বাংলা ভাষা, বাঙালিয়ানা ও বাংলাদেশের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, যার ঐতিহাসিকভাবে ব্যবচ্ছেদ কোনোভাবেই সম্ভবপর নয়। সপ্তম শতকের গোড়ার দিকে বাংলার স্বাধীন শাসক মহারাজা শশাঙ্কের আমল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এই পূর্বাঞ্চলটিতে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও অন্যান্য দিক থেকে একটি সার্বভৌম সত্তার অঙ্কুরোদগম শুরু হয় এবং এ এলাকাকে ঘিরে জনগণের মধ্যে এক স্বাধীন চেতনা ও মনোভাব তৈরি হতে শুরু করে। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি এক ধরনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার জন্য একজন যোগ্য শাসক (রাজা গোপাল দেব) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাল আমলের সূচনা হয়। সেন আমলে বাঙালির সত্তার আরও বিকাশ ঘটতে শুরু করে।
বাঙালি ও বাঙালিয়ানার উন্মেষের এ ইতিহাস প্রায় হাজার বছরের। আর তেমনিভাবে ইসলামের সঙ্গে এ অঞ্চলের লোকজনদের পরিচয়ের সময়কালও বলতে গেলে প্রায় একই রকম। পাল আমলের শেষের দিক থেকে বাংলায় সামুদ্রিক পথে সীমিত ও বিক্ষিপ্তভাবে মুসলিম বণিকদের আনাগোনা শুরু হয়, যা এ এলাকার আদিবাসীদের জন্য ইসলামের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিকালে কুমিল্লার ময়নামতীতে বারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের একটি তাম্রলিপি পাওয়া গেছে, যেখানে সে এলাকায় মুসলিমদের আনাগোনা, বসবাস এবং মসজিদ ও মাদরাসার মতো কিছু প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ইঙ্গিত রয়েছে। ১২০৫ সালে বখতিয়ার খিলজির গৌড় বিজয়ের পর বাংলা অঞ্চলটি একদিকে যেমন ইসলামি সভ্যতার সংস্পর্শে আসতে শুরু করে, অন্যদিকে অঞ্চলটির স্বাধীন সত্তা একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। তুর্কি বংশোদ্ভূত খিলজিদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইসলামের সঙ্গে এ অঞ্চলের পরিচয় নিবিড় থেকে নিবিড়তর হতে থাকে এবং সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা, যা ইংরেজ উপনিবেশ আমলে অবিশ্বাস্য রকমের বৃদ্ধি পায়।
উত্তর ভারতে দিল্লির মসনদে আসীন শাসকদের বিভিন্ন সামরিক আগ্রাসনের মুখে বাংলার স্বাধীনতা মাঝে-মধ্যে ক্ষুণ্ণ হলেও একটি সার্বভৌম, সচ্ছল ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে অঞ্চলটি সে সময়ে সর্বজনীন পরিচিতি পায়, যার প্রবাদপ্রতিম প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিজাত ও অন্যান্য বহুবিধ পণ্যের ব্যাপক উৎপাদন ও রপ্তানি দেশটিকে বিশেষভাবে খ্যাত করে। প্রাথমিক মুসলিম লেখকদের বর্ণিত ‘বিলাদ-ই-বঙ্গ’ (বা ‘বঙ্গদেশ’) এর মধ্যে আধুনিককালে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশ, রাষ্ট্র ও জাতি বলতে যা বোঝায়, তার সবকিছুই নিহিত ছিল। দেশটির ভূভাগ ও মানচিত্র সম্পর্কে বিভিন্ন অঞ্চলে ও জনমনে সাধারণভাবে একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল, যার মূল ভূখণ্ডটি ছিল মোটামুটিভাবে বর্তমানকালের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশকেন্দ্রিক, যদিও বিভিন্ন সুলতানের আমলে এর সীমানার সম্প্রসারণ ও সংকোচন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সীমানা রক্ষা ও বহিরাগ্রাসন মোকাবিলার জন্য দেশটিতে ধীরে ধীরে একটি নিয়মতান্ত্রিক সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। প্রশাসন পরিচালনা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সংস্থাও ছিল, আর ছিল একটি শক্তিশালী বিচার বিভাগ। নেতাজি সুভাসচন্দ্র বোসের ভাষায় ‘বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল ছিল হিন্দু-মুসলমানদের মিলিত শাসন’। মুঘল সম্রাট আকবর কর্তৃক ১৫৭৫-৭৬ সালে বাংলা বিজয় পর্যন্ত অঞ্চলটি মোটামুটি স্বাধীন থাকে।
মুঘল বিজয়ের পর দেশটি মুঘল সাম্রাজ্যের একটি সুবা বা প্রদেশে পরিণত হয় এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যু (১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মুঘল বাদশাহরা রাজধানী দিল্লি থেকে তাদের সুবেদারদের (গভর্নরদের) মাধ্যমে এ প্রদেশটিকে শাসন করেন। এক শতাব্দীরও কিছু বেশি সময় দিল্লির মুঘল বাদশাহরা দোর্দণ্ড প্রতাপে বাংলা শাসন করলেও সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সুবেদার নওয়াব মুর্শিদ কুলি খানের আমলের শেষের দিকে বাংলায় দিল্লির মুঘল বাদশাহদের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলে মুঘল সুবেদাররা সবাই নওয়াব উপাধি গ্রহণ করেন এবং একরকম স্বাধীনভাবেই শাসন পরিচালনা করেন। মুঘল আমলের এ দূরবর্তী সুবা-ই-বাঙ্গাল থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হতো, সাম্রাজ্যের অন্য কোনো প্রদেশ থেকে এত পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা কখনই সম্ভবপর হয়নি।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের বিজয়ের পর বাংলার শাসনক্ষমতা ক্রমাগত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়। ইংরেজ আমলে অঞ্চলটি ইংরেজদের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার পর কার্যত বাংলা এবং পরবর্তীকালে সমগ্র ভারতের (ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার) রজধানী কলকাতা হয়ে দাঁড়ায়, যা ১৯১১ পর্যন্ত বলবৎ থাকে। ফলে ভারতের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের বলয় উপমহাদেশের উত্তর বা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল না হয়ে বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়ায়। এক কথায় ইংরেজ উপনিবেশ আমলের গোড়ার দিকে রাজধানী কলকাতা হওয়ায় ভারতের অন্যান্য প্রদেশ বাংলা থেকে শাসিত হতো। ফলে ভারতের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের বলয় উপমহাদেশের উত্তর বা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল না হয়ে বাংলাকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়ায়।
ইংরেজ উপনিবেশ আমলেই উনিশ শতক থেকে কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে ধীরে ধীরে সমগ্র উপমহাদেশভিত্তিক এক ধরনের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উন্মেষ দেখা দেয়। এই দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক জাতীয়তাবোধ বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মননে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। কারণ গ্রামবাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ বাঙালির আশা ও ভরসা অতীতের সেই সুজলা-সুফলা স্বাধীন বঙ্গদেশকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যে তাদের বাঙালিয়ানার স্বপ্ন নিহিত ছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ (যা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের বা দেশের বিভাজন ছিল না, শুধু ছিল প্রশাসনিক পৃথকীকরণ বা বিকেন্দ্রীকরণ) কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি ভদ্রলোকদের স্বার্থে আঘাত হানলেও পূর্ব বাংলার হতদরিদ্র কৃষকশ্রেণির মধ্যে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে হয়তো বা পরবর্তীকালে পাকিস্তানের দাবি কিংবা আরও পরে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সম্ভাবনা তেমন একটা জোর পেত না।
বলতে গেলে বাঙালি ভদ্রলোকদের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার জেরস্বরূপ ব্রিটিশ ভারতে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী ঢাকাতেই ১৯০৬ সালের শেষ দিকে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। বাংলার মুসলিম নেতৃবর্গ ও সাধারণ জনগণের একটা বড় অংশ পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তবে সমান্তরালভাবে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার স্বপ্নও অনেকে দেখতে শুরু করেছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেমের মতো মুষ্টিমেয় কিছু অসাধারণ দূরদর্শী নেতা। কিন্তু হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও কংগ্রেসের কিছু নেতার প্রবল বিরোধিতার মুখে অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গড়ে তোলার পরিকল্পনাটি গোড়াতেই নস্যাৎ হয়ে যায়।
পাকিস্তান দাবির সমর্থনে পূর্ব বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যে উৎসাহ দেখিয়েছিল, সেখানে একটি বড় ধরনের আশা ও স্বপ্ন লুকিয়ে ছিল। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হিসেবে এ অঞ্চলটির বঞ্চিত সাধারণ বাঙালিরা মনে করেছিল যে, এ নতুন দেশটিতে তারা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ পাবে। কার্যত বাংলা থেকে প্রায় দেড় বা ২ হাজার কিলোমিটার দূরে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রাজধানীগুলোতে অবাঙালি রাষ্ট্রপ্রধানরা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার বিষয়ে যতটা উৎসাহিত ছিলেন, ততটাই উদাসীন ছিলেন বাংলার সার্বিক উন্নতি ও বাংলা ভাষার বিকাশের প্রতি।
পাকিস্তানের সর্বাপেক্ষা জনবহুল প্রদেশ ‘পূর্ব পাকিস্তান’ থেকে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিঃসন্দেহে হাজার বছর ধরে বহু কষ্টসাধ্যে ও যত্নে জিইয়ে রাখা স্বাধীন বাঙালি জাতির স্বপ্ন ও আবেগের প্রকৃত বাস্তবায়ন, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেখান থেকে বহু দূরে উত্তর বা উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত উপমহাদেশের উর্দু বা হিন্দি ভাষাভাষী বলয়ের প্রভাব ও কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হয়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালিয়ানাকে তার নিজস্ব মর্যাদা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।
লেখক: অধ্যাপক প্রাক্তন ফেলো, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
এবং অতিথি অধ্যাপক, বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, ঢাকা