সৌদি যুবরাজ সুদান ও ইয়েমেন ইস্যুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘স্পাই শেখ’ বা গোয়েন্দা প্রধানের কাছে একটি অভিযোগপত্র পাঠিয়েছেন। সেই চিঠিতে সুদান ও প্রতিবেশি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিবাদে আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততা নিয়ে সতর্ক করেছে সৌদি আরব।
একাধিক মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তার বরাতে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম মিডল ইস্ট আই জানায়, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তাহনুন বিন জায়েদের কাছে একটি ‘দীর্ঘ’ চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে সুদান ও ইয়েমেনে আমিরাতের কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ জানানো হয়েছে।
কয়েক সপ্তাহ আগে পাঠানো এই চিঠিতে আমিরাতের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের অভিযোগগুলোর একটি বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে যুবরাজের ভাই ও উপদেষ্টা, সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খালিদ বিন সালমানের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে ‘স্পাই শেখ’ ডাকনামে পরিচিত তাহনুনকে বলা হয়েছে যে, প্রতিবেশী দেশটি সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (RSF) সমর্থন দেওয়া চালিয়ে গেলে সৌদি আরব আর সুদানের গৃহযুদ্ধ ‘সহ্য’ করবে না।
এ ছাড়া, চিঠিতে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক হস্তক্ষেপকে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরব গত ডিসেম্বরে দক্ষিণ ইয়েমেনে আমিরাতের বিচ্ছিন্নতাবাদী মিত্রদের ওপর হামলা চালায় এবং এরপর থেকে দেশটিকে ইয়েমেন থেকে পুরোপুরি উচ্ছেদ করার পদক্ষেপ নিয়েছে।
চিঠিতে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সৌদি আরব ইয়েমেনকে তার নিজস্ব প্রভাব বলয় হিসেবে দেখে এবং রিয়াদ তার দক্ষিণ সীমান্তের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ‘দায়িত্ব’ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো আগে প্রকাশ্যে ও গোপনে শোনা গেলেও, বিষয়টিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্তটি উল্লেখযোগ্য।
ওয়াশিংটন চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত মার্কিন ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আই’কে জানিয়েছেন যে, চিঠিতে কোনো স্বাক্ষরের অংশ ছিল না। তবে ওয়াশিংটন মনে করছে এটি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানই পাঠিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের দুই উপসাগরীয় মিত্রের মধ্যকার এই বিবাদ নিয়ে তুলনামূলকভাবে নীরব রয়েছে।
একজন পশ্চিমা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আই’কে বলেন, নেপথ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত রাজি কি না জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দেয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, চিঠিটি ওয়াশিংটনের কথা মাথায় রেখেই লেখা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কারণ এতে আমিরাতের সঙ্গে ‘ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের’ ওপর জোর দিলেও তাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এই ফাটলের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাদের মধ্যে (সৌদি আরব- সংযুক্ত আরব আমিরাত) সত্যিই একটি বিবাদ রয়েছে,’ এবং তিনি আরও যোগ করেন যে তিনি এটি খুব সহজেই মিটিয়ে দিতে পারেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব এটা জেনে অবাক হয়েছে যে আমিরাত মনে করে রিয়াদ ওয়াশিংটনকে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।
মিডল ইস্ট আই প্রথম প্রকাশ করেছিল যে, গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউস সফরের সময় ক্রাউন প্রিন্স সুদানের আরএসএফকে (RSF) সমর্থন করার বিষয়ে আমিরাতের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কাছে লবিং করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেছেন যে সৌদি আরব তাকে এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করতে বলেছে, যদিও তিনি সরাসরি আমিরাতের নাম নেননি।
কিছু বিশ্লেষক ধারণা করছেন, সৌদি আরবের এই লবিংই ছিল ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’, যা গত ডিসেম্বরে ইয়েমেনে বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর বড় ধরনের অভিযান পরিচালনায় আমিরাতকে প্ররোচিত করেছিল।
মধ্যস্থতাকারীগণ তার চিঠিতে যুবরাজ বলেছেন যে, রিয়াদের অনুমোদন ছাড়াই ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (STC) সামরিক সহায়তা দেওয়ার আমিরাতি সিদ্ধান্তকে সৌদি আরব একটি ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা হিসেবে দেখছে।
ডিসেম্বরের শেষের দিকে সৌদি আরব ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে আমিরাতি অস্ত্রের চালানে বোমা হামলা চালায়। এরপর তারা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে এসটিসি’কে উচ্ছেদ করার জন্য বিমান সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করে।
চিঠিতে জানুয়ারির শুরুতে আমিরাতের একটি গোপন অভিযানের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। ওই অভিযানের মাধ্যমে এসটিসি’র সাবেক নেতা আইদারুস আল-জুবেদিকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পর ইয়েমেন থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এই চিঠিটি আমিরাতের সংকট সমাধানকারী হিসেবে তাহনুনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে। তাহনুন হচ্ছেন ‘বানি ফাতিমা’ নামে পরিচিত ছয় ভাইয়ের একজন। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান এবং তার প্রিয় স্ত্রী ফাতিমা বিনতে মুবারক আল-কেতবির সন্তান। এই তালিকায় আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদও রয়েছেন।
চোখের সমস্যার কারণে সবসময় এভিয়েটর সানগ্লাস পরা তাহনুন আবু ধাবির প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সার্বভৌম সম্পদ দেখভাল করেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে তিনি তার ভাইয়ের পক্ষে কূটনৈতিক দূতের কাজও করেন।
তাহনুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এমন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন ও আরব কর্মকর্তারা মিডল ইস্ট আই’কে বলেন, তিনি তার ভাইয়ের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৭ সালে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধের পর আমিরাত ও কাতারের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে তাহনুনই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে এই চিঠিটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই বিরোধ মেটানো এখন উভয় পক্ষের জন্যই একটি পারিবারিক বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে।
মাহফুজ/