বাংলাদেশের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য যেখানে প্রধানত অর্থনৈতিক, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই স্পর্শকাতর। তাই বাংলাদেশের উচিত একতরফা নির্ভরতা এড়িয়ে চলা এবং ভারতের বাজারে নিজের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য জোরালো অবস্থান নেওয়া।...

মাস ছয়েক আগে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে সুতা আমদানি সূত্রে নতুন কিছু ট্যারিফ সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিটিএমএ এবং বিজিএমই-এর মধ্যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় উভয় দেশে মুদ্রা অবমূলায়নে সফলতা ও ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয়েছিল।
১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকজুড়ে তুলনামূলকভাবে নিম্ন পর্যায়ে থাকার পর ১৯৯৩ সাল থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি (জিডিপির শতকরা হিসাবে) দ্রুত বাড়তে শুরু করে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অবৈধ বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে তা বাড়ছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে উন্নয়নের একই পর্যায়ে থাকা দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার বদলে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য সম্পর্ক বাংলাদেশের ভারতের ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরতার চিত্র তুলে ধরে। এ একতরফা বাণিজ্য প্রবাহকে ঘিরে বাংলাদেশে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার দুটি বিপরীত মেরু রয়েছে। একদিকে আছেন সেই বিশ্লেষকরা, যারা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যঘাটতিকে একটি ‘স্বাভাবিক ও ইতিবাচক উন্নয়ন’ হিসেবে দেখেন। তাদের যুক্তি হলো ভারত উন্নয়নের উচ্চতর পর্যায়ে রয়েছে এবং বাংলাদেশ যে পণ্যগুলো ভারত থেকে আমদানি করে, সেগুলোর উৎপাদনে ভারত প্রযুক্তিগতভাবে অধিক পরিণত। অন্যদিকে বিকল্প মতামতটি হলো বাংলাদেশের বড় ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যঘাটতি একটি সাম্প্রতিক ঘটনা এবং এর সঙ্গে ভারতের প্রযুক্তিগত পরিপক্বতা বা দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এসব ঘাটতি মূলত ভারতের গভীর মুদ্রা অবমূল্যায়ন নীতি এবং বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর আরোপিত শুল্ক ও অশুল্ক বাধার ফল।
সরকারি বাণিজ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একটি সমান্তরাল অবৈধ বাণিজ্যও রয়েছে। ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের অবৈধ আমদানির পরিমাণ অনেক বড় এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ভারতের কাছে বাংলাদেশের অবৈধ রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা হয়তো হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ভারতের পক্ষে যে বাণিজ্য ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, তার পরিমাণ আনুমানিক এক থেকে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। এই বিশাল বাণিজ্য অসমতা বৈদেশিক শক্ত মুদ্রা, স্বর্ণ এবং বাংলাদেশি টাকা ও ভারতীয় রুপির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয় [রহমান ও রাজ্জাক (১৯৯৮); বিশ্বব্যাংক (১৯৯৬)]। আবার বাংলাদেশ যেসব ভোগ্য টেকসই পণ্য (যেমন- ইলেকট্রনিক-সামগ্রী ও বিলাসপণ্য) অন্য দেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি করে, সেগুলোর কিছু অবৈধ আমদানির মূল্য পরিশোধ হিসেবে ভারতে পাচারও করা হয়।
১৯৭৫ সাল থেকে নির্বাচিত কয়েকটি বছরের জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের SITC দুই অঙ্কের শিল্প খাতে প্রকাশিত তুলনামূলক সুবিধা (RCA) নির্ণয় করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন কি না এবং বাংলাদেশ যে কৃষিজ ও শিল্পজাত পণ্য ভারত থেকে আমদানি করে, সেগুলোর উৎপাদন ও রপ্তানিতে ভারতের প্রকৃত তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা। সে সময় অ্যাবট (১৯৯৬) উল্লেখ করেছিলেন, যদি কোনো দেশের রপ্তানি বিশেষায়ন সরকারি নীতির কারণে বিকৃত হয়, তবে RCA সূচকের মান একের বেশি হলে তুলনামূলক সুবিধা এবং একের কম হলে তুলনামূলক অসুবিধা নির্দেশ করে। সে সময়কার RCA হিসাব থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনামূলক সুবিধা ও অসুবিধা প্রায় একই ধরনের পণ্যে কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশ খাদ্য, পানীয় ও তামাক, উৎপাদিত পণ্য, টেক্সটাইল ফাইবার, সুতা ও বস্ত্র এবং পোশাক খাতে তুলনামূলক সুবিধা ভোগ করে।
সামগ্রিক ফলাফল ইঙ্গিত করে যে, ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে ভারতের কাছ থেকে আমদানির দ্রুত বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশের টাকার প্রকৃত বিনিময় হারের মূল্যবৃদ্ধি। এ ছাড়া শুল্কের তীব্র হ্রাসসহ অন্যান্য কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ যখন আমদানি বাণিজ্য উদারীকরণ জোরদার করে, তখন থেকেই ভারত বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশে সফল হয়। উদারীকরণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শুল্ক কমায় এবং আমদানির সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে বিভিন্ন ভর্তুকি প্রত্যাহার করে। রহমান (১৯৯৭) দেখিয়েছিলেন, যেসব পণ্যে শুল্ক হ্রাস ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি, সেসব পণ্যে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বিশেষভাবে সুযোগ গ্রহণ করেছে। ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্কহার ১৯৯২ সালে ৩১ শতাংশ থেকে নেমে আসে প্রায় ১২ শতাংশে।
সামগ্রিক ফলাফল আরও নিশ্চিত করে যে কাঁচা তথ্যের সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকেই যা স্পষ্ট বাংলাদেশের ভারতে রপ্তানি ভারতের আয় বৃদ্ধি বা আপেক্ষিক দামের পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল নয়। এটাকে ভারতের উচ্চমাত্রার শুল্ক ও অশুল্ক বাধার উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।
শুল্ক বাধার পাশাপাশি ভারত আমদানির ক্ষেত্রে নানা ধরনের ভেদযোগ্য অশুল্ক বাধা আরোপ করেছে। যেমন- লাইসেন্স ব্যবস্থা, ক্যানালাইজেশন, সরকারি ক্রয় অগ্রাধিকার, ‘প্রয়োজনীয়তা’ ও ‘স্বদেশি’ মানদণ্ড ইত্যাদি। এসব নীতির পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত শিল্পনীতি, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পকে সুরক্ষা, শিল্প বিকেন্দ্রীকরণ, ব্যবসাবিরোধী মনোভাব, নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ব্যবস্থার দেশের সঙ্গে লেনদেনের অভিজ্ঞতা, মূল্য ওঠানামা থেকে নিম্নআয়ের উৎপাদক ও ভোক্তাদের সুরক্ষা, নবীন শিল্প ধারণা এবং পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা [পার্সেল (১৯৯২)]। যদিও ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশ উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশেই অপ্রথাগত পণ্য রপ্তানিতে সফল হয়েছে, তবুও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা মনে করেন- এ ধরনের অশুল্ক বাধার মাধ্যমে ভারত তাদের জন্য বাজার কার্যত বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশের ভারতে রপ্তানির পথে প্রধান অশুল্ক বাধাগুলোর তালিকা দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে যে সিদ্ধান্ত হয়, বাস্তবায়নের স্তরে কাস্টমস ও বাণিজ্য কর্মকর্তাদের আচরণের সঙ্গে তার বড় ধরনের ফারাক দেখা যায়। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের একটি স্থায়ী অভিযোগ হলো ভারতীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা বাংলাদেশ থেকে আসা পণ্য ছাড় করতে অত্যন্ত ধীরগতির। বিধিবিধান প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতারও অভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক জটিল ও অস্থির। ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হওয়া উচিত পরিণত ও সুসংহত। তবে তা একতরফা হতে পারে না; ভারতেরও উচিত বাংলাদেশের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বড় বাণিজ্যঘাটতির প্রধান কারণ ভারতের গভীর মুদ্রা অবমূল্যায়ন নীতি। এ নীতি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, কালোবাজার অর্থনীতির বিস্তার, পুঁজি পাচার, আপেক্ষিক দামের বিকৃতি এবং আয় ও কর্মসংস্থানের ক্ষক্ষতি ঘটিয়েছে। কালো অর্থনীতির বিস্তার এতটাই বড় যে তা সরকারের মুদ্রা ও রাজস্বনীতিকে দুর্বল করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুতর চোরাচালানকারী ও রাজনীতিকদের মধ্যে যোগসাজশ সৃষ্টি হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে গেছে।
বাংলাদেশে ভারতের নিম্নমানের পণ্য ডাম্পিংও একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে এসব পণ্য মূলত অন্য কোথাও রপ্তানিযোগ্য নয়। অসংখ্য ভুয়া রপ্তানিকারক দেশি-বিদেশি নামে পণ্য সরবরাহ করছে, যেগুলোর ওপর কার্যত কোনো মাননিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যের মান অবনতি ঘটে।
চোরাচালান ও অবৈধ আমদানির কারণে বাংলাদেশে প্রত্যাশিত বৈদেশিক বিনিয়োগও আসছে না। অবৈধ আমদানি দেশি শিল্পকে ক্ষক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য যেখানে প্রধানত অর্থনৈতিক, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই স্পর্শকাতর। তাই বাংলাদেশের উচিত একতরফা নির্ভরতা এড়িয়ে চলা এবং ভারতের বাজারে নিজের পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য জোরালো অবস্থান নেওয়া। ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সুস্থ ও টেকসই বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের পণ্যের জন্য তার বাজার উন্মুক্ত করতে হবে।
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক
