সকালটা শুরু হলো এভাবে। ডিং ডিং ডিং...। বেজেই চলেছে অ্যালার্ম। ঘরের ভেতর আধো অন্ধকারে আকাশি মশারি; সে ঘুমন্ত অবস্থাতেই কম্বলের ভেতর থেকে হাত বার করে অ্যালার্ম স্টপ করে। ঘুমচোখে তাকিয়ে দেখে, লম্বা সিল্কের পর্দার ফাঁক দিয়ে ভারি ম্রিয়মাণ একটা আলো ঢুকছে। হতক্লান্ত দুটো মশা তখনো মশারির চালে বসে হুল ফোটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
-ধেৎ! সে আবার কম্বলে মাথা ঢাকায়। আর সমানে নিজেকে বলতে থাকে, ৮টায় ওঠার জন্য কেউ অ্যালার্ম দেয়? মনে আছে, কিছুদিন আগেও ৭টার সময় গিয়ে স্কুলের খাতায় সাইন করতিস? সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই নিজেকে উত্তর দেয়- যখন যেমন তখন তেমন ভাই। এখন আমি উঠতে পারছি না। বেশ করব, ৯টা-১০টা অব্দি ঘুমাব।
না, ‘বেশ’ করাটা আর তার হলো না। এবার ডোরবেল, ঘুমের মায়াজাল ছিন্ন করে তারস্বরে বাজতে থাকে। শম্প, দুই মিনিটের মধ্যে না খুললে, শম্পা উল্টো দিকে হাঁটা মারবে। নাহ, এ ঘটনা কিছুতেই ঘটতে দেওয়া যাবে না। মনে প্রচুর জোর এনে এক ঝটকায় কম্বলের বাইরে এসে, হুড়মুড় করে সে দরজা খুলতে দৌড়য়।
এ কী, অ্যালার্ম কোথায়? এ তো তার এডিটর সায়নদার ফোন! সর্বনাশ, কপালে দুঃখ আছে। মোট তিনবার রিং করেছে। প্রতিবারই সে অ্যালার্ম ভেবে বন্ধ করে দিয়েছে।
মহুল কাঁপা হাতে রিং ব্যাক করে। টানা পৌনে তিন মিনিট ধরে প্রবল দাবড়ানি এবং মহুলের পক্ষ থেকে প্রচুর কাকুতি-মিনতির পর, কোনোক্রমে অবস্থা সামাল দেওয়া হয়েছে।
-‘তাহলে কখন বেরোচ্ছিস? অ্যাসাইনমেন্টটা কিন্তু তুই জোর করে নিয়েছিস।’
তা নিয়েছে। বাইরে গিয়ে কাজ করার মধ্যে একটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এবং কাজটাও অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং। তবে এক্ষুনি বেরোতে হবে, সেটা বোঝেনি।
-‘তুমি কিচ্ছু চিন্তা কোর না প্লিজ সায়নদা; ব্যাগ গোছানই আছে। জাস্ট হাফেন আওয়ার, বেরিয়ে পড়ছি!’
বাঁকুড়া তার এই প্রথম যাওয়া। আশপাশের জায়গাগুলো সম্পর্কে নেটে আগে থেকেই একটু ঝালিয়ে নিয়েছিল। রোহন সম্পর্কেও দেখছিল। কোথায় কী কাজ করেছে... ইত্যাদি। ব্যক্তিগত কিছু তথ্য সেখানে নেই।
-‘হাই, আমি মহুল।’
সামনের সিটে বসা শ্যামলা ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে নড করে। ঝাঁকড়া চুল, বড় চোখ, সিনেমার হিরোর মতো চেহারা। রীতিমতো সুপুরুষ! ভাবা যায়, সমাজের একদম নিচের তলা থেকে উঠে আসা এ ছেলেটি আজ মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ডান্সার!
-‘আমি কিন্তু আপনার একটা ডিটেল ইন্টারভিউ করব। কলকাতা থেকে ছুটে এসেছি এই ইন্টারভিউটার জন্যই।’
হাসিমুখে ছেলেটি আবার ঘাড় ফেরায়।
-‘আপনি তো ফিল্মটার ওপরেও লিখছেন।’
-‘হ্যাঁ। তবে আউটডোরে এসেছি... এখন পাখির চোখ আপনার ওপর।’
-‘আই অ্যাম অনারড ম্যাম!’ রোহন মাথা ঝাঁকায়, অমায়িক হাসে।
যাদবপুর এইট-বি থেকে গাড়িতে ওঠার পর গাড়ি কোথাও থামেনি। সামনে বর্ধমান, গাড়ি আপনিই ব্রেক দিল। দুড়দাড় করে সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। সায়নদা ফোন করে, ‘সব ঠিক আছে তো রে?’
মহুল ভেবেছিল, কার না কার সঙ্গে গাড়ি শেয়ার করতে হবে। কিন্তু রোহন এবং সঙ্গে দুটো অতি লাজুক ছেলে ছাড়া এ গাড়িতে আর কেউই উঠল না। মাঝের লম্বা সিটে মহুল একা। সায়নদা বলেছিল, ‘ওরা যত্ন করে নিয়ে যাবে।’ তবে এত যত্ন ও জানত না।
বর্ধমানে লেট লাঞ্চ। এরপর রোহন এসে ওর পাশে মাঝের সিটে বসে।
-‘শুনেছি ছোট বয়সেই আপনি মা-বাবাকে হারিয়েছেন। সেখান থেকে আপনার এই এতটা জার্নি... এই সাকসেস, এ তো পুরো গল্পের মতো! আমরা কি এখন একটু-আধটু কথা শুরু করতে পারি?’
-‘বেশ তো, এতটা রাস্তা, কথা বলতে বলতে যাওয়া যেতেই পারে। আমি প্রথম বড় সুযোগটা পাই ন্যাশনাল চ্যানেলে এক রিয়ালিটি শোয়ে। সত্যি সেই জার্নিটা ছিল স্বপ্নের মতোই। খোলা আকাশের নিচে বড় হওয়া একটা ছেলে... হঠাৎ করে হাজার হাজার ওয়াটের আলোর নিচে, সত্যিই রূপকথার গল্প।’
মহুল রোহনের দিকে তাকিয়ে থাকে... কেমন একটা মায়া হয়। আবার সেই তার ‘মনে হওয়াটা’ ফিরে আসে। কোথায় যেন মহুল দেখেছে ওকে! অর্ক শুনলেই বলত, ‘দেখো গিয়ে তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ডের মধ্যে ঢুকে বসা কোনো ফ্রেন্ড। পাগল একটা!’
কথাটা খুব মিথ্যেও না। এ রকম আগেও হয়েছে। তবে এ ছেলেটা তো কখনই ওর ফেসবুক ফ্রেন্ড নয়?! সেলিব্রিটি ফেবু ফ্রেন্ডদের তো সে জানে, কথাবার্তাও হয়! ফেসবুক যখন ছিল না, তখনো কারুকে কারুকে দেখে ওর মনে হতো, খুব যেন চেনা! কেউ কেউ আইডেন্টিফায়েডও হতো। হয়তো বাবা-মায়ের সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে দেখা হয়েছিল; অথবা ডোভার লেনের ক্লাসিক্যাল প্রোগ্রামে আলাপ... ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনো আবার তার কারুকে মনে হয়, বহু যুগ আগে দেখা, যেন পূর্বজন্মের চেনা!
নাহঃ, এ ছেলেটার ক্ষেত্র আরও একটু অন্যরকম। একে যেন এ জীবনেরই কোনো এক সময় সরণিতে অনেকটা বেশি করে দেখেছে! কেমন নীল কুয়াশায় মাখা সেই স্মৃতি! ধুস্, যত্তসব পাগলামো তার...
