নির্মাণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে করতে হবে যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয়। এয়ার কন্ডিশনার কম ব্যবহার করার চেষ্টা করতে হবে। যদি সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা যায় তাহলে ৭০-৮০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব। এ ছাড়া সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।...
শীত মৌসুমে ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্প-কারখানার বর্জ্য এবং বাতাসের গতি কম থাকার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ দ্রুত বেড়ে যায়। ঢাকা বারবার বায়ুদূষণের শীর্ষে অবস্থান করায় শহরের বায়ুমান অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে, ফলে নাগরিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে দিন দিন বাড়ছে বায়ুদূষণ। দীর্ঘদিন ধরে মেগাসিটি ঢাকাও বায়ুদূষণের কবলে। সম্প্রতি শহরটির বায়ুমান কিছুটা উন্নতির দিকে ছিল। কিন্তু দুদিন ধরে শহরটির বাতাস অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণে ভুগছে ঢাকা। এর বাতাসের গুণমান সাধারণত শীতকালে অস্বাস্থ্যকর হয়ে যায় এবং বর্ষাকালে কিছুটা উন্নত হয়। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান উৎস হলো—ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণ সাইটের ধুলা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুসারে, বায়ুদূষণের ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের কারণে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। ঢাকায় ডেঙ্গুর ভয়, বায়ুদূষণের ভয়, সারা বছর থাকে শব্দদূষণ মানুষ এসব সমস্যা এখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এদিকে পরিবেশদূষণের কারণে ঘটা মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ শীর্ষে। আর রাজধানী ঢাকা তো অনেক বছর ধরেই বসবাসের অযোগ্য ও নিকৃষ্টতম শহরগুলোর একটি। সাধারণত একিউআই স্কোর ৫০ থেকে ১০০ এর মধ্যে থাকলে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ বলা হয়। স্কোর ১০১ থেকে ২০০ এর মধ্যে থাকলে ‘অস্বাস্থ্যকর’, স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে থাকলে ‘খারাপ’ এবং ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোর হলে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয়। এ বছরের নভেম্বর থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রতি তিন দিনের মধ্যে যেকোনো এক দিন ঢাকা শহরের বায়ুর মানসূচক ৩৩০-এর ওপরে থাকছে। বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউ এবারের সূচকে ঢাকা একাধিকবার ৩০০-এর বেশি একিউআই স্কোর নিয়ে সর্বোচ্চ দূষিত শহরের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ থেকে ঢাকার বায়ুদূষণের অবস্থান সহজেই অনুমেয়। বায়ু দূষিত হলে মানুষের শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেড়ে যায়। ঘরে ঘরে যেমন সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত মানুষ বাড়ে, তেমনি হাসপাতালে বাড়ে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষের ভিড়। বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি হয় শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এর মধ্যে হাঁপানি, ফুসফুসের কাশি ছাড়াও লাং ক্যানসার, স্ট্রোক ও কিডনির সমস্যা হয়। এদিকে, বায়ুমানের সূচক ২০০ অতিক্রম করলে একে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলে ধরা হয়। বায়ুদূষণের কারণে সারা দেশে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস। ঢাকায় কমেছে প্রায় সাত বছর সাত মাস। অর্থাৎ ঢাকায় বায়ুদূষণ না থাকলে আমরা আরও প্রায় সাত বছর সাত মাস বেশি বাঁচতে পারতেন। বায়ুদূষণপূর্ণ কোনো এলাকায় বাতাসে ক্ষতিকর পদার্থের মাত্রা অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি থাকে, ফলে সেখানে দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সহজেই শনাক্ত করা যায়। বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হলো—গাড়ি থেকে নির্গত ধোঁয়া, বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া, শিল্প-কারখানা এবং কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া। ক্ষতিকারক পদার্থ বাতাসে মেশার ফলে বায়ু দূষণ হয়। বায়ুদূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, পরিবেশ এবং সম্পদও নষ্ট হয়। ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর পাতলা হয়ে যায়। নানা কারণে বায়ুদূষণ ঘটে, যার অনেকগুলোই আবার মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। মরুভূমি অঞ্চলে ধূলিঝড় এবং অরণ্যে বা ঘাসে আগুন লাগার ফলে নির্গত ধোঁয়া বাতাসে রাসায়নিক ও ধূলিকণাজনিত দূষণ ঘটিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ ও রাজধানী শহর ঢাকায় বায়ুদূষণের সমস্যাটি নতুন নয়। বছরের পর বছর বায়ুর মানের অবনতি হচ্ছে। রাস্তায় বের হলেই দেখা যায়, জমা করে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। মূলত ঢাকায় বায়ুদূষণের বড় উৎস নির্মাণকাজ। এরপর রয়েছে ইটভাটা ও কারখানা, যানবাহন, আন্তঃদেশীয় দূষিত বায়ু, রান্নার চুলা এবং বর্জ্য পোড়ানো। বাংলাদেশে বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং এর কারণ হলো—দূষণের উৎসও বাড়ছে। এদিকে যানবাহনজনিত দূষণ ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। নির্মাণকাজের ধুলাও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। পরিবেশ দূষণের মাত্রা আগে থেকেই বেশি ছিল। কিন্তু ইদানীং বিশেষ করে রাজধানীজুড়ে নানা প্রকল্পের কাজের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির ফলে দূষণ এমন বিপজ্জনক হারে বাড়ছে, যা মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে এ উন্নয়ন এখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের ভাঙাচোরা রাস্তা থেকে প্রতিনিয়ত ধুলোবালি মিশেও পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তুলেছে। বায়ুদূষণ কমাতে রাস্তায় পানি ছিটিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, ময়লা পোড়ানো বন্ধ করা, কারখানার ধোঁয়া কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলো শহরের বাইরে স্থানান্তর করা জরুরি। পাশাপাশি যানজট নিরসন ও উন্নত জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বাতাসে শ্বাস গ্রহণ এবং বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর প্রধানত নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবে অকালমৃত্যুর শতকরা ৮৯ ভাগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে হয়ে থাকে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর কারণ বায়ুদূষণ। পরিবেশগত কারণে ও গৃহস্থালিসংক্রান্ত কারণে সৃষ্ট বায়ুদূষণের প্রভাবে প্রতি বছর ৬৭ মিলিয়ন মানুষের অকালমৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। এক গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে ৩০ কোটি শিশু দূষিত বায়ু অধ্যুষিত এলাকায় বাস করে, যার মধ্যে ২২ কোটিই দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশুদ্ধ বাতাস সুস্থতার অত্যাবশ্যকীয় নিয়ামক। খাবার, পানি বা বাসস্থান ছাড়া আমরা কিছু সময় থাকতে পারলেও নিশ্বাস গ্রহণ ছাড়া আমরা এক মুহূর্ত বাঁচতে পারি না। তাই, বায়ুদূষণের প্রকৃতি এবং রোধের উপায় জানা খুবই প্রয়োজন। এদিকে মৃত জীবদেহের পচনের ফলে অনেক ধরনের দুর্গন্ধ যুক্ত গ্যাস যেমন—মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড ইত্যাদি বাতাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বায়ুদূষণ ঘটায়। মহাকাশ থেকে ভূপৃষ্ঠে আগত উল্কাপিণ্ড, মহাজাগতিক ধূলিকণা ইত্যাদি বাতাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বায়ুদূষণ ঘটায়। মানুষের প্রতিনিয়ত কার্যকলাপের ফলে প্রতিনিয়ত অবাঞ্ছিত বস্তু বাতাসে মিশ্রিত হচ্ছে, এগুলোই মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে বাতাসে ধুলার পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ধুলা এমনি বেশি। এরপর কয়েক বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে উন্মুক্ত পরিবেশে নতুন নতুন নির্মাণযজ্ঞ বাড়তে থাকায় দূষণ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ফলে এসব ক্ষেত্রে ঢাকার পরিবেশগত অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে। এক যুগ ধরে ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎস হিসেবে ইটভাটাকে মনে করা হতো। কিন্তু এই জরিপ বলছে, ঢাকার বাতাসে দূষিত বস্তুর উৎস হিসেবে ইটভাটার স্থান দখল করেছে যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া। দূষিত বাতাসে কঠিন ও তরল পদার্থ উড়ে বেড়ায়, যার মধ্যে রয়েছে কাচ, ধোঁয়া বা ধুলা, যেগুলোকে ‘বস্তুকণা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর নগরের জন্য আয়তন অনুযায়ী জনসংখ্যা সীমিত রাখা, গাছপালা ও জলাভূমি রক্ষা করা আর বায়ু-মাটিদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাখাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন বিশেষজ্ঞরা। প্রচুর বনায়ন করতে হবে কারণ গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা রাখে। বাড়িঘর ও আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। যেখানে উদ্যান ও পুকুর থাকবে। নির্মাণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে করতে হবে যাতে সেটি দূষণের কারণ না হয়। এয়ার কন্ডিশনার কম ব্যবহার করার চেষ্টা করতে হবে। যদি সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা যায় তাহলে ৭০-৮০ শতাংশ দূষণ কমানো সম্ভব। এ ছাড়া সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি
