ইন্দোনেশিয়া প্রথমবারের মতো পশ্চিমা দেশের যুদ্ধবিমানের বাইরে চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটি চীনে তৈরি ৪২টি চেংদু জে-১০সি (Chengdu J-10C) যুদ্ধবিমান ক্রয় করবে বলে গতকাল বুধবার জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যাফ্রি স্যামসুদ্দিন।
রাজধানী জাকার্তায় সংবাদ সম্মেলনে স্যামসুদ্দিন বলেন, “আমরা খুব শিগগিরই চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কিনব। এগুলো জাকার্তার আকাশে উড়বে অচিরেই।” তবে ক্রয়ের বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি।
এটি ইন্দোনেশিয়ার সামরিক আধুনিকায়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফ্রেগা ওয়েনাস গত মাসে প্রথম এই পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনী এখনও চীনা তৈরি এসব জে-১০ যুদ্ধবিমান পর্যালোচনা করছে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এগুলো দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা যথাযথভাবে শক্তিশালী করবে।
অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া বুধবার নিশ্চিত করেছেন যে চুক্তির জন্য ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “সবকিছু প্রস্তুত আছে। তবে আমাকে এখনো নিশ্চিত করতে হবে ঠিক কবে বেইজিং থেকে বিমানগুলো জাকার্তায় পৌঁছাবে।”
প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর প্রশাসন দেশের সামরিক শক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্প আধুনিকায়নে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৯ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে প্রাবোও চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে সফর করেছেন নতুন অস্ত্র ব্যবস্থা, নজরদারি সরঞ্জাম ও সীমান্ত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কেনার লক্ষ্যে।
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বিমানবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের তৈরি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কিছু বিমান পুরনো হয়ে যাওয়ায় সংস্কার বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গত জুনে ঘোষণা দেন যে তার দেশ ৪৮টি ক্যান (KAAN) যুদ্ধবিমান ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করবে। এসব যুদ্ধবিমান তুরস্কে নির্মিত হয়ে ইন্দোনেশিয়ায় পাঠানো হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইন্দোনেশিয়া ফ্রান্সের সঙ্গে ৪২টি ডাসাল্ট রাফাল (Dassault Rafale) যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এসব বিমানের প্রথম চালান ২০২৬ সালের শুরুতে পৌঁছানোর কথা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে ইন্দোনেশিয়া একই সঙ্গে ফ্রান্সের দুটি স্করপিন ইভলভড সাবমেরিন ও ১৩টি থ্যালেস গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রাডার কেনার ঘোষণা দেয়।
ইন্দোনেশিয়া ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক বেনি সুকাদিস বলেন, দেশটি রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হলেও সরকারের উচিত এ ধরনের সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক প্রভাব অবমূল্যায়ন না করা।
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন পশ্চিমা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করার পর চীনের কাছ থেকে বড় আকারের অস্ত্র ক্রয় ইন্দোনেশিয়ার নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে—বিশেষত এমন সময়ে, যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।”
সুকাদিস সতর্ক করে বলেন, “এই পদক্ষেপ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে আঞ্চলিক সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে, যেখানে চীনের প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত।” সূত্র: এপি
মাহফুজ/