প্রায় দুই মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে হরমুজ প্রণালী খুলে দিলেও কাটেনি বিশ্ব উত্তেজনা। ইরানের পদক্ষেপের বিপরীতে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে চীনের উপস্থিতি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির মেয়াদ ও ইরানের পুনর্গঠনে চীনের ভূমিকাই এখন মূল নির্ধারকের ভূমিকা পালন করছে। এই দুই শক্তির সিদ্ধান্ত একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তবে দীর্ঘমেয়াদি নৌ-সংকট তৈরি হলে তা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের কাঠামো পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
নিকট ভবিষ্যতে একটি অলিখিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অবকাঠামো দুর্বল হলেও শাসনব্যবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে প্রতিবেশীদের জন্য ইরান এখনো হুমকি। চীন বিষয়টি দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছে। তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করলেও বেইজিং সরাসরি কোনো সামরিক জোটে যাচ্ছে না।
হরমুজ প্রণালীর সংকট নিয়ন্ত্রণে থাকলে বর্তমান ব্যবস্থাটি টিকে থাকবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা অংশীদারত্ব আরও বাড়বে। জ্বালানিসংকট তৈরি হলেও তা হবে সীমিত। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামান্য ক্ষতি হতে পারে। তবে চীন পরোক্ষভাবে লাভবান হবে। কারণ তাদের কৌশলগত অংশীদার ইরান বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে টিকে গেছে।
হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেবে। ইরান জাহাজ চলাচল থেকে মাশুল আদায় বা মাইন বসিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তীব্র জ্বালানিসংকটে পড়বে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা নিয়ে দেশ দুটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হবে। ইউরোপের গ্যাসের বাজারেও চাপ বাড়বে। দ্রুত সমাধান না হলে পশ্চিমা জোটের সংহতি ভেঙে পড়বে। চীনের প্রভাব ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে।
বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে চীন মনে করতে পারে, ওয়াশিংটন বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে অক্ষম। এমন অবস্থায় ইরানের প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থন কেবল অর্থনৈতিক সুবিধায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। চীন তেহরানকে রসদ, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে সাহায্য করবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাহিনী চাপে পড়বে। চীন-রাশিয়া-ইরান জোট আরও শক্তিশালী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় হওয়া ক্ষতি কাটিয়ে ইরান দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।
ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল সীমিত রাখে, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো তখন জোটের চেয়ে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। এতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তাইপে থেকে ভিলনিয়াস- সব পক্ষের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ফলে বড় ঝুঁকি এড়াতে মিত্ররা পিছু হটলে মার্কিন জোটগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বর্তমান যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে বিরতি আসতে পারে। আলোচনা ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন অমীমাংসিত ফলাফল মেনে নেবে অথবা চূড়ান্ত অভিযানে নামবে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক অভিযানের পথ বেছে নিতে পারে। লক্ষ্য হলো ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্ক ধ্বংস, পারমাণবিক সরঞ্জাম জব্দ ও উপকূল শত্রুমুক্ত করে শাসনব্যবস্থার পতন বা আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা।
চীন নিষ্ক্রিয় থাকলে এবং সামরিক অভিযানে নৌপথ উন্মুক্ত হলে ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে যাবে। এতে বেইজিং তার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারকে হারাবে। ওয়াশিংটনের আধিপত্য পুনরুদ্ধার হবে। এতে আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম হবে। তবে তাইওয়ানের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান অস্ত্রগুলো প্রতিস্থাপন করতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
চূড়ান্ত অভিযানের মাধ্যমে হুমকি মোকাবিলার জন্য সময়ের প্রয়োজন। যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালির নৌপথ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে অভিযানের লক্ষ্য সফল হলে মিত্ররা সেই ব্যয় মেনে নেবে। সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও চীন দীর্ঘ মেয়াদে তার সামরিক আধুনিকীকরণ দ্রুত করবে। যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ী হলেও অন্যান্য রণাঙ্গনে তাদের যুদ্ধের আয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চতুর্থ পরিস্থিতিটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত সামরিক পদক্ষেপ নিলে চীন নিষ্ক্রিয় না থেকে পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। বেইজিংয়ের তখন ইরানকে উন্নত গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি ও রসদ দিয়ে সাহায্য করার সম্ভাবনা আছে। সঙ্গে তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরেও চাপ বাড়াতে পারে চীন। সেটা ঘটলে ওয়াশিংটন স্নায়ুযুদ্ধ যুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে বড় দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে নৌপথ সচল করতে পারলে চীনের হস্তক্ষেপ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে এতে দুই দেশের কৌশলগত প্রতিযোগিতা প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেবে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক তখন নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছেড়ে স্নায়ুযুদ্ধের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।
চীন ইরানকে সমর্থন দেওয়ায় হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। ইউক্রেন ও তাইওয়ানের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তৃতীয় ফ্রন্ট তৈরি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট বিশ্বজুড়ে মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা নিয়ে দুই শক্তির সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। মস্কো, তেহরান, বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সহযোগিতা তখন একটি শক্তিশালী জোটে রূপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিজয় ঘটলেও তা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক পরিবেশে দেশটি একা হয়ে পড়বে।
হরমুজ প্রণালীর সংকটের স্থায়িত্বই বলে দেবে এই সংঘাত আঞ্চলিক থাকবে নাকি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এই নৌপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পমেয়াদি সংকট সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বাজার ও আন্তর্জাতিক জোটগুলোকে এমনভাবে বদলে দেবে, যার প্রভাব সামরিক ফলাফলের চেয়েও বেশি হবে।
বেইজিং এখন সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্বল ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে তারা আপাতত সন্তুষ্ট। তবে মার্কিন বাহিনী বেশি দূর এগিয়েছে মনে করলে তারা নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র জোটের সংহতি নষ্ট করাই প্রতিপক্ষদের প্রধান লক্ষ্য।
নিকট ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথ হলো একটি অস্বস্তিকর ও অমীমাংসিত পরিস্থিতির মধ্যে থাকা। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ থাকবে সীমিত। চীন নিষ্ক্রিয় থেকে কেবল সুযোগ খুঁজবে। হরমুজ প্রণালি কাগজে-কলমে উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে থাকবে বিতর্কিত। কোনো পক্ষই তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক অবস্থান নিয়ে আবার বা বারবার সংঘাত বেধে যেতে পারে।
ইতিহাস বলে, বড় সংঘাতের এমন অমীমাংসিত সমাপ্তি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আলোচনা ব্যর্থ হলে এবং যুদ্ধ বজায় রাখার অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়লে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে ট্রাম্পকে তার সামরিক সাফল্যকে সঠিক রাজনৈতিক কৌশলে রূপ দিতে হবে। এই কাজটি হামলা চালানোর চেয়েও কঠিন। রণক্ষেত্রের লড়াই আপাতত থামলেও বড় শক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ থামেনি। এই মুহূর্তটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আটলান্টিক কাউন্সিলের নিবন্ধ অবলম্বনে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন এম আর লিটন