ভুয়া স্বাক্ষর ও স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলার দায় থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান ও তার মা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শাহনাজ রহমানসহ ছয়জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, অভিযোগ গঠনের মতো উপাদান না থাকায় মামলার দায় থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হলো।
অব্যাহতি পাওয়া অন্যরা হলেন– ট্রান্সকম গ্রুপের পরিচালক মো. কামরুল হাসান, মো. মোসাদ্দেক, আবু ইউসুফ মো. সিদ্দিক ও সামসুজ্জামান পাটোয়ারী।
আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার এ আদেশে সংক্ষুব্ধ বাদীপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মনির হোসেন বলেন, এ আদেশ আইন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। এ সময় বাদী আদালতে হাজির ছিলেন না। চার্জ শুনানির জন্য সময় চেয়ে আবেদন করা হয়, যা নামঞ্জুর করেছেন বিচারক।
তিনি বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে চার্জশিট দাখিল করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।’
এ মামলা থেকে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে দায়রা আদালতে রিভিশন আবেদন করবেন বলে জানান তিনি।
এদিন মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠনের শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। জামিনে থাকা সব আসামি শুনানিতে হাজির ছিলেন।
শুনানির শুরুতে বাদীর পক্ষে করা সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে শুনানির জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করার আবেদন করেন অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার।
এ ছাড়া মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বলেন, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র ও ১৬১ ধারার জবানবন্দিতে জাল-জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিচারকালে সাক্ষ্য প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হবে।
অন্যদিকে আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট মহসিন মিয়া ও খোরশেদ আলম শুনানি করেন।
শুনানিতে তারা বলেন, ‘মামলার বাদী ডিড অব সেটেলমেন্টে সব সম্পত্তি বুঝে নিয়েছেন। দুই বছর আগে সম্পত্তি বুঝে নিয়ে তার ইনকাম ট্যাক্স ফাইলে এই সম্পত্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন। দুই বছর পরে ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানের ব্যবসার সুনাম নষ্ট করার জন্য হয়রানিমূলক এ মামলা করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের মতো কোনো উপাদান নেই। মামলার দায় থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হোক।’
ভুয়া স্বাক্ষর করে স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে মর্মে উল্লেখ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান গত ১১ জানুয়ারি আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। চার্জশিটে ট্রান্সকম সিমিন রহমানসহ ছয় জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকায় বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। সেই মিটিংয়ের এজেন্ডা হিসেবে ছিল, পূর্বের মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদন; ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মিটিংয়ে অংশগ্রহণ ও ইলেকট্রনিক সিগনেচারের অনুমোদন; সিমিন রহমানের বাবা লতিফুর রহমান কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে অনুমোদন। এই মিটিংয়ে হাজিরা শিটে লতিফুর রহমানকে ছুটিতে দেখানো হয়। হাজিরা শিটে সিমিন রহমানের ভাই আরশাদ ওয়ালিউর রহমানের স্বাক্ষর থাকলেও মিটিংয়ের সময় তিনি কুমিল্লায় অবস্থান করেন। এই বোর্ড মিটিংয়ে তৃতীয় এজেন্ডার মাধ্যমে লতিফুর রহমানের ২৩ হাজার ৬০০ শেয়ারের মধ্যে তার মেয়ে সিমিন রহমানকে ১৪ হাজার ১৬০টি, ছেলে আরশাদ ওয়ালিউর রহমান ও ছোট মেয়ে শাযরেহ হককে ৪ হাজার ৭২০টি শেয়ারসহ সর্বমোট ২৩ হাজার ৬০০টি শেয়ার হস্তান্তর করা হয়।
এই মিটিংয়ের বিষয়ে শাযরেহ হক দাবি করেন, এ ধরনের বোর্ড মিটিং ২০২০ সালের ১৩ জুন অনুষ্ঠিত হয়নি। তদন্তকালে কোম্পানির বর্তমান পরিচালককে ওই তারিখের বোর্ড মিটিং ও রেগুলেশনের কাগজপত্র উপস্থাপনের জন্য বলা হলে আসামিপক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তদন্তে বোর্ড মিটিংয়ের আগে কোনো ই-মেইল অথবা ডাকযোগে কোনো নোটিশ বা চিঠির কপি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আরজেএসসিতে (যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর) জমা করা শেয়ার হস্তান্তরে জালিয়াতির আশ্রয় নেন সিমিন রহমান।
চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ১৩ জুন ট্রান্সকম লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র আরজেএসসিতে জমা দেওয়া হয়। ওই বছরের ১৭ আগস্ট শেয়ার হস্তান্তর হলেও আরজেএসসি নিয়ম অনুযায়ী শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ না করে বিলম্বে একই বছরের ২ সেপ্টেম্বর শেয়ার হস্তান্তরের ফি পরিশোধ করা হয়েছে। এই শেয়ার হস্তান্তর জমা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা কোনো পক্ষই আরজেএসসিতে উপস্থিত ছিলেন না। শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে শেয়ার গ্রহীতা অর্থাৎ আসামিদের পক্ষে শুধু অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু নিয়ম হলো, শেয়ার হস্তান্তরের সময় দাতা ও গ্রহীতা উভয় পক্ষকে সশরীরে উপস্থিত থেকে আরজেএসসির প্রতিনিধির সম্মুখে উভয় পক্ষকে স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি, যা ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৩৮ ধারার লঙ্ঘন।
এ ছাড়া ২০২০ সালে ভাই-বোনের ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করে বেশির ভাগ শেয়ার নিজের নামে নেওয়ার জন্য সিমিন গ্রুপ অব কোম্পানির নথিপত্র ও পারিবারিক ডিড অব সেটেলমেন্ট তৈরি করেন। এ জন্য সিমিন রহমান দুটি ভুয়া স্ট্যাম্প এফিডেভিট ব্যবহার করে সেখানে ছোট বোন শাযরেহ হকসহ বাবা, ভাই ও অন্যদের স্ক্যান করা স্বাক্ষর ব্যবহার করে ট্রান্সকমের বেশির ভাগ শেয়ার ট্রান্সফারের দলিল তৈরি করেন এবং এগুলো আরজেএসসিতে দাখিল করেন। শাযরেহ হকের নামে আরজেএসসিতে সিমিনের করা এফিডেভিটের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ২০২৩ সালে সৃজন করা বলে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে দেওয়া ডাক বিভাগ ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের অফিসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চার্জশিটে আরও বলা হয়, জাল সন্দেহ হওয়ায় দুটি স্ট্যাম্পের সত্যতা নিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি প্রতিবেদন চান আদালত। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, যে ভেন্ডার থেকে এই স্ট্যাম্প দুটি সরবরাহের তথ্য রয়েছে, ওই ভেন্ডারের লাইসেন্স ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাতিল করা হয়। তিনি ২০২৩ সালে অসদুপায়ে স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে আসামিপক্ষকে ২০২০ সালের ৩ মার্চ নিজ স্বাক্ষরে সরবরাহ করেন।
প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভাই-বোনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে সিমিন রহমানের বোন শাযরেহ হক বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গুলশান থানায় এ মামলাটি করেন।