ইরানের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় নিজস্ব প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে ইউক্রেনের দ্বারস্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন বিমানঘাঁটি ‘প্রিন্স সুলতান এয়ার বেস’-এর সুরক্ষায় সম্প্রতি ইউক্রেনীয় কাউন্টার ড্রোন প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সূত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
সূত্রমতে, গত কয়েক সপ্তাহে প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে ইউক্রেনীয় কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল প্ল্যাটফর্ম ‘স্কাই ম্যাপ’ মোতায়েন করা হয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধে ড্রোন ও ড্রোনবিধ্বংসী প্রযুক্তিতে ইউক্রেন যে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে, এই পদক্ষেপ তারই স্বীকৃতি। মূলত ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন শনাক্ত এবং তা ধ্বংস করতে ‘ইন্টারসেপ্টর ড্রোন’ পরিচালনার কাজে এই সফটওয়্যারটি ব্যবহৃত হয়। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তারা এরই মধ্যে সৌদি আরবে পৌঁছে মার্কিন সেনাদের এই প্রযুক্তি পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
ইরান থেকে মাত্র ৬৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মার্কিন ঘাঁটিটি সাম্প্রতিক যুদ্ধের শুরু থেকেই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে রয়েছে। গত ২৭ মার্চ এক হামলায় বিমানবাহিনীর একটি মূল্যবান ‘ই-থ্রি সেন্টি’ রাডার বিমান ধ্বংস হয়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাড-এর রাডার সিস্টেমও হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মার্কিন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার যে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ছিল, এ ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো টিমোথি ওয়ালটন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ফাঁকগুলো দীর্ঘদিনের পরিচিত সমস্যা। কিন্তু এটি ঠিকভাবে সমাধান করা হয়নি।’
মজার ব্যাপার হলো, গত মার্চ মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতিরক্ষা সহায়তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তখন ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ড্রোন প্রতিরক্ষায় আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।’ তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। যদিও হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ইউক্রেনীয় কোম্পানি ‘স্কাই ফোর্টেস’ এবং জেলেনস্কির কার্যালয়ও মুখ খোলেনি।
স্কাই ম্যাপ মূলত একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড, যা রাডার ও সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ম্যাপ ও ভিডিও ফিডের মাধ্যমে হুমকি শনাক্ত করে। ২০২২ সালে ইউক্রেনের সামরিক উদ্ভাবন ইউনিট ‘ব্রেভ-ওয়ান’-এর সহায়তায় এটি তৈরি হয়। ইউক্রেনজুড়ে প্রায় ১০ হাজার শব্দ তরঙ্গ শনাক্তকারী সেন্সর ব্যবহার করে তারা রাশিয়ার ড্রোন হামলা রুখে দিচ্ছে।
প্রিন্স সুলতান ঘাঁটিতে বর্তমানে ইউক্রেনীয় প্রযুক্তির পাশাপাশি গুগল-এর সাবেক সিইও এরিক শ্মিডট-এর বিনিয়োগ করা ‘মেরোপস’ ইন্টারসেপ্টর ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের শুরুতে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটিও দেখা দিচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে একটি পরীক্ষার সময় একটি মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ড্রোন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘাঁটির একটি টয়লেট ব্লকে আছড়ে পড়ে।
পেন্টাগনের কাউন্টার ড্রোন ইউনিট জেআইএটিএফ-৪০১-এর মুখপাত্র অ্যাডাম শের জানিয়েছেন, ড্রোন হামলা রুখতে তারা ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এমন কোনো জাদুকরী অস্ত্র নেই, যা দিয়ে শতভাগ ড্রোন হামলা থামানো সম্ভব।’ বর্তমানে এই ঘাঁটিতে নর্থরপ গ্রুমম্যানের ‘ফ্যাড’ সিস্টেম এবং আরটিএক্স কোম্পানির ‘কোয়োট’ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ইউক্রেনীয় ‘স্কাই ম্যাপ’ এই পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স