অর্ককে একবার ফোন করা দরকার। ও এখন সিঙ্গাপুরে, ফিরতে দিন সাতেক। কলকাতায় থাকলে ফট করে ওকে বাঁকুড়ার মতো অজানা জায়গায়, অচেনা লোকজনের সঙ্গে কিছুতেই ছাড়ত না।
বাঁকুড়ার সোনামুখী, পাশেই জঙ্গল। সন্ধ্যার মুখে গিয়ে পৌঁছল। হিহি করে দাঁত কাঁপানো ঠাণ্ডা। শুটিং তখন প্যাকআপ। আবার পরদিন ভোর সাড়ে ৬টায় কল টাইম। রোহনের সঙ্গে টুকটাক অনেক কথাই হলো। তবু মূল সুরটা যেন ঠিক ধরা পড়ল না।
ছোট্ট শহরতলি। পৌরসভার অতিথি নিবাসে থাকার ব্যবস্থা। পরপর সব ঘরেই শুটিং পার্টির লোকজন। সামনের ড্রাইভ ওয়েতে ছাউনির তলায় রান্নার বিরাট ব্যবস্থা। হাঁড়িকড়া এবং রাঁধুনি জোগাড়ের ব্যস্ততা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, লোকজন নেহাত কম আসেনি। বাইরের কোনো এন্টারটেনমেন্টের ব্যাপার নেই এখানে। অতএব, কাজ শেষে সবাই মিলে জমিয়ে আড্ডা। ঠাণ্ডাও পড়েছে জব্বর। একটু রেস্ট নিয়ে মহুল নেমে এল নিচে।
উনুনের গণগণে আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে রোহন। কাল শুটিং শুরু হলে ব্যস্ততা বেড়ে যাবে। মহুল ভাবে, যতটা পারা যায় রোহনের সঙ্গে আজই কথা বলে স্টোরিটার আউট লাইনটা তৈরি করে ফেলতে হবে।
-‘কফি খাবেন?’ রোহন হাতের কফিমাগ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে।
মহুল হেসে বলে, ‘এই ঠাণ্ডায় কফির কথাটাই ভাবছিলাম।’ জোগারে ছেলেটা এক কাপ গরম কফি এনে হাতে ধরিয়ে দেয়। উনুনের পাশে দাঁড়িয়েই কফি খেতে খেতে সে বুঁদ হয়ে শোনে রোহনের জীবনকথা। সাকসেস নয়, স্ট্রাগেলের কথা। সাকসেস তো সে নেটেই পেয়ে গেছে। এটাই হচ্ছে আউটডরে আসার অ্যাডভান্টেজ। আবেগগুলো শেষপর্যন্ত বেরিয়ে আসেই!
-‘জানেন, একসময় খালি গায়ে দিন কেটেছে। এরকম শীতেও। নদীর পাশে ইটখোলার মধ্যে বেড়ে ওঠা। কিছু বোঝবার আগেই মা মারা গেল। সম্ভবত অন্যরকম মৃত্যু ছিল তা। থানা পুলিশের ঝামেলার ভয়ে ইটখোলার মালিক একপ্রকার নামকাওয়াস্তেই আমার দায়িত্ব নিল। বাবা তো আগেই অন্য এক কামিনের সঙ্গে কেটে পড়েছিল।’
সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই আবেগ দমন। সব জেনেও মহুলের বুকের ভেতর ব্যথা করে। তার থেকে সামান্য বড় এই সুপুরুষ ছেলেটির দিকে সে মমতামাখা চোখে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটার চোখজুড়ে থাকা কুচকুচে কালো আইবল গুলোতে... উনোনের দাউদাউ আগুনের কমলা ছায়া।
-‘বুঝতে পারছি!... আচ্ছা নাচ, মানে এই স্পেসটায় এলেন কেমন ভাবে? আপনার সেই বেড়ে ওঠার নদীর ধার, ইটখোলা...তা কোথায় ছিল? যদি একটু বলেন...’
আচমকা রুঢ় হয়ে ওঠে রোহন।
-‘গঙ্গার পাশে কোনো একটা জায়গা; সেটা কি খুব ইম্পরট্যান্ট? নদী, ইটভাটা এবং সব জায়গা থেকে লাথি খাওয়া একটা শিশুর জীবনযাপন... সবটাই তো বলা হলো। এটাই তো যথেষ্ট স্টোরি!’ থতমত খেয়ে যায় মহুল।
-‘আই আম এক্সট্রিমলি সরি রোহন!’ অকারণেই সে তার লম্বা বিনুনি আঙুলে পেঁচাতে থাকে। রোহন আবার যেন কী বলছে... মহুল ক্ষণেকের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
-‘আরে আমার তো বাড়ি...’ ব্যক্তিগত কথা বলার জায়গা নয় সাংবাদিকতা। মহুল নিজেকে কন্ট্রোল করে। ইতোমধ্যে রোহনের দু-একটা কথা সে আনমনে স্কিপ করে গেছে। কী বলছে এখন রোহন? অহ, ও-ও সরি বলছে!
–‘নেভার মাইন্ড রোহন!’ মহুল গালে টোল ফেলে অপূর্ব একটা হাসি দেয়। রোহনও লাজুক হাসে। হঠাৎ করে মুড সুইং করার জন্য ছেলেটা সত্যিই খুব লজ্জিত হয়েছে।
-‘তাহলে সেই থানা থেকেই ডক্টর এডওয়ার্ডের এনজিও; আর ওখান থেকেই আপনার ডান্সস্কুলে আসা? মানুষটি এবং তার এনজিও- দুটোই খুব লিবারাল অ্যান্ড ডিভোটেড ছিল বলছেন!’
-‘ইয়েস, অ্যাবসলিউটলি! উনি আমার কাছে ভগবান! তবে উনার কাছে যাই আমি এক অ্যাঞ্জেলের হাত ধরে।’
-‘রিয়েলি! সেটা শুনতে পারি কি?’ কথাটা বলেই আড়চোখে একবার মেপে নেয় মহুল। ছেলেটা আবার রেগে যাবে না তো? নাহ; রোহনের মুখে এক অদ্ভুত শান্ত সম্মোহনের ছায়া।
–‘শেষ কীর্তি ছিল চুরি। এভাবেই থানা-পুলিশের মুখোমুখি। তখন পেট-পিঠ লেগে যাওয়া, ঠিকমতো খেতে না পাওয়া আট-নয় বছরের রোগা টিংটিংয়ে ছেলে। এক চোর-ডাকাতের দলের খপ্পরে পড়লাম। এ রকমই শীতের শেষ রাত। তারা ঢুকিয়ে দিল সে অঞ্চলের সব চেয়ে রহিস আদমির বাড়ি। এক তলার বাথরুমের জানালা দিয়ে কোনোক্রমে শরীরটাকে বেঁকিয়ে-চুরিয়ে ঢুকে পড়েছিলাম। সদর দরজা খুলে দেওয়া অব্দি আমার কাজ ছিল।’
-‘তার পর?’ মহুলের চোখ বিস্ফারিত।
-‘ধরা পরে গেলাম! আমি এবং আরও তিনজন। লোকজন এসে বিরাট মারধর। ছোট বলে সামান্য রেয়াত করা হয়েছিল আমায়। তবু নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। সম্মিলিত মারধর তো! গায়ের জামা ছিঁড়ে ফর্দাফাই। পুলিশ এল। শীতে কুঁকড়ে বসে আছি আমি। ভোর হয়ে গেছে। বাবার স্কুটারে চেপে স্কুল যাচ্ছিল সে। আমার অবস্থা দেখে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। নিমেষে নিজের স্কুল ইউনিফর্মের সোয়েটার খুলে আমার হাতে দেয়। ঠাণ্ডা হাওয়া এবং কান্নার দমকে ছোট্ট শরীরটা তার থিরথির করে কাঁপছিল। আজ বুঝতে পারি, সমবেত জনগণ এবং পুলিশকে সেদিন ওই বাচ্চা মেয়েটা কতটা অপ্রস্তুত করেছিল। ছোটদের তো স্ট্যাটাস বোধ থাকে না। গঙ্গার ধারে আরও কয়েকজন বাচ্চার সঙ্গে আমিও ছিলাম তার খেলার সঙ্গী। ততক্ষণে ব্যাগ থেকে লাল রঙের টিফিন কৌটো বার করে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছে। আমার জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার, শ্রেষ্ঠ আদর!’
নীল কুয়াশার ভেতর দিয়ে আচমকা আগুনের মতো উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এক চলমান ছবি! তুমুলভাবে কেঁপে ওঠে মহুল! তার ঠোঁট কাঁপে, কিন্তু একটা শব্দও বার হয় না। অদৃশ্য পর্দায় ভেসে ওঠে শৈশব; ছোট্ট মহুল আর ছেড়া জামা পরে কুঁকড়ে বসে থাকা তার এক খেলার সঙ্গী। যার নাক দিয়ে তখন বেরিয়ে আসছে সরু রক্তের ধারা!
এক প্রবল ভূমিকম্পের মধ্যে, হাবুডুবু খায় মহুল! অনেক চেষ্টাতেও বাগ মানে না নোনা জলের প্রবাহ; সব এটিকেট ভাসিয়ে নিয়ে যায় তা! ঠিক তখনি, স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঝকঝকে ছেলেমেয়ে দুটোর পাশে এসে দাঁড়ায় জোগারে ছেলেটা।
-‘স্যার, আপনাদের আর একবার কফি দেব?’
উননের লালচে আগুনের ছায়া কাঁপছে ছেলেমেয়ে দুটোর ঋজু শরীরে।
ওদের শূন্য কাপে... ছেলেটা নিজে থেকেই ধোঁয়া ওঠা গরম কফি ঢেলে দেয়।