটু থেমে বিদেশি গোয়েন্দা আবার বললেন,
-তবে নকশাল বাড়ি আন্দোলনের ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করলে এ ধরনের নেতাদের গতিবিধি মোটামুটি আন্দাজ করা যায়। তারা যখন যে স্থানে যায় সেখানেই আন্দোলন জমাট বাঁধে আর তা প্রকাশ্যে আসতেও সময় লাগে না। কাজেই দেখুন, এখন নতুন কোনো জায়গায় বিপ্লবীরা মাঠে নেমেছে।
চলবে...