ইসরায়েলের গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
শনিবার (৯ আগস্ট) মিসরের আল-আলেমাইনে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেলআত্তির সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এ সময় তিনি বলেন, ইসরায়েল গাজা দখলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে চায় এবং এ পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তুরস্ক ও মিসর গত শুক্রবারই ইসরায়েলের এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তুরস্ক একে ‘গণহত্যামূলক এবং সম্প্রসারণবাদী নীতি’র অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। হাকান ফিদান জানান, মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনকে (ওআইসি) এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি বৈঠকে ডাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের নীতির লক্ষ্য হলো ফিলিস্তিনিদের না খাইয়ে ভূমি ছাড়তে বাধ্য করা এবং গাজায় স্থায়ীভাবে দখল কায়েম করা। এ ধরনের নিষ্ঠুর নীতিকে সমর্থনের কোনো ন্যায্যতা নেই।’
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেলআত্তি বলেন, ‘এটি শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং গোটা অঞ্চলের জন্যই এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি।’ তিনি জানান, গাজা দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তুরস্ক ও মিসর একসঙ্গে রয়েছে।
গতকাল ওআইসি মন্ত্রিপর্যায়ের কমিটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলের গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা একটি ‘বিপজ্জনক ও অগ্রহণযোগ্য উসকানি, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং অবৈধ দখলদারত্বকে স্থায়ী করার প্রয়াস।’ এতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, এই পদক্ষেপ যেকোনো শান্তির সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেবে।
আইসি প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলে, তারা যেন তাদের আইনি ও মানবিক দায়িত্ব পালন করে এবং ইসরায়েলের এই পরিকল্পনা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবিও জানানো হয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, হামাস যদি আত্মসমর্পণ করে, তাহলে যুদ্ধ শেষ হবে। তবে মুসলিম দেশগুলোর মতে, ইসরায়েলের নীতিই এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে মিসর, কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছেন, তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান আসেনি।
গাজা সিটি ছাড়তে নারাজ বাসিন্দারা, বললেন ‘মরলে এখানেই মরব’
ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা গাজা সিটি পুরোপুরি সামরিকভাবে দখলের পরিকল্পনা অনুমোদন করার পর সেখানে থাকা ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এই ভয় সত্ত্বেও অনেকেই গাজা সিটি ছাড়তে রাজি নন। তারা বলছেন, মরলেও এখানেই মরবেন।
ইসরায়েলের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজা সিটিতে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের জোর করে দক্ষিণে সরিয়ে নেওয়া হবে। অথচ এদের অনেকেই ইতোমধ্যে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আহমেদ হিরজ নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমি অন্তত আটবার স্থান বদল করেছি। খোদার কসম, আমি শতবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। এখন আর কোথাও যাব না, এখানেই মরব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনাহার, নির্যাতন আর কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত একটাই- মরলে গাজা সিটিতেই মরব।’
আরেক বাসিন্দা রজব খাদির বলেন, ‘আমি কখনোই দক্ষিণে যাব না, যেখানে মানুষ কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে রাস্তায় থাকে। আমরা পরিবার নিয়ে এখানেই থাকব। ইসরায়েলিরা আমাদের দেহ ও আত্মা ছাড়া আর কিছুই পাবে না।’
মাঘজৌজা সাদা নামের এক নারী (যিনি আগে বেইত হানুনে থাকতেন) বলেন, ‘ইসরায়েলি হামলায় ঘরছাড়া হয়ে গাজা সিটিতে এসেছি। এখন আবার বলছে দক্ষিণে যেতে। কিন্তু কোথাও তো নিরাপদ নয়- না দক্ষিণে, না গাজা সিটিতে, না উত্তরাঞ্চলে। তাহলে আমরা যাব কোথায়? সাগরে ঝাঁপ দেব?’