ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও নির্বাচনের খরা কাটল মাসুদুজ্জামানের শান্তি নিদ্রা আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ পানির বোতল যে বই কেউ ছাপতে চায়নি সেই বইয়ের বুকার জয় ময়মনসিংহ মেডিকেলে হাম উপসর্গে ভর্তি আরও ১৯ শিশু বেড়েছে মুরগি, কাঁচা মরিচ-কাঁচা পেঁপের দাম বাতাসে যেন আগুনের হলকা, কষ্টে প্রাণিকুল তিন ক্যাটাগরিতে রিটেইল এশিয়া অ্যাওয়ার্ডস পেল এপেক্স ফুটওয়্যার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবারও যাত্রীবাহী বাস পড়ল পদ্মা নদীতে চুয়াডাঙ্গায় পুত্রবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে শ্বশুর গ্রেপ্তার খুলনায় হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড় গোপালগঞ্জে দুই বাসের সংঘর্ষ, নিহত ২ ৬ ঘণ্টা পরে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক কর্মস্থলে গরমে হাঁসফাঁস ভ্যাট রিটার্ন দাখিলে আসছে ত্রৈমাসিক ব্যবস্থা ভূঞাপুরে দুই গ্রামের সংঘর্ষে নিহত ১, মাইকিং করে ফের সংঘর্ষের ঘোষণা পর্যটন খাতে তাপের প্রভাব বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদন ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ শাখায় কলমবিরতি হয়নি নাটোরে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু বেলকুচিতে বাসচাপায় অটোভ্যানের ৩ যাত্রী নিহত বন্ধ শিল্প ও প্রতিষ্ঠান সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ফেনীতে প্রখর রোদে দুর্ভোগে খেটে খাওয়া মানুষ বজ্রপাতে চার জেলায় নিহত ১০ দিলারার রেকর্ড গড়া ইনিংসে বাংলাদেশের জয় কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি ৫ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল তৃণমূলে বিদ্রোহের নেপথ্যে ‘ভাইপোবিরোধী’ হাওয়া
Nagad desktop

বাঙালির হজযাত্রার ৮০০ বছর সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিমানের জানালায় আকাশ দেখা

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১০:৫২ এএম
আপডেট: ৩১ মে ২০২৬, ০২:৪০ পিএম
সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিমানের জানালায় আকাশ দেখা
এআই দিয়ে বানানো হজযাত্রার বিভিন্ন যুগের কোলাজ ছবি

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আত্মিক সমাবেশের নাম হজ। প্রতিবছর বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান একটি গন্তব্যে ছুটে যান–পবিত্র মক্কায়। সেই মিছিলে বাংলাদেশের মুসলিমরাও ছিলেন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। এই যাত্রার ইতিহাসটা শুধু ধর্মীয় আবেগের নয়, এটি একটি জাতির সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং টিকে থাকার গল্পও বটে। সুলতানি আমল থেকে আজকের ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত এই ৮০০ বছরের যাত্রায় পথ বদলেছে, জাহাজ বদলেছে, বিমান এসেছে কিন্তু বদলায়নি মনের সেই অদম্য টান। এই লেখায় সেই দীর্ঘ পথচলার বিনম্র দলিল-দস্তাবেজ তুলে ধরা হলো–

আল্লাহর ঘরের দিকে যাত্রার এই অনুভূতি কোনো ভাষায় পুরোপুরি তুলে ধরা অসম্ভব। হৃদয়ে যে টান, পায়ের যে তাড়া এবং চোখের যে জল–সবই এক অদ্ভুত আবেগের সুতায় গাঁথা। বাংলাদেশের মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই টানেই ছুটে গেছেন পবিত্র ভূমির দিকে। পথ বদলেছে, জাহাজ থেকে বিমান হয়েছে, কাগজের জায়গায় এসেছে স্মার্টফোনের অ্যাপ–কিন্তু হৃদয়ের সেই ডাক আজও অটল। এই ভূখণ্ড থেকে হজযাত্রার সূচনাকাল নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। ইতিহাসবিদদের মতে, সিন্ধু বিজয়ের (৬৬৪-৭১২ খ্রিষ্টাব্দ) আগে থেকেই মুসলমানদের এই সফর শুরু হয়েছিল। তবে লিখিত ইতিহাস বলছে, অন্তত ৮০০ বছর ধরে এই ভূমি থেকে মানুষ হজে যাচ্ছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সমুদ্রপথে হজযাত্রার সূচনা সুলতানি আমল থেকে, অন্তত ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রার সেই দীর্ঘ ইতিহাসকে ছয়টি যুগে জানা যায়–

 

পালতোলা নৌকায় মক্কার পথে: সুলতানি আমল (১২০৪-১৫৩৮)

সুলতানি আমলে চট্টগ্রাম ও সাতগাঁও বন্দর ছিল পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর। চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস আরও প্রাচীন, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে এই বন্দরের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে এবং প্রাচীন গ্রিক ও রোমান মানচিত্রেও এর উল্লেখ রয়েছে। ঐতিহাসিক এই বন্দর থেকেই বাংলার মুসলমানরা পালতোলা জাহাজে চেপে পবিত্র ভূমির উদ্দেশে রওনা হতেন।
ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরী তার চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা গ্রন্থে লিখেছেন, সুলতানি আমলে (১৩৪০-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলাদেশ তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে করে জেদ্দায় যেতেন। চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর আর আরব সাগরের গালফ অব এডেন পেরিয়ে জেদ্দায় পৌঁছানোর দূরত্ব প্রায় ৫ হাজার ৬০০ নটিক্যাল মাইল। এই বিশাল দূরত্ব পাড়ি দিতে হাজিদের মাসের পর মাস লেগে যেত।
সেই যুগে হজে যাওয়া ছিল এক দুঃসাহসিক অভিযান–পথ ছিল দীর্ঘ, সময় ছিল বিপৎসংকুল। অনেকে ফিরে আসতেন না। তাই হজে যাওয়ার আগে মানুষ সবার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে যাত্রা করতেন–যেন এটাই জীবনের শেষ সফর।
সুলতানি আমলে হজযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত জার্নাল অব দ্য বিহার রিসার্চ সোসাইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে–বিহারের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হজরত মোজাফফর শাহ বলখী হজে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহকে চিঠি লেখেন। সুলতান তাকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, সুলতানি আমলেও চট্টগ্রাম থেকে হজযাত্রা সুসংগঠিত ছিল।

 

আরও পড়ুন : রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে হজ করতেন - ১ম পাঠ

 

নৌবহরের গৌরবময় মুঘল যুগ (১৫৩৮-১৭৫৭)

মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে হজযাত্রাও পেয়েছে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা। সম্রাট আকবরই ছিলেন প্রথম মুঘল শাসক, যিনি সরকারি খরচে হজযাত্রার ব্যবস্থা করেছিলেন। সমুদ্রপথে পর্তুগিজদের আধিপত্যের কারণে কার্তাজ পাস সংগ্রহ করা ছিল তখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, পর্তুগিজরা তাদের পাস না থাকলে মুসলিম জাহাজ জ্বালিয়ে দিত বা লুট করত। ১৫৭৫ সালে পর্তুগিজদের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পর সম্রাট আকবর প্রতি বছর একটি করে হজ নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দেন।
সেই সময় ভারতের সুরাট বন্দর বাব আল মক্কা বা বন্দরে মুবারক নামে পরিচিত ছিল। মুঘল আমলে সমৃদ্ধ এ বন্দর থেকেই হজযাত্রীরা যাত্রা করতেন। অটোমান সাম্রাজ্যের দলিলপত্রে ভারতীয় হজ মৌসুমকে বলা হতো মেভসিম-ই-হিন্দি বা ভারতীয় মৌসুম। তখন ভারতীয় উপমহাদেশের হজযাত্রীরা হিজাজের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।
মুঘল পরিবার থেকে প্রথম যে নারী হজে গিয়েছিলেন, তিনি সম্রাট বাবরের কন্যা গুলবদন বেগম–তিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের ফুফু। ১৫৭৬ সালে তিনি ১১ জন নিকটাত্মীয় নারী, বিশ্বস্ত সেবক ও সেনাসহ এক বিশাল কাফেলা নিয়ে হজে রওনা হন। পর্তুগিজ পাসের জন্য সুরাট বন্দরে প্রায় এক বছর অপেক্ষা করার পর তারা আরব সাগর পাড়ি দিয়ে জেদ্দায় পৌঁছান। গুলবদন বেগম মক্কায় চার বছর থেকে চারবার হজ ও কয়েকবার ওমরাহ পালন করেন। ইতিহাসে এ-ও পাওয়া যায়, মুঘল শাসকরা কাউকে নির্বাসন দিতে চাইলে হজে পাঠিয়ে দিতেন। তবে কোনো মুঘল সম্রাট নিজে হজ পালন করেছেন বলে কোনো প্রামাণিক রেকর্ড বা দলিল পাওয়া যায় না।

 

ঔপনিবেশিক ছায়ায় হজের পথ: ব্রিটিশ আমল (১৭৫৭-১৯৪৭)

ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর হজযাত্রায় এল এক নতুন বাস্তবতা। পালতোলা নৌকার জায়গায় এল বাষ্পচালিত জাহাজ–বিশেষত ১৮৫০ সালের পর থেকে স্টিমশিপের ব্যবহার বাড়ায় সমুদ্রপথে হজযাত্রীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খুলে যাওয়ার পর ভারত থেকে আরবের পথে যাত্রা আরও সহজ হয়। কিন্তু এ সহজ যাত্রায় আরোপিত হয় ঔপনিবেশিক নজরদারি–স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কোয়ারেন্টাইন ও নিবন্ধনের নতুন বিধিমালায় হজযাত্রীদের নতুন বাধায় পড়তে হয়।
১৯ শতকের শেষদিকে হজযাত্রা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। এর মূল কারণ ছিল কলেরার প্রকোপ। ১৮৬৫ সালে ভারতীয় হজযাত্রীদের মাধ্যমে আরবে কলেরা ছড়িয়ে পড়ে, সেখান থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে যায়। এই মহামারি এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল–১৮৬৬ সালের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যকে বাফার জোন ঘোষণা করে আলেকজান্দ্রিয়া ও কনস্টান্টিনোপলে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য পর্ষদ গঠন করা হয়। ১৮৮৭ সালে ভিয়েনার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কংগ্রেসে অধিকাংশ অ-ব্রিটিশ প্রতিনিধি মনে করতেন–ভারত থেকে ছড়ানো কলেরা পশ্চিমের জন্য একটি স্থায়ী হুমকি।
ভারত সরকার জাহাজ চলাচল ও কোয়ারেন্টাইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আইন পাস করে। তবে অধিক মুনাফার লোভে অনেক জাহাজ মালিক এই নিয়মগুলো মানতেন না এবং ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বোঝাই করতেন। জাহাজের নোংরা পরিবেশ ও ঠাসাঠাসি অবস্থায় হজযাত্রীদের থাকতে হতো। সমস্যা সমাধানে ভারত সরকার ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত টমাস কুক কোম্পানিকে হজের সরকারি ভ্রমণ এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করে। কিন্তু হজযাত্রায় যথেষ্ট মুনাফা না থাকায় কোম্পানিটি এ সেবা গুটিয়ে নেয়।
এ সময় প্রধান হজ বন্দর হয়ে ওঠে বোম্বে বা মুম্বাই। বার্মা, পাকিস্তান ও বাংলার মতো দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ বোম্বেতে আসত হজে যাওয়ার উদ্দেশে। বাড়ি ছেড়ে ফিরে আসা পর্যন্ত ছয়-সাত মাস লেগে যেত। জাহাজের আসনের চেয়ে আবেদনকারী বেশি থাকায় লটারি করা হতো। লটারিতে নাম না উঠলে খালি হাতে ফিরতে হতো বাড়ির পথে। তখন অনেকে বাড়ি ফেরত হাজিদের মজা করে বোম্বাই হাজি নামে সম্বোধন করত!
১৯৩০ সালের শেষদিকে ভারতের ৭০ শতাংশ হজ জাহাজই মুঘল লাইন নামের একটি শিপিং কোম্পানির মালিকানাধীন ছিল। পূর্ব ভারতীয়রা যাতে কলকাতা বন্দর দিয়ে হজে যেতে পারেন, সে বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী সরকারের কাছে প্রস্তাব দেন। সরকার রাজি হলে, ফটিকছড়ির ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরীর শিপিং লাইনের ইংলিশতান জাহাজে করে ১৯৩৭ সালে কলকাতা বন্দর দিয়ে হজযাত্রীদের যাত্রা শুরু হয়। ব্রিটিশ আমলে চট্টগ্রামে মোয়াল্লেমদের (হজযাত্রীদের সার্বিক ব্যবস্থাপক) সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। হজের কয়েক মাস আগে তারা মক্কা থেকে চট্টগ্রামে এসে স্থানীয়দের বাড়িতে থাকতেন এবং হজযাত্রীদের দল গঠন করতেন। সৌদি ভূখণ্ড থেকে আসা এই মানুষগুলোকে স্থানীয়রা এতটাই শ্রদ্ধা করতেন–বিভিন্ন বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে মোয়াল্লেমদের কুলিয়ে ওঠা-ই কঠিন হয়ে যেত।

 

আরও পড়ুন : রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে হজ করতেন - ২য় পাঠ

 

হজের জাহাজে পাকিস্তানি পতাকা (১৯৪৭-১৯৭১)

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্বপাকিস্তানে হজ ব্যবস্থাপনায় এল সরকারি রূপ। ১৯৪৮ সালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সরকারিভাবে হজযাত্রী পরিবহন শুরু হয়। চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ৯ একর ৩৫ শতকের একটি স্থায়ী হাজি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। ক্যাম্পের ভেতরে ছিল একটি বড় মসজিদ, একটি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন ও যাত্রীদের থাকার জন্য সাতটি দ্বিতল ভবন। হজযাত্রার আগে অন্তত এক সপ্তাহ এই ক্যাম্পে থেকে প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নিতে হতো।
সাফিনা-ই-আরব ও সাফিনা-ই-আরাফাত নামে দুটি জাহাজ প্রতি বছর দুই ট্রিপে হজযাত্রীদের জেদ্দায় নিয়ে যেত। দুই জাহাজ মিলিয়ে প্রথম ট্রিপে যেতেন প্রায় ১ হাজার ৩০০ হজযাত্রী। রোজার ঈদের সাত দিন পরেই প্রথম জাহাজ ছাড়ত। ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জেদ্দায় গিয়েছিলেন মোট ৩ হাজার ৮৯৫ জন। পরে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির সারধানা জাহাজও এই রুটে চলাচল শুরু করে।
জাহাজে ডেক শ্রেণির আসন পেতে হতো লটারির মাধ্যমে–চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে এই লটারি হতো। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির আসন ব্যয়বহুল হওয়ায় সেগুলো অনেক সময় খালিই থাকত। সেই সময়ের খরচ সম্পর্কে আহমেদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, জাহাজের তৃতীয় শ্রেণিতে সব মিলিয়ে খরচ ছিল ১ হাজার ৯১৯ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং প্রথম শ্রেণিতে ৭ হাজার টাকার কিছু বেশি।
সমুদ্রযাত্রার কষ্ট ছিল অবর্ণনীয়। তীব্র গরম ও প্রচণ্ড ভিড়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তাই জাহাজে থাকতেন চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার ও নার্স। যাত্রাপথে মারা যাওয়া হাজিদের ক্যানভাসে মুড়ে ভারী পাথর বেঁধে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। কখনো টেলিগ্রামে স্বজনদের মৃত্যুর খবর দেওয়া হতো; কখনো জানানো সম্ভব হতো না।
এই সময়ের যাত্রার একটি হৃদয়স্পর্শী বিবরণ পাওয়া যায় আইরিশ টাইমসে লেখক নরম্যান ফ্রিম্যানের প্রবন্ধে। ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির সারধানা জাহাজে কর্মরত ফ্রিম্যান লিখেছেন, ১ হাজার ৫০০ হজযাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে ফেরার পথে অসুস্থতায় চারজন মারা যান। তাদের লাশ ভারত মহাসাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তবে এত কষ্টের পরও চট্টগ্রামে পৌঁছানোর সময় ক্লান্ত হজযাত্রীদের চোখেমুখে ছিল এক ধরনের গভীর তৃপ্তি আর মর্যাদার ছাপ।
বিদায়ের দিনটি ছিল এক আবেগময় উৎসব। বাসে করে হজযাত্রীদের বন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো। চট্টগ্রামের ১৭টি জেটির মধ্যে সবচেয়ে বড় ও খোলামেলা চার নম্বর জেটি হজযাত্রীদের জন্যই বরাদ্দ থাকত। জাহাজ ছাড়ার পর কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে সমুদ্রে প্রবেশের সময় অন্যান্য জাহাজ হুইসেল বাজিয়ে শুভেচ্ছা জানাত। হজ তখন এতটাই গৌরব ও সম্মানের বিষয় ছিল–পুরো চট্টগ্রাম শহরে এই মৌসুমে এক ধর্মীয় আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হতো।

 

স্বাধীনতার পর সংকট ও উত্তরণের হজযাত্রা (১৯৭১-১৯৮৫)

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশকে স্বাধীন করল। কিন্তু হজযাত্রা পড়ল গভীর সংকটে। যুদ্ধের সময় সাফিনা-ই-আরব ও সাফিনা-ই-আরাফাতের প্রথম ট্রিপ যেতে পারলেও দ্বিতীয় ট্রিপের যাত্রা সম্ভব হয়নি। এরপর দেখা দিল এক মানবিক সংকট। ১৯৭২ সালের আরাফাত দিবস ছিল ২৭ জানুয়ারি। হজযাত্রীরা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সৌদি আরবে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হয়ে গেলে তারা পড়ে গেলেন উভয়মুখী সংকটে–পাকিস্তানি কাগজপত্র থাকায় না পারছেন পাকিস্তানে ফিরতে, না পারছেন নতুন বাংলাদেশে ঢুকতে। এই মানবিক সংকটে তখনকার দায়িত্বশীল সরকার জাতিসংঘের মাধ্যমে সৌদি বাদশাহ ফয়সালকে চিঠি পাঠালে অনুমতি মিলল। এরপর ভারতীয় মোহাম্মদী জাহাজে দুই দফায় হাজিদের দেশে ফেরানো হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে তখন অসংখ্য মাইন ও ডুবে যাওয়া জাহাজ থাকায় ভেতরে প্রবেশ করা ছিল বিপজ্জনক। মোহাম্মদী জাহাজ মোংলায় গেলেও নাব্যতার সমস্যায় সেখানেও নোঙর ফেলা সম্ভব হয়নি। অবশেষে নদীপথে ঘুরে ঘুরে চাঁদপুরে নোঙর করে জাহাজটি। হাজার হাজার স্বজন মোংলায় গিয়েছিলেন হাজিদের নিতে, পরে তাদের চাঁদপুরে ফিরতে হয়। এক হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যের দেখা মিলেছে বাংলার জমিনে।
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হজযাত্রী হজ পালন করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন হিজবুল বাহার নামে একটি জাহাজ কেনে। এর ধারণক্ষমতা ছিল, ১ হাজার ৮০০ জন, যাতায়াতে লাগত প্রায় দুই মাস। পরে ব্যয় সংকোচনের জন্য জাহাজটি নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়, তারা শহীদ সালাহউদ্দিন নাম দিয়ে কয়েক বছর হজযাত্রী পরিবহন করে। একসময় মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত হয়ে যায় জাহাজটি।
একই বছর সৌদি এয়ারলাইনসের ঢাকা-জেদ্দা ফ্লাইট চালু হলে সব পাল্টে যেতে শুরু করে। ওমরাহর আসা-যাওয়ার ভাড়া ছিল ৯ হাজার টাকার কিছু বেশি আর যাত্রার সময় কমে এল মাত্র ছয়-সাত ঘণ্টায়। বিমানের প্রতিযোগিতায় সমুদ্রপথে যাত্রী ক্রমশ কমতে থাকে। ১৯৮০ সালের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে শেষবারের মতো হিজবুল বাহারে সমুদ্রপথে হজযাত্রীরা বহন করে জেদ্দা যায়। এরপর ধীরে ধীরে বিমানই হয়ে ওঠে হজযাত্রার একমাত্র মাধ্যম। ১৯৮৫ সালের পর সমুদ্রপথে হজযাত্রা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

 

আরও পড়ুন : হাজিদের জন্য জরুরি টিপস

 

ডিজিটাল যুগে আল্লাহর মেহমান (১৯৮৫-বর্তমান)

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে হজ ব্যবস্থাপনার প্রাণকেন্দ্র চলে এল ঢাকার আশকোনায়। ১৯৮৯ সালের পর থেকে আশকোনা হাজি ক্যাম্পই হয়ে উঠল লক্ষাধিক হজযাত্রীর প্রথম গন্তব্য। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৯৭২ সাল থেকে হজ ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে–এটি এখন তাদের করপোরেট পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। 
সৌদি আরব বাংলাদেশকে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি হজ কোটা বরাদ্দ করে। আজ একজন হজযাত্রী ঘরে বসেই মোবাইল অ্যাপ বা ইন্টারনেটে নিবন্ধন করতে পারেন। ই-হজ সিস্টেম, ই-হজ বিডি অ্যাপ, ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টার–সর্বত্র যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া।

 

বিশ্বাসের পথ কখনো থামে না

৮০০ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রার দিকে তাকালে মনে হয়, পথ বদলেছে অনেকবার কিন্তু বিশ্বাস বদলায়নি একটুও। পালতোলা নৌকায় অনিশ্চিত সমুদ্রে যে মানুষটি ভেসেছিলেন, আজকের হজযাত্রী তার চেয়ে কতটুকুই বা আলাদা? কাবার প্রতি হৃদয়ের সেই আকর্ষণ, লাব্বাইকাল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনির সেই কান্নামাখা ডাক–সব তেমনই আছে, যেমন ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী আগে। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ সংকটের পর চাঁদপুরের ঘাটে হাজার হাজার স্বজনের অপেক্ষার দৃশ্য একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়–হজ কেবল একজন ব্যক্তির অনুভব নয়, এটি একটি পরিবারের, একটি সমাজের, একটি রাষ্ট্রের যাত্রা। একটি জাতির পরিচয়ের নিশানা। 

 

লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

 

 

৫ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম
৫ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি
জুন, ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচির ছবি

প্রতিদিন সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ (সালাত) ইসলাজুনর পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং ইসলাজুনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘নামাজ (বুখারি মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’ (বুখারি, ৬৩১)

সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে হলে, নামাজের সময় জানতে হবে।

আজ জুন ২০২৬, শুক্রবার ঢাকা পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো— 

জোহর ১২.০০ মিনিট
আসর .৩৫ মিনিট
মাগরিব .৪৬ মিনিট
এশা .১১ মিনিট
ফজর ( জুন) .৪৫ মিনিট

 

 

বিভাগীয় শহরের জন্য উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগে সময় যোগ-বিয়োগকরতে হবে।

বিয়োগ

চট্টগ্রাম: মিনিট

সিলেট: মিনিট

যোগ

খুলনা: মিনিট

রাজশাহী: মিনিট

রংপুর: মিনিট

বরিশাল: মিনিট

 

সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যে বিশ্বাস মানুষের জীবনে এনে দেয় অভাবনীয় ৬টি পরিবর্তন?

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
যে বিশ্বাস মানুষের জীবনে এনে দেয় অভাবনীয় ৬টি পরিবর্তন?
আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। ছবি: সংগৃহীত

যান্ত্রিক এই জীবনে আমাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। ক্যারিয়ার, পরিবার কিংবা ভবিষ্যৎ, সবকিছু নিয়ে এক অদৃশ্য অস্থিরতা আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। কিন্তু আপনি কি জানেন, ইসলামে এমন এক জাদুকরি দাওয়াই রয়েছে, যা নিমেষেই সব মানসিক চাপ দূর করে দিতে পারে? সেটি হলোতাওয়াক্কুলবা আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা রাখা। এটি কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং মানসিক শান্তি সফলতার চাবিকাঠি। আল্লাহর ওপর খাঁটি মনে ভরসা রাখলে জীবনে যে ৬টি অভাবনীয় পরিবর্তন আসে, চলুন জেনে নেওয়া যাক:

যখন আপনি কোনো কাজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবেন, তখন স্বয়ং আল্লাহ আপনার অভিভাবক হয়ে যান। পবিত্র কোরআনের সুরা তালাকের ঘোষণাই এটি যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার সব সমস্যার সমাধানের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।

তাওয়াক্কুল মানুষের মন থেকে সব ভয় দূর করে দেয়। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, শত্রুর বিশাল বাহিনীর সামনেও মুমিনরা বুক টান করে দাঁড়িয়েছেন কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করে। বিপদের মুখে যারা বলে ওঠেনহাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল’ (আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট), আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং শত্রুর ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন।

পরকালের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো বিনা হিসেবে জান্নাত লাভ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, উম্মতের মধ্যে এমন ৭০ হাজার সৌভাগ্যবান মানুষ থাকবেন, যারা কোনো হিসাব-নিকাশ ছাড়াই জান্নাতে যাবেন। এই দলটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে, তারা জীবনের প্রতিটি মোড়ে কেবল তাদের রবের ওপরই ভরসা রাখতেন।

আমরা অনেকেই জীবিকা নিয়ে সারাক্ষণ উদ্বেগে থাকি। অথচ আল্লাহর ওপর সঠিক উপায়ে ভরসা করলে রিজিকের অভাব দূর হয় চমৎকারভাবে। প্রিয় রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা যদি পাখির মতো আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদেরও ক্ষুধার্ত অবস্থায় সকালে বের করে ভরপেটে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরাতেন।

নিজের এবং পরিবারের সুরক্ষার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো তাওয়াক্কুল। যেমনটি হযরত ইয়াকুব (.) তাঁর সন্তানদের বিপদের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ওপর ভরসা করে সফরে পাঠিয়েছিলেন এবং তারা নিরাপদে ফিরে এসেছিল। মহান আল্লাহর জিম্মায় কোনো কিছু সঁপে দিলে তার চেয়ে নিরাপদ আর কিছু হতে পারে না।

শয়তান সবসময় মানুষকে হতাশ পথভ্রষ্ট করার ফন্দি আঁটে। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এমনকি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আল্লাহর নাম ভরসার দোয়া পড়লে শয়তান সেই মানুষটি থেকে দূরে সরে যায়।

তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং নিজের সেরা চেষ্টাটুকু করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা। আজ থেকেই আমাদের চিন্তাভাবনা কর্মে এই মহৎ গুণটি নিয়ে আসি, দেখবেন জীবন কতটা সহজ আর শান্তিময় হয়ে ওঠে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

যে ছায়াতেই লুকিয়ে আছে জীবনের আসল তৃপ্তি

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
যে ছায়াতেই লুকিয়ে আছে জীবনের আসল তৃপ্তি
মায়ের দোয়াই হোক দুনিয়া ও আখেরাতের শ্রেষ্ঠ সম্বল।ছবি: সংগৃহীত

বৃদ্ধা মায়ের লাশ ঘরে পড়ে আছে, পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, অথচ বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকা সন্তানের কোনো খবর নেই—সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বুকে ঘটে যাওয়া এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। যে মা নিজের রক্ত পানি করে সন্তানকে মানুষ করলেন, ক্যারিয়ার আর আধুনিকতার অন্ধ মোহে আজ সেই মা-ই অবহেলিত। অথচ ইসলাম বলে, মায়ের সেবার মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুনিয়ার সম্মান ও আখেরাতের মুক্তি।

মা মহান আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নেয়ামত। ইসলামে মায়ের মর্যাদা এতটাই ঊর্ধ্বে যে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহর ইবাদতের পরেই মা-বাবার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুরা বনি ইসরাঈলের ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, বার্ধক্যে তারা যখন দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন তাদের 'উফ' শব্দটুকুও বলা যাবে না, বরং তাদের সাথে অত্যন্ত সম্মানজনক কথা বলতে হবে।

মায়ের কষ্টের গভীরতা বোঝাতে সূরা লুকমানে বলা হয়েছে, মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন। এই ত্যাগের কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবির প্রশ্নের জবাবে পর পর তিনবার মায়ের প্রতি উত্তম আচরণের তাগিদ দিয়েছেন, আর চতুর্থবারে বাবার কথা বলেছেন (সহিহ বুখারি)।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাতৃসেবা মানুষকে কতটা সম্মানিত করতে পারে। আল্লাহর রাসুলের যুগে থেকেও শুধু পঙ্গু মায়ের সেবার কারণে মদিনায় আসতে পারেননি উওয়াইস আল-কারনি (রহ.)। কিন্তু এই একটি গুণের কারণে রাসুল (সা.) স্বয়ং ওমর (রা.)-এর মতো মহান সাহাবিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন উওয়াইসের কাছ থেকে দোয়া চেয়ে নিতে।

আরো পড়ুন: বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ১০৪ বছর বয়সের যে নারী?

আজকের ব্যস্ত ও স্বার্থপর সমাজে আমরা সাফল্যের পেছনে ছুটছি, কিন্তু ভুলে যাচ্ছি আসল সাফল্যের চাবিকাঠি, যা হলো মায়ের পদতলে জান্নাত। মাকে কষ্ট দেওয়া বা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা শুধু নৈতিক অবক্ষয় নয়, ইসলামে এটি কবিরা গুনাহ। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বৃদ্ধ মা-বাবার একাকীত্ব ও অবহেলার যে চিত্র গণমাধ্যমে ভেসে আসছে, তা এক গভীর সামাজিক ব্যাধি।

মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটানো, তার পাশে বসে দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলা, অসুস্থতায় সেবা করা—এগুলো কোনো দয়া নয়, বরং সন্তানের ওপর ফরজ ইবাদত। যে সন্তান মায়ের মন জয় করতে পারে, আল্লাহ সমাজেও তার সম্মান বাড়িয়ে দেন এবং তার উপার্জনে বরকত দেন। আসুন, ব্যস্ততার অজুহাত দূরে ঠেলে জীবিত থাকতেই মায়ের সর্বোচ্চ খেদমত করি। মায়ের দোয়াই হোক আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের শ্রেষ্ঠ সম্বল।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

গোটা পৃথিবীই নামাজের জায়গা,তবে মসজিদ কেন প্রয়োজন?

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১০:০০ এএম
গোটা পৃথিবীই নামাজের জায়গা,তবে মসজিদ কেন প্রয়োজন?
‘নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য।’ ছবি: সংগৃহীত

পুরো জমিনই তো উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য নামাজের স্থানতাহলে এই আধুনিক যুগে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিশাল অবকাঠামো বা মসজিদ নির্মাণের বাধ্যবাধকতা কতটুকু? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা কিংবা বিভিন্ন আইনি রাজনৈতিক বিতর্কে এই প্রশ্নটি বেশ জোরেসোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকের মনেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের জিজ্ঞাসা। কিন্তু আসলেই কি ইসলামে মসজিদের ভূমিকা শুধু নামাজ পড়ার একটি চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো সামাজিক সভ্যতার দর্শন?

আসুন আবেগ বাদ দিয়ে পবিত্র কোরআন, সুন্নাহ এবং ইতিহাসের আয়নায় বিষয়টি সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি। সহিহ বুখারি শরিয়ের একটি বিখ্যাত হাদিস আছে, রাসূলুল্লাহ সা.বলেছেন আমার জন্য পুরো জমিনকে সেজদার জায়গা পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম করা হয়েছে।।

অনেকেই এই হাদিসের খণ্ডিত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ভাবেন, যেহেতু যেকোনো পবিত্র জায়গায় নামাজ পড়া যায়, তাই প্রাতিষ্ঠানিক মসজিদের কোনো দরকার নেই। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। পূর্ববর্তী উম্মতদের জন্য নির্দিষ্ট উপাসনালয় ছাড়া ইবাদত করার অনুমতি ছিল না। প্রিয় রাসুল (সা.) এই হাদিস দিয়ে উম্মতের জন্য সেই জটিলতা সহজ করে দিয়েছেন, যার অর্থপথচলতি অবস্থায় নামাজের সময় হলে আপনি মাঠ বা ঘাটে নামাজ পড়ে নিতে পারবেন। এর মানে এই নয় যে, স্থায়ী সমাজের জন্য মসজিদের গুরুত্ব ফুরিয়ে গেছে।

আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন, তাঁর প্রথম কাজটি কিন্তু কোনো রাজপ্রাসাদ বানানো ছিল না; তিনি তৈরি করেছিলেনমসজিদে নববি

আরো পড়ুন: কেমন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষের অবয়ব?

ইসলামী সমাজ কাঠামোতে মসজিদ কেবল নামাজের জায়গা নয়। মদিনার সেই মসজিদটি একাধারে ছিল: রাষ্ট্রের সংসদ ভবন প্রশাসনিক কেন্দ্র। প্রধান আদালত, যেখানে বসে বিচারকার্য বিবাদ মীমাংসা করা হতো। জ্ঞানচর্চার প্রধান বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি রূপ। আর সামাজিক ঐক্য বর্তমান সময়ের অপরিহার্যতা

আজকের যান্ত্রিক আত্মকেন্দ্রিক সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব বাড়ছে। এই বাস্তবতায় মসজিদ হলো এক অনন্য মিলনমেলা। দৈনিক পাঁচবার ধনী-দরিদ্র, শাসক-শোষিত সব ভেদাভেদ ভুলে যখন মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায়, তখন যে সামাজিক সংহতি তৈরি হয়, তা অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব নয়।

পবিত্র কোরআনের সুরা জিনের ১৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য।তাই যেখানেই মুসলিম জনবসতি থাকবে, সেখানে সম্মিলিত শৃঙ্খলা, আধ্যাত্মিক প্রশান্তি পারস্পরিক সহমর্মিতা বজায় রাখতে মসজিদের কোনো বিকল্প নেই।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, মসজিদ কোনো ঐচ্ছিক বা বিলাসী স্থাপনা নয়, এটি ইসলামের রূহ বা প্রাণ। যারা ভাবছেন পুরো পৃথিবী নামাজের জায়গা বলে মসজিদের প্রয়োজন নেই, তারা আসলে ইসলামের সামাজিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপটিকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সমাজ কাঠামোতে মসজিদগুলো প্রাণবন্ত সক্রিয় থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের নৈতিকতা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি টিকে থাকবে। ইনশাআল্লাহ।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক 

৪ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:০০ এএম
৪ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি
জুন, ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচির ছবি

প্রতিদিন সময়মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ। নামাজ (সালাত) ইসলাজুনর পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি এবং ইসলাজুনর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, (হে আল্লাহর রাসুল!) আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় আমল কোনটি? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘নামাজ (বুখারি ও মুসলিম)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা সেভাবে নামাজ আদায় করো, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখেছ।’ (বুখারি, ৬৩১)

সঠিকভাবে নামাজ আদায় করতে হলে, নামাজের সময় জানতে হবে।

 

আজ ৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার । ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো— 

জোহর

১২.০০ মিনিট

আসর

৪.৩৫ মিনিট

মাগরিব

৬.৪৬ মিনিট

 

এশা

৮.১১ মিনিট

 

ফজর (২ জুন)

.৪৫ মিনিট

 

 

 

 

 

 

 

 

বিভাগীয় শহরের জন্য উল্লিখিত সময়ের সঙ্গে যেসব বিভাগে সময় যোগ-বিয়োগকরতে হবে।

বিয়োগ

চট্টগ্রাম: ৫ মিনিট

সিলেট: ৬ মিনিট

যোগ

খুলনা: ৩ মিনিট

রাজশাহী: ৭ মিনিট

রংপুর: ৮ মিনিট

বরিশাল: ১ মিনিট

সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন