ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচুতে। শ্রমকে ইসলাম ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে না; বরং অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখে থাকে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, যখন তোমাদের সালাত আদায় হয়ে যায় তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশে ব্যাপৃত হয়ে যাও। (সুরা জুমা, ১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, শ্রমজীবীর উপার্জনই উৎকৃষ্টতর, যদি সে সৎ উপার্জনশীল হয়। (মুসনাদে আহমাদ, ৮৩৯৩)। অপর এক হাদিসে এরশাদ হচ্ছে, নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো কেউ খায় না। হজরত দাউদ (আ.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন। (বুখারি, ২০৭২)
অবশ্য ইসলাম যেমনিভাবে শ্রম ও হালাল উপার্জনের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করেছে, ঠিক এর বিপরীতে কোনো পরিশ্রম না করে সমাজের গলগ্রহ হয়ে থাকারও কঠোর নিন্দা করেছে। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ওয়াদাবদ্ধ হবে যে, সে কোনোদিন ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করবে না তার জান্নাত লাভের দায়িত্ব আমি গ্রহণ করলাম। (আবু দাউদ)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, যে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করবে সে মহান আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, তার চেহারায় এক টুকরো মাংসও থাকবে না। (বুখারি)। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে শ্রমিক অধিকারের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। আমরা এখানে ইসলাম প্রদত্ত শ্রমিক অধিকারের মৌলিক দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।
সামাজিক মর্যাদা: ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যা শ্রমিক সম্প্রদায়কে মানবিক ও সামাজিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম কিংবা মতবাদে শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয়নি। কোরআনে এরশাদ হয়েছে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে তারাই বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যারা বেশি আল্লাহভীরু। (সুরা হুজুরাত, ১৩)
অর্থাৎ আল্লাহর কাছে ধনী-গরিবে কোনো বৈষম্য নেই। মালিক-শ্রমিকের ব্যবধান নেই। বরং সে-ই আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ, যে তাকওয়া অবলম্বন করে। উল্লিখিত আয়াতের বাস্তব নমুনা আমরা দেখতে পাই অগণিত নবি-রাসুলের পবিত্র জিন্দেগিতে, খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোবারক জীবনীতে এবং তার প্রাণপ্রিয় সাহাবিদের আদর্শ জীবনে। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করলেন, দুনিয়াতে আল্লাহ এমন কোনো নবি পাঠাননি যিনি বকরি চরাননি। তখন সাহাবিরা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি বকবি চরিয়েছেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তরে বললেন, হ্যাঁ, আমি এক কিরাত, দুই কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীর বকরি চরিয়েছি। (বুখারি)
অপর এক হাদিসে এসেছে, হজরত দাউদ (আ.) কর্মকার ছিলেন, হজরত আদম (আ.) কৃষক ছিলেন, হজরত নুহ (আ.) ছিলেন ছুতার, হজরত ইদ্রিস (আ.) ছিলেন দর্জি আর মুসা (আ.) বকরি চরিয়ে জীবনযাপন করতেন। (মুসনাদে আহমাদ, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
এমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মধ্যে হজরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা.) সবাই আপন শ্রমলব্ধ উপার্জনের ভিত্তিতে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শ্রমিকের ভূমিকায় কাজ করতে ইসলামি সমাজে লজ্জার কিছুই ছিল না। অতএব এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ইসলামে শ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা অনেক বেশি।
শ্রমিকের পারিশ্রমিক নির্ধারণ: এ কথা অনস্বীকার্য যে, মানুষ প্রয়োজনের তাগিদে কাজ করে। তেমনিভাবে শ্রমিকরা অন্নকষ্ট লাঘবের জন্যই প্রধানত কাজ করে থাকে। তাদের রক্ত পানি করা শ্রমের ফসল ভোগ করে মালিকরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করে। তাই শ্রমিকদের জীবনধারণের জন্য মজুরি বা পারিশ্রমিক দিতে হয়। এই মজুরি নিয়েই যত সংঘাত ও বিবাদ। পীড়াদায়ক হলেও অনিবার্য বাস্তবতা এই যে, ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো মতবাদই শ্রমিকের মজুরি সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারেনি—না পুঁজিবাদ, না সমাজবাদ। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় পারিশ্রমিক নির্ধারণের মূল সূত্র হলো, দ্রব্যমূল্য যেমনিভাবে চাহিদা ও জোগানের অনুপাতে নির্ধারিত হয়, শ্রমের মূল্যও তেমনি চাহিদা ও জোগানের অনুপাতে নির্ধারিত হবে।
এটা স্পষ্ট যে, এ ব্যবস্থায় শ্রমিকরা দ্রব্যবস্তুর মতো প্রাণহীন, নির্জীব এবং অসহায়। আর পারিশ্রমিক নির্ধারণ প্রশ্নে সমাজতন্ত্রের মূল বক্তব্যই হচ্ছে, দক্ষতা ও যোগ্যতানুযায়ী কাজ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পারিশ্রমিক। এ ব্যবস্থায় শ্রমিকরা স্রেফ একটি অনুভূতিহীন রোবট বা যন্ত্রে পরিণত হয়। এখানে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্যই থাকে না। অথচ একমাত্র ইসলামই দিয়েছে শ্রমিকের পারিশ্রমিক সমস্যার যথার্থ সমাধান। কেননা ইসলামী অর্থনীতিতে ন্যূনতম পারিশ্রমিক প্রত্যেক শ্রমিকের প্রয়োজন অনুসারে নির্ধারিত হয়।
অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রমিককে কমপক্ষে এমন মজুরি ও পারিশ্রমিক দিতে হয় যাতে তিনি জীবনধারণের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন। হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) পারিশ্রমিক নির্ধারণ ব্যতিরেকে শ্রমিক থেকে শ্রম গ্রহণ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ) । অপর এক হাদিসে যথাসময়ে শ্রমিকের পারিশ্রমিক প্রদানে গুরুত্বারোপ করে এরশাদ হয়েছে, তোমরা শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও। (বাইহাকি)
শ্রমিকের সুস্থতা: ইসলাম কখনো কারও ওপর এমন নির্দেশ চাপিয়ে দেয় না, যা পালন করা তার জন্য দুঃসাধ্য বা অসম্ভব। বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম অর্থনীতিবিদ আল্লামা ইবনে হাজম (রহ.) বলেছেন, শ্রমিকের কাছ থেকে (মালিকের জন্য) অতটুকুই কাজ নেওয়া উচিত যতটুকু সে সহজভাবে, সুষ্ঠুপন্থায় আঞ্জাম দিতে পারে। (আল-মুহাল্লা লি-ইবনিল হাজম)
শ্রমের পরিমাণ নির্ধারণ: ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাস। হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আমেরিকার শিকাগো সিটির রাজপথ। পিচঢালা সড়কে লুটিয়ে পড়ে বেশ কিছু শ্রমিকের লাশ। এখানে শ্রমিকরা প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টার পরিবর্তে আট ঘণ্টা শ্রমের সময়সীমা নির্ধারণের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল। অবশেষে শ্রমিকের রক্তচোষা পুঁজিপতিরা ‘আট ঘণ্টা’র দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।
এই সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন, যে আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও একাত্মতা ঘোষণার লক্ষ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও ‘মে দিবস’ পালন করা হয়। অথচ ইসলাম ১৪০০ বছর আগেই ঘোষণা করেছে, আল্লাহ কাউকে এমন কোনো কাজের দায়িত্ব দেন না, যা তার সাধ্যাতীত। (সুরা বাকারা, ২৮৬)। এ মূলনীতির আলোকে ইসলাম কাজের ক্ষমতা, প্রকৃতি ও পরিবেশ অনুযায়ী শ্রমের পরিমাণ ও সময় নির্ধারণের নির্দেশ দেয়।
লাভের অংশীদারত্ব: ইসলামই একমাত্র মতবাদ যেখানে শ্রমিকের লভ্যাংশে শরিক হওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এক হাদিসে এরশাদ হয়েছে, শ্রমিকদের তাদের শ্রমার্জিত সম্পদ (লাভ) হতেও অংশ দিও। কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না। (মুসনাদে আহমাদ)
দাবি পেশ করার সুযোগ: ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি দিকের এমনকি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়াবলিরও বিস্ময়কর সমাধান দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইসলামে শ্রমিকের অন্যান্য অধিকারের মতো দাবি-দাওয়া পেশ করারও পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে।
হাদিস শরিফে এরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সুওয়াল করা বা অন্যের কাছে কিছু প্রার্থনা করা একটি পেষণযন্ত্র; যার মাধ্যমে মানুষ তার নিজের চেহারাই পিষে ফেলে। কিন্তু কোনো মানুষ যদি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করে বা যা ব্যতীত সে বাঁচতে পারে না এমন জিনিসের দাবি নিয়ে আসে তবে সেটা সুওয়াল ও প্রার্থনা হবে না। (আল-মাসুত)
আজকের এ অশান্ত পৃথিবীতে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের তথা শ্রমিক শোষণবাদের অভিশপ্ত শৃঙ্খল ভেঙে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সাম্য ও মুক্তির একমাত্র মতবাদ ইসলামের সোনালি আইন প্রতিষ্ঠা করি। এতেই প্রতিষ্ঠা হবে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার। এতেই আসবে বিশ্ব মুসলমানের মুক্তি। সবাই খুঁজে পাবে শান্তিময় জীবনের সন্ধান।
লেখক: আলেম ও গবেষক