ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ ধীরে ধীরে এতটাই ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়ছে যে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, দুটি সংঘাত এক ধরনের ‘মিশ্র যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হচ্ছে।
এই দুই যুদ্ধ একে অপরকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে, এই সংযোগ ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত এক বিস্তৃত অস্থিরতার বলয় তৈরি করছে, যেখানে আরও বেশি দেশ জড়িয়ে পড়ছে।
ইউক্রেনের জন্য এই সংযোগ নতুন নয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সাত মাস পর থেকেই রাশিয়া ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন ব্যবহার শুরু করে। তবে নতুন বিষয় হলো, এবার মস্কো পাল্টা সহায়তা দিচ্ছে তেহরানকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার পর গোয়েন্দা তথ্য, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে।
এই সংযোগ আরও দৃঢ় হয়েছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফরের মাধ্যমে। তিনি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের সঙ্গে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে চুক্তি করেছেন এবং জর্ডানের সঙ্গে নিরাপত্তা আলোচনা শুরু করেছেন।
দুটি যুদ্ধ জ্বালানি বাজারের মাধ্যমেও একত্রিত হয়েছে। ইরানে হামলা ও তেহরানের প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়, যা রাশিয়ার জন্য বড় অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে।
এই দাম বৃদ্ধির ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। এমন এক সময় এটি হয়েছে, যখন তাদের ওপর চাপ বাড়ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করেছে, যাতে বাজার স্থিতিশীল রাখা যায়। এর ফলে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো রাশিয়ার তেল কিনতে আগ্রহী হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা বাড়িয়েছে। এক হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার প্রায় ৪০ শতাংশ তেল রপ্তানি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এখন এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে একটি যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সরাসরি অন্য যুদ্ধকে প্রভাবিত করছে। ইউরোপীয় দেশগুলো এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ তারা চায় না মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে তারা আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ুক।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতির প্রধান কাজা কাল্লাস বলেন, ‘এই যুদ্ধগুলো এখন স্পষ্টভাবেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। যদি যুক্তরাষ্ট্র চায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামুক, তাহলে রাশিয়ার ওপরও চাপ দিতে হবে যাতে তারা ইরানকে সাহায্য করতে না পারে।’
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই সংযোগ স্বীকার করতে অনিচ্ছুক। বরং তারা কিছু ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। যদিও ইরানকে রাশিয়া সহায়তা করছে এমন প্রমাণ বাড়ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, রাশিয়ার ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে প্রভাব ফেলছে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে এই দুই যুদ্ধকে আলাদা রাখতে চাইছে।
এমনকি অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের ওপর বেশি চাপ দিচ্ছে, বিশেষ করে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা কমানোর জন্য। কারণ এতে তেলের দাম বাড়ছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে ইউরোপীয় মিত্ররা সাহায্য না করলে ট্রাম্প ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছেন।
জেলেনস্কি জানান, তার মিত্ররা তাকে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা কমাতে বলেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়া যতদিন ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালাবে, ততদিন ইউক্রেনও পাল্টা হামলা চালাবে।
এদিকে ইরানে রাশিয়ার বাড়তি সম্পৃক্ততা ট্রাম্পের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ধাক্কা খাওয়ার পর রাশিয়া এখন ইরানকে সহায়তা দিয়ে আবার বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ দেখছে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে ইরানের হামলার আগে রাশিয়া স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহ করেছিল, যাতে মার্কিন বাহিনীর ক্ষতি হয়। রাশিয়া নাকি ছদ্মবেশে মানবিক সহায়তার গাড়ির মাধ্যমে ড্রোনও পাঠাচ্ছে, যার মধ্যে ‘গেরান’ ড্রোন থাকতে পারে। এই ড্রোনগুলো ইরানের নকশা করা, রাশিয়ায় তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেন নিজেকে শুধু সাহায্যগ্রহণকারী দেশ হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তি সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারা এখন ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, সফটওয়্যার এমনকি সামুদ্রিক ড্রোনও সরবরাহ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের সেই মন্তব্যের জবাব হিসেবে, যেখানে তিনি বলেছিলেন ইউক্রেনের হাতে ‘কোনো কার্ড নেই’।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ওরিসিয়া লুটসেভিচ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা সম্পর্ক ইউক্রেনের জন্য বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল কিছু বাধার মুখে পড়েছে।
সবমিলিয়ে এই আন্তসংযুক্ত যুদ্ধগুলো এখনো সরাসরি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রগুলোকে এ বিষয়টি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করছে এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক ফিওনা হিল মনে করেন, আধুনিক যুদ্ধের ধরন, যেমন সাইবার, হাইব্রিড ও গ্রে-জোন সংঘাত, বিবেচনায় নিলে, এক ধরনের বৈশ্বিক সংঘাত অনেক দিন ধরেই চলছিল। আর ইরান যুদ্ধ সেটিকে আরও তীব্র করেছে।
তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা পুরো বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, তেল ও সারসংকটের মতো বিষয়গুলো আরও অনেক দেশকে এই সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
সবশেষে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মানুষ বুঝতেই পারছে না। তারা ধীরে ধীরে একটি বড় সংঘাতের দিকে হাঁটছে।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান