কোরবানি, মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মহিমান্বিত ইবাদত। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অসাধারণ মাধ্যম। জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে এই ইবাদত সম্পন্ন করা হয়। তবে এই ইবাদত পালনের সময়কাল নিয়ে অনেকের মনেই কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, বিশেষ করে রাতের বেলায় কোরবানি করার বৈধতা প্রসঙ্গে। ইসলামি শরিয়ত এই বিষয়ে কী নির্দেশনা দেয়, তা পরিষ্কারভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।
কোরবানির সময়কাল
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, কোরবানির পশু জবাই করার নির্দিষ্ট সময়কাল হলো জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সকাল থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। অর্থাৎ, এই তিন দিনের মধ্যে কোরবানি সম্পন্ন করতে হবে। তবে, যারা জুমার নামাজ এবং ঈদের নামাজ আদায় করেন, তাদের জন্য ঈদের নামাজের আগে কোরবানি করা জায়েজ নয়। এমনকি যদি কোনো কারণে (যেমন: বৃষ্টিবাদল) ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত না হয়, সেক্ষেত্রেও ঈদের নামাজের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই কোরবানি করা যাবে।
হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রথম দিন অর্থাৎ ১০ জিলহজ কোরবানি করা সর্বোত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন এবং তৃতীয় দিন। অর্থাৎ, দিনের হিসেবে যত আগে কোরবানি করা যায়, ততই ভালো।
রাতে কোরবানি করা জায়েজ নাকি অনুত্তম?
সাধারণভাবে দিনের বেলায় কোরবানি করাকেই উৎসাহিত করা হয়। তবে, রাতের বেলায় কোরবানি করা কি সম্পূর্ণরূপে নিষেধ? এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই ঘুরপাক খায়। ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী, জিলহজের ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কোরবানি করা জায়েজ। অর্থাৎ, এই দুই রাতের বেলাতেও কোরবানি করা যাবে। তবে, ১২ তারিখ দিবাগত রাতে এবং ঈদের আগের রাতে কোরবানি করা যাবে না। কারণ ওই সময়গুলো কোরবানির নির্ধারিত সময়ের বাইরে।
ইসলামী ফিকহের গ্রন্থসমূহে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়। ফতোয়ায়ে খানিয়া, আদ্দুররুল মুখতার, ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া এবং আহসানুল ফতোয়ার মতো প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোতে উল্লেখ আছে যে, ১০ ও ১১ তারিখ রাতে কোরবানি করতে কোনো নিষেধ নেই।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, আলোস্বল্পতার কারণে রাতে জবাইয়ে ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই আশঙ্কার কারণেই রাতে কোরবানি করাকে অনুত্তম বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কাজটি বৈধ হলেও, দিনের বেলায় করাকে বেশি পছন্দনীয়। এর মূল কারণ হলো, পর্যাপ্ত আলো না থাকলে জবাই প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন না হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যা পশুর কষ্ট এবং জবাইয়ের উদ্দেশ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
পর্যাপ্ত আলো থাকলে রাতে কোরবানি কোনো অসুবিধা নেই
যদি রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর সুব্যবস্থা থাকে, তাহলে জবাই প্রক্রিয়ার ত্রুটির আশঙ্কা থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে রাতে কোরবানি করতে কোনো অসুবিধা নেই। আধুনিক যুগে বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকায়, রাতের বেলায়ও আলোস্বল্পতার সমস্যা অনেকটাই দূর করা সম্ভব। তাই, যারা দিনের বেলায় কোরবানি করার সুযোগ পান না, তারা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করে জিলহজের ১০ ও ১১ তারিখের রাতগুলোতে কোরবানি সম্পন্ন করতে পারবেন।
কোরবানি একটি অত্যন্ত পবিত্র ইবাদত। প্রতিটি মুসলিমের উচিত, শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী এবং সর্বোত্তম উপায়ে এই ইবাদত পালন করা। সময়, স্থান এবং পরিস্থিতির সাপেক্ষে শরিয়তের বিধানগুলো সঠিকভাবে জেনে আমল করলে কোরবানি আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে। ইনশাআল্লাহ।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক