ভোটের মাঠে ভোটাধিকার হরণের নানা ছলচাতুরী ছিল। তবু তারা মাঠ ছাড়েননি। নির্বাচনি খেলায় একাধিকবার জয়ও পেয়েছেন। তাদের হারাতে সে সময়কার শাসক দল-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রযন্ত্রকেও নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকেই দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তারা। ক্রিকেটীয় পরিভাষায় বললে- ‘নট আউট’ হয়েই যেন ভোটের মাঠ ছেড়েছেন।
আওয়ামী লীগ জমানায় সিলেট বিভাগে ভোটের মাঠে বিএনপির এমন রাজনীতিবিদ হাতে গোনা। আগামী জাতীয় নির্বাচনি প্রচারে এমন তিনজনকে পাওয়া যায়, যারা বিগত সরকার নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে একাধিকবার অংশ নিয়ে একবারও হারেননি। ভোটের মাঠে বিএনপির এই ‘থ্রি নট আউট’ বা ত্রয়ী অপরাজিত রাজনীতিবিদের একজন হচ্ছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের টানা দুবার নির্বাচিত সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। দ্বিতীয় জন সুনামগঞ্জের প্রথম উপজেলা পরিষদ থেকে টানা চারবার নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন। তৃতীয় জন তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিখ্যাত রাজনীতিবিদ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের টানা দুবারের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাকিম চৌধুরী।
স্থানীয় নির্বাচন জয় করে তারা এবার আলোচনায় জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থিতায়। বিএনপির সেই প্রতিকূল রাজনীতির ভোটের মাঠে অপরাজিত তথা ‘নট আউট’ নৈপুণ্যে তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তাদের ঘিরে দলের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে কর্মী-সমর্থকদের শক্তিশালী বলয়। আওয়ামী লীগ শাসনের সময়ে ভোটবঞ্চনা ও মাঠে মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা এই ত্রয়ীকে পরিণত করেছে এক রাজনৈতিক প্রতীকে।
স্থানীয় থেকে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থিতার তত্ত্বতালাশে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে সর্বশেষ অংশগ্রহণমূলক সংসদ নির্বাচন হয় ২০১৮ সালে। সেই নির্বাচনে সিলেট বিভাগে বিএনপি থেকে হবিগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন বর্তমানে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী। মিজান চৌধুরী ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। আর জি কে গউছ ছিলেন হবিগঞ্জ পৌরসভার তিনবারের মেয়র। তৃতীয় দফায় ২০১৫ সালে কারাগারে থেকে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন গউছ। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে তিনি পদত্যাগ করে সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছিলেন। ‘রাতের ভোটের’ ক্যারিশমায় দুজনের জয়রথ থেমে যাওয়ায় তাদের নট আউট ধারা আর বজায় থাকেনি।
ওয়ার্ড কমিশনার থেকে সিটি মেয়র আরিফ
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট অঞ্চলে ভোটের রাজনীতির একটি প্রভাবশালী নাম। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব থাকায় আলোচিত ছিলেন। সিলেট পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সিসিক নির্বাচনে ওয়ার্ড কমিশনার (কাউন্সিলর) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিজয়ী হন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন সরকার এলে তার প্রভাবে চিড় ধরে। গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করে ফের আলোচিত হন। ২০১৩ সালে নাগরিক কমিটির প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রথম প্রার্থী হন।
একটানা ১৮ বছর নির্বাচিত আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমেদ কামরানকে হারিয়ে বিজয়ী হন। এরপর ২০১৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে দ্বিতীয়বার কামরানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মেয়র নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী ও জামায়াতের প্রার্থী টপকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। ২০২৩ সালে তৃতীয়বার মেয়র পদে লড়তে গিয়ে ভোটের রাজনীতির নানা নাটকীয়তার মুখে পড়েন আরিফুল হক। দল কেন্দ্রীয়ভাবে ভোটে না দাঁড়াতে বললে স্থানীয় রাজনীতির কারণে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহারের আগের দিন পর্যন্ত প্রার্থিতা জিইয়ে রাখেন। এরপর দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে ভোট থেকে সরে দাঁড়ান।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে সিসিকের ভোটে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে মেয়র প্রার্থী করেছিল আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার দাপটে ষোলোআনা প্রয়োগের সেই ভোটে লড়লেও আরিফ বিজয়ী হতেন। জয়রথ থেকে ফিরে দলীয় সিদ্ধান্ত মানার পুরস্কার হিসেবে দল তাকে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পদে আসীন করে। এর আগে নেতৃত্ব দিয়েছেন জেলা ও মহানগর বিএনপির।
আরিফুল হক তার ভোটের রাজনীতির ‘নট আউট’ কৃতিত্ব পুরোটা ভোটারদের উৎসর্গ করেছেন বলে জানান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি তো রাজনৈতিকভাবে প্রায় মৃত হয়ে গিয়েছিলাম। ভোটাররা আমাকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করে জীবিত করেছেন। এ জন্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সিলেট নগরবাসীর সেবায় কাটিয়ে দিতে চাই।’
প্রার্থিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দলের সর্বোচ্চ জায়গায় বলে এসেছি যে, আমি নগরীর রাজনীতি করেছি। এ জন্য সিলেট-১ (মহানগর-সদর) আসন আমার পছন্দ। বাকিটা দলের ইচ্ছে।’
‘ভোটের রাজা’ জাকেরীন
বিএনপি নেতা দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন মরমী কবি হাসন রাজার প্রপৌত্র। পারিবারিক খ্যাতিতে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ভোটের রাজনীতিতে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পৌরসভা থেকে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে একবারও হারেননি। এ জন্য তাকে ‘ভোটের রাজা’ বলা হয়।
ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা পদ ছেড়ে ১৯৮৪ সালে ভোটের রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে জাকেরীনের। সেই থেকে তার জয়রথ শুরু। সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আলফাত উদ্দিন আহমদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হয়েছিলেন। এক বছর পর পৌর চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেশে প্রথম অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। ১৯৮৫ সালের সেই ভোটের মাঠে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক মন্ত্রী ও পৌর চেয়ারম্যান মেজর (অব.) ইকবাল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতে যান।
১৯৯০ সালে আওয়ামী লীগের ভোটের রাজনীতির নেতাখ্যাত প্রয়াত মনোয়ার বখত নেককে হারিয়ে দ্বিতীয় দফা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আবার ফিরলে প্রার্থী হন এবং ২০০৯ তৃতীয়বার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হন। এর পর ২০১৪ সালে চতুর্থবার। পঞ্চমবার ২০১৯ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত হওয়ায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। জয়নুল জাকেরীনের রাজনৈতিক জীবন বিএনপি থেকে শুরু। সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি পদে ছিলেন। ৫ আগস্টের পর পুনর্গঠিত জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এখন।
দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন বলেন, ‘শহর থেকে গ্রামে ভোটের মাঠে আমার প্রতি মানুষের আস্থার মূল কারণ হচ্ছে দলীয় আদর্শে অবিচল থাকা। আমি নানা রকম প্রলোভনেও দল ছাড়িনি। একটানা জয়লাভের সর্বশেষ পর্যায়ে এমনও বলা হয়েছিল যে, এমপি পদ ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আমি সেই প্রলোভনে পা দিইনি।’
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দলের বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে ফজুলল হক আসপিয়ার (প্রয়াত) সম্মানে সরে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই বিষয়টি নিশ্চয় এবার দল বিবেচনা করবে।’
ইউপি চেয়ারম্যান থেকে উপজেলায় হাকিম
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা তখন থানা। যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাজনীতিতে সক্রিয় হন আবদুল হাকিম চৌধুরী। ভোটের রাজনীতি তার প্রথমবার হেরে শুরু হয়েছিল। এরপর আর তাকে হারতে হয়নি। নন্দিরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ মেয়াদ পর্যন্ত। এক দশক বিরতি দিয়ে ২০০৯ সালে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। ভোটের মাঠে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম, সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া হেলাল, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার লুৎফুর রহমান লেবু ও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমদ। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় ১৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন হাকিম। ২০১৪ দ্বিতীয়বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ২০১৯ সালে তৃতীয় দফায় দলীয় সিদ্ধান্তে আর নির্বাচন করেননি। বর্তমানে জেলা বিএনপির উপদেষ্টা পদে আছেন। এর আগে গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক, জেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
শহুরে রাজনীতি এড়িয়ে চলা আবদুল হাকিম চৌধুরী বলেন, ‘আমি গ্রামের মানুষ। অধিকাংশ সময় গ্রামে থাকি। দল যদি গ্রামবান্ধব প্রার্থী বিবেচনায় নেয়, তাহলে আমার মতো দ্বিতীয় কাউকে পাবে না।’
তিনটি উপজেলা নিয়ে সিলেট-৪ আসনের ভোটার সংখ্যা তুলে ধরে হাকিম বলেন, ‘গোয়াইনঘাটে ১৩টি ইউনিয়ন ও ২ লাখ ৪২ হাজার ভোটার। আর বাকি দুই উপজেলা জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জে ১২টি ইউনিয়ন ও ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৮৭ হাজার। এ অবস্থায় দুই উপজেলার সমান ভোটার ও ইউনিয়ন পড়েছে এক গোয়াইনঘাট উপজেলায়। সুতরাং এক উপজেলা জয় কিন্তু বাকি দুই উপজেলার সমান।’