বক্কর ভাইয়ের মন খারাপ। খুবই খারাপ। কারণ সে এইচএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে। শুধু জিপিএ ফাইভ না, গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ। এসএসসিতেও তাই। এ দুটি গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ তার জীবনের সব স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্ক্ষা সব ধুলোয় মিশিয়ে দিল।
বক্কর ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল নেতা হবে। বড় নেতা। ভবিষ্যতে এমপি বা মন্ত্রী। বড় নেতা হতে না পারলে মাঝারি গোছের একটা নেতা হতে পারলেও সান্ত্বনা পেত।
নেতা হওয়ার লাইনে বক্কর ভাই চলেও এসেছিল। সে পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াল তার এই রেজাল্ট। রেজাল্ট দেখে সবাই তাকে বাহবা দিচ্ছে, তার বাবা-মাও খুব খুশি। কিন্তু বক্কর ভাইয়ের মন খারাপ।
এরকম রেজাল্ট নিয়ে নেতা হওয়ার উদাহরণ এই দেশে নেই। বর্তমানে এই এলাকায় যতগুলো নেতা আছে, তারা সবাই ফেল্টুস। যে যত বড় ফেল্টুস সে তত বড় নেতা। এলাকার সবচেয়ে বড় নেতা ল্যাংড়া ছগীর তিনবারের চেষ্টায় সি গ্রেড নিয়ে এসএসসি পাস করেছিল। আর এইচএসসি তিনবার চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিছে। বক্কর ভাইয়ের রেজাল্ট প্রকাশ হওয়ার পরই ল্যাংড়া ছগীর বলল, ছোট ভাই, তুমি আর কাছে আইসো না। মেডিকেলে যাও।
- মেডিকেলে যাব মানে?
- দুইটা গোল্ডেন ঝোলায় ভরেছো।
- তাতে মেডিকেলে যাব কেন? আমার তো কোনো অসুখ-বিসুখ নাই।
- এই কারণেই তুমি গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পাইছো। কথাবার্তা ঠিকমতো বোঝো না। শোন, এই আঁতেল মার্কা রেজাল্ট নিয়া নেতা হওয়া যাবে না। তুমি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেও। ডাক্তার হয়ে দেশের অসুস্থ মানুষের সেবা করো। কথা দিচ্ছি, আমি যদি কোনো দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হই, তো তোমার দিকে স্পেশাল নজর থাকবে।
বড় নেতা ল্যাংড়া ছগীরের কথা শুনে বক্কর ভাই একেবারে চুপসে গেল। তার মনটা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। তার ইচ্ছা ছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবে, সেখানে হতে যাচ্ছে ডাক্তার। ডাক্তার হওয়ার পর ল্যাংড়া ছগীরকে দেখলে চেয়ার ফেলে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, স্যার স্যার ডেকে মুখ দিয়ে ফেনা বের করে ফেলতে হবে। গোল্ডেন জিপিএ ফাইভের এই হলো মর্যাদা।
বক্কর ভাই আশা করেছিল ফেল করবে। নেতা হবে। আহারে! বক্কর ভাইয়ের প্ল্যান জলে গেল। বক্কর ভাই কত আশা করে রেখেছিল ফেল করার পর পাড়ার বিপক্ষ দলের নেতাদের সঙ্গে বড়সর ঝামেলা বাঁধাবে। ঝামেলা বাঁধিয়ে পায়ে একটা গুলি খাবে। গুলি খাওয়া মানেই বড় নেতা। পায়ে গুলি খাওয়ার পরই তো ছগীর ভাই এলাকার টপ নেতা হয়ে গেল। খেতাব পেয়ে গেল ল্যাংড়া। নেতাদের ল্যাংড়া, চাপাভাঙা, ঘাড়ত্যাড়া, হাত লুলা এরকম খেতাব না থাকলে মানায় না। পায়ে গুলি খেলে বক্কর ভাইয়ের নাম হয়তো হতো ছোট ল্যাংড়া। ছোট ল্যাংড়া খেতাব পেলে বড় ল্যাংড়া ছগীর ভাইয়ের প্রধান শিষ্য হওয়া যেত অনায়াসে।
মন খারাপ নিয়ে বক্কর ভাই দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। সেখানে এল গুল্লু আর ছল্লু। ওরা বক্কর ভাইকে ধাক্কা দিয়ে বসে পড়ল। বক্কর ভাই বলল, ধাক্কা দেও কেন?
গুল্লু বলল, আমাদের দেখে যদি নিজেই সরে বসতে তাহলে তো ধাক্কা দিতে হতো না।
- তোমাদের দেখে সরে বসব কেন?
- শোনো মি. বক্কর, চোখ গরম করে কথা বইল না। তুমি এ প্লাস পাইছো। এখন আর তোমার কোনো বেল নাই। আমরা ফেল করেছি। আমাদের সঙ্গে পল্টি নিতে আইসো না।
- ফেল করে তোমরা এমন কী হইছো?
- তোমার চেয়ে বড় নেতা হইছি। অলরেডি খেতাবও পেয়ে গেছি।
- কী খেতাব পাইছো?
- আমার নাম হইছে চাপাতি গুল্লু, আর ওর নাম ক্ষুর ছল্লু।
- এহ! চাপাতি...।
- বিশ্বাস হয় না?
গুল্লু ওর পেছন থেকে একটা চাপাতি টেনে আনল। উপস্থিত সবাই ঘাবড়ে গেল। গুল্লু যে সত্যি চাপাতি নিয়ে এসেছে কেউ তা খেয়াল করেনি।
মধ্যবয়সী একজন তো ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল গুল্লু আর ছল্লুর গালে দুইটা চড় বসিয়ে দেবে। একটা এ প্লাস পাওয়া ব্রিলিয়ান্ট ছেলের সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝামেলা করছে। চাপাতি দেখে সে সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে গেল।
গুল্লু বলল, এখন থেকে আমি এটা নিয়ে এলাকায় চলাফেরা করব। ল্যাংড়া ছগীর ভাই পারমিশন দিয়েছে। আর একটা প্রমোশন পেলে মেশিন পাব। ছল্লু, তোর ক্ষুরটা দেখা তো।
ছল্লু পকেট থেকে ক্ষুর বের করল। বলল, ঝামেলা করলে পায়ের রগ নিয়ে হাঁটাচলা করতে পারবি না।
চাপাতি, ক্ষুর দেখে সবাই ঘাবড়ে গেল। মাঝ বয়সী সেই লোক বক্কর ভাইকে বলল, তুমি সরে এসে এই বেঞ্চে বসো। নেতাদের সঙ্গে ঝামেলা করে লাভ নেই।
বক্কর ভাই কাপের চা ঢেলে ফেলে চলে গেল। যেতে যেতে মনে মনে বলল, কার বদদোয়ায় যে গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেলাম! এই গোল্ডেন জিপিএ ফাইভের জন্য আজ লাইফটা তেজপাতা হয়ে গেল